বাঘিনী আসছে বক্সার জঙ্গলে শুরু এনক্লোজারের কাজ

৩৬৫ দিন। বিহারের বাল্মিকী ন্যাশনাল পার্ক থেকে উত্তরবঙ্গের বক্সার জঙ্গলে বাঘিনী আনার জন্য সুনির্দিষ্ট এনক্লোজার তৈরি করা হল। বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, বাঘের প্রজনন শুরু করার জন্য বিহার থেকে বাঘিনী এনে বক্সার জঙ্গলে ২.২ হেক্টর জমির এনক্লোজারে রাখা হবে। ইতিমধ্যেই জঙ্গলের মধ্যে এই জমিটি চিহ্নিত করে তার চারধারে বেষ্টনী করা হয়েছে। বাঘের বিচরণের জন্য এটি অত্যন্ত উপযুক্ত স্থান বলে জানিয়েছে রাজ্য বন দফতর।পাশাপাশি জঙ্গলে বাঘ পুনর্বাসনের জন্য সচেতনতা কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। বক্সার জঙ্গল সংলগ্ন গ্রামগুলিতে জনঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে জঙ্গলে বাঘের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছে। তাই জঙ্গল সংলগ্ন গ্রামগুলির মানুষেরা যেন কোর এরিয়া ছেড়ে অন্যত্র চলে যান, তার জন্য সচেতনতা কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বক্সা জঙ্গল সংলগ্ন ভুটিয়া বস্তি, গাঙ্গুটিয়া বস্তির প্রায় ৮০ শতাংশ বাসিন্দারা কোর এরিয়া ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছেন। একবার কোর এরিয়া থেকে গ্রামের বাসিন্দারা বেরিয়ে যাবার পর জঙ্গলে ভালোভাবে বাঘের পুনর্বাসন সম্ভব বলে মনে করছে বন দফতর। সচেতনতা প্রচারের কাজে বিভিন্ন এনজিওরাও এগিয়ে এসেছে। অন্যদিকে, বাঘিনী আনতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত র‌্যাপিড রেসপন্স টিম বিহারের বাল্মিকী ন্যাশনাল পার্কের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর।
উল্লেখ্য, বাঘের সংখ্যা বাড়াতে বিহারের বাল্মিকী ন্যাশনাল পার্ক থেকে বাঘিনী আনা হচ্ছে বক্সা টাইগার রিজার্ভে। আগামী ২ অক্টোবর বক্সায় বাঘিনী ছাড়া হবে বলে বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে। এই কাজের জন্য বিশেষ তিনটি বিশেষ র‌্যাপিড রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গ থেকে দুটি দল বাল্মিকী ন্যাশনাল পার্কের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। দেরাদুন থেকে আরেকটি দল বিহারের জঙ্গলে আসবে। বক্সয় ইতিমধ্যেই বাঘিনী রাখার জন্য এনক্লোজার তৈরি করা হয়েছে। বাল্মিকী ন্যাশনাল পার্ক এবং বিহারের পশ্চিম চম্পারন জেলায় এই কাজের জন্য তিনটি বাঘিনীকে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত করা হয়েছে। বক্সা টাইগার রিজার্ভ ও সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ থেকে বিশেষজ্ঞ টিমকে বাঘিনী আনার কাজের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। পশু অ্যাম্বুলেন্স করে বাঘিনীকে বক্সায় নিয়ে আসা হবে বলেও জানা গিয়েছে। বাঘিনীকে বক্সার এনক্লোজারে ছাড়ার পর রেডিও কলারের মাধ্যমে তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখবে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দল গুলি। বাঘিনী যদি ভুটান সীমান্ত পারাপার করার চেষ্টা করে তাহলে তাদের প্রতিরোধ করা হবে।
বিভিন্ন এনজিওর সহযোগিতায় রাজ্য বন দফতর জঙ্গলে বাঘ পুনর্বাসনের কাজটি নির্বিঘ্নে করার জন্য মানুষের মধ্যে সচেতনতা প্রচারের কাজ শুরু করছে। উল্লেখ্য, ৯০ এর দশকে উত্তরবঙ্গের বক্সা টাইগার রিজার্ভে ২৫ থেকে ২৬ টি বাঘ ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে জঙ্গল সংলগ্ন গ্রাম গুলিতে জনঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে স্বাভাবিকভাবেই জঙ্গলে বাঘের সংখ্যা কমতে শুরু করে। সম্প্রতি, জঙ্গলের ট্র্যাপ ক্যামেরায় এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা নজরে আসে। বাঘিনীর খোঁজে ভুটান এবং আসামের জঙ্গল গুলির থেকে বাঘের গতিবিধি নজরে আসে। গত জানুয়ারি মাসে বক্সর জঙ্গলে একটি বাঘ নজরে এসেছে। সম্ভবত ভুটান জঙ্গল থেকে বাঘটি বক্সায় আসে। বাঘ পুনর্বাসনের কাজটি নির্বিঘ্নে করার জন্য জঙ্গল সংলগ্ন গ্রামের মানুষের সঙ্গে এক চুক্তি স্বাক্ষর করে রাজ্য সরকার। তারা যেন কোর এরিয়া ছেড়ে অন্যত্র চলে যান সে বিষয়ে কাজ শুরু হয়। জানা গিয়েছে, বক্সায় বাঘ পুনর্বাসন শুরু করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ বন দফতর, বিহার বন দফতর এবং ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া সম্মিলিতভাবে বাঘিনী খোঁজার কাজে বাল্মিকী টাইগার রিজার্ভে প্রাথমিক সমীক্ষা চালায়। সেখান থেকেই বাঘিনী নির্বাচন করে বক্সার জঙ্গলে নিয়ে আসবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত র‌্যাপিড রেসপন্স টিম। ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটির তরফে জানানো হয়েছে, শুধু বয়স বা শারীরিক সক্ষমতার ভিত্তিতে বাঘিনী নির্বাচন করা হবে না। বেশ কয়েকটি পরিবেশগত, আচরণগত এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। চূড়ান্ত নির্বাচনের ক্ষেত্রে দেখা হবে, বাঘিনীর বয়স এবং বিচরণের ধরন। বিচরণ স্থানে বাঘিনীটি নিজের এলাকা তৈরি করেছে কি না। মানুষের সঙ্গে সংঘাতের পূর্ব ইতিহাস রয়েছে কি না। শিকার ধরার স্বাভাবিক দক্ষতা রয়েছে কিনা। জানা গিয়েছে, বক্সায় বাঘিনী স্থানান্তরের প্রকল্পে কেন্দ্রীয় অর্থসাহায্য রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে প্রজেক্ট টাইগার এবং প্রজেক্ট এলিফ্যান্টের কেন্দ্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাধীন প্রকল্পের অধীনে পশ্চিমবঙ্গ জুন মাসে প্রায় ৩.২ কোটি টাকা প্রথম কিস্তি হিসেবে পেয়েছে। দ্বিতীয় কিস্তির জন্য পশ্চিমবঙ্গ এখনও কোনও প্রস্তাব জমা দেয়নি। বক্সায় বাঘিনী স্থানান্তরের এই উদ্যোগ সফল হলে দীর্ঘদিন ধরে বাঘ সংরক্ষণ ও প্রজননের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বক্সা টাইগার রিজার্ভে নতুন জেনেটিক বৈচিত্র্য তৈরির সুযোগ তৈরি করবে বলেই মত বিশেষজ্ঞ মহলের।

Scroll to Top