বাপু মাই ফাদার, গান্ধির বায়োগ্রাফি নয়
নোয়াখালী পর্বের পটভূমিতে মানও বেহেনের চোখে দেবতা নয়
এক মানব দরদীর মূল্যায়ন

অদিতি দাস। মহাত্মা গান্ধিকে নিয়ে বইয়ের অভাব নেই। তাঁর রাজনৈতিক জীবন, স্বাধীনতা আন্দোলন, দর্শন, অহিংসা, সত্যাগ্রহ, ধর্মভাবনা—সবই নিয়ে বিপুল সাহিত্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু ‘বাপু—মাই মাদার’ বইটির গুরুত্ব অন্যত্র। এই ছোট বইটি গান্ধিকে ইতিহাসের বিশাল মঞ্চ থেকে নামিয়ে এনে নিয়ে আসে একেবারে ব্যক্তিগত পরিসরে। লেখক মনুবেহন গান্ধী তাঁকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে—সহযাত্রী হিসেবে, সেবিকা হিসেবে, শিষ্যা হিসেবে এবং সর্বোপরি এমন এক অভিভাবক হিসেবে, যাঁর মধ্যে তিনি মায়ের স্নেহ অনুভব করেছিলেন।বইটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে, গান্ধির মৃত্যুর অল্প সময়ের মধ্যেই। মূল গুজরাটি রচনা পরে চিত্রা দেশাই ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। নবজীবন প্রকাশন থেকে বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এর বিভিন্ন সংস্করণ বেরিয়েছে।‘মা’ কেন?
এই বইয়ের নামই প্রথম ধাক্কা দেয়—‘বাপু—আমার মা’। গান্ধী তো ‘বাপু’, পিতা। তাহলে ‘মা’ কেন? মনুবেহনের উত্তর বইয়ের প্রথম লেখাতেই রয়েছে। গান্ধি তাঁর কাছে শুধু জাতির নেতা ছিলেন না। তাঁর দৈনন্দিন জীবন, পড়াশোনা, পরিচ্ছন্নতা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, সময়জ্ঞান, আধ্যাত্মিক শিক্ষা—সবকিছুর দিকে তিনি নজর রাখতেন। গান্ধী নিজেই মনুবেহনকে বলেছিলেন, তিনি বহু মানুষের পিতা হলেও তাঁর কাছে মা হয়েছেন। এই সম্পর্কের সূত্র আরও গভীরে। মনুবেহন ছিলেন গান্ধির নিকট আত্মীয়া—গান্ধির ভাইপোর নাতনি। অল্প বয়সে মাকে হারানোর পর তাঁর জীবনে কস্তুরবার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কস্তুরবার মৃত্যুর পর গান্ধি কার্যত মনুর অভিভাবকের ভূমিকা আরও গভীরভাবে গ্রহণ করেন। ১৯৪৬ সালে নোয়াখালিতে সাম্প্রদায়িক শান্তির অভিযানে মনুবেহন তাঁর সঙ্গে যোগ দেন এবং শেষ জীবন পর্যন্ত তাঁর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ছিলেন।তাই বইটির ‘মা’ কোনও অলংকার নয়। এটি মনুবেহনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নাম।
বড় ইতিহাস নয়, ছোট ছোট মুহূর্ত
বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। এখানে স্বাধীনতা আন্দোলনের বিশাল রাজনৈতিক ঘটনাবলির ধারাবাহিক বিবরণ নেই। বরং আছে ছোট ছোট ঘটনা—কীভাবে গান্ধি সময় মেনে চলতেন, পরিচ্ছন্নতার প্রতি তাঁর অদ্ভুত নিষ্ঠা, সামান্য জিনিস নষ্ট না করার অভ্যাস, খাবারের প্রতি তাঁর সংযম, প্রার্থনা, গীতা পাঠ, মানুষের সঙ্গে ব্যবহার এবং প্রতিদিনের কাজের মধ্যে নৈতিকতার প্রয়োগ। বইয়ের সূচিপত্রেই বিষয়গুলির বৈচিত্র্য বোঝা যায়—ত্যাগের অর্থ, গীতার শিক্ষা, অপচয়কে হিংসা হিসেবে দেখা, সময়নিষ্ঠা, পরিচ্ছন্নতা, রামনাম, ছোট জিনিসের গুরুত্ব, অতিরিক্ত আড়ম্বরের বিরোধিতা ইত্যাদি। অর্থাৎ মনুবেহন গান্ধির রাজনৈতিক বক্তৃতা পুনরাবৃত্তি করেননি। তিনি দেখিয়েছেন, যে মানুষটি জনসমক্ষে একটি নৈতিক দর্শনের কথা বলতেন, ব্যক্তিগত জীবনেও সেই দর্শনকে কতটা কঠোরভাবে পালন করতেন। এখানেই বইটি মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল হয়ে ওঠে
গান্ধিকে দেবতা না বানিয়ে মানুষ হিসেবে দেখা
গান্ধিকে নিয়ে লেখা অনেক স্মৃতিচারণে তাঁকে প্রায় অলৌকিক উচ্চতায় তুলে ধরা হয়। মনুবেহনের লেখাতেও গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে, কিন্তু তাঁর বর্ণনার আকর্ষণ হল দৈনন্দিনতার উপস্থিতি।
তিনি দেখেছেন এমন একজন মানুষকে, যিনি নিজের চারপাশের মানুষদের কাছ থেকেও কঠোর শৃঙ্খলা আশা করতেন। তিনি নির্দেশ দিতেন, সংশোধন করতেন, প্রশ্ন করতেন, কখনও বিরক্তও হতেন। তাঁর কাছে পরিচ্ছন্নতা বা সময়নিষ্ঠার মতো ‘ছোট’ বিষয়ও চরিত্রের বড় পরীক্ষার অংশ। এই কারণে বইটি পড়লে গান্ধি শুধু রাজনৈতিক নেতা হিসেবে থাকেন না। তিনি হয়ে ওঠেন একজন মানুষ, যাঁর নৈতিক আদর্শ তাঁর নিজের শরীর, পোশাক, খাদ্য, ঘুম, কাজ এবং সম্পর্কের মধ্যেও প্রতিফলিত।
নোয়াখালি পর্বের গুরুত্ব
বইটির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি নোয়াখালি। ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সময় গান্ধি পূর্ববঙ্গে শান্তির উদ্দেশ্যে পদযাত্রা শুরু করেন। মনুবেহন তাঁর সঙ্গে ছিলেন। শেষ জীবনের এই পর্বে গান্ধির রাজনৈতিক ভূমিকা ক্রমশ এক অন্য ধরনের নৈতিক অভিযানে পরিণত হয়েছিল। মনুবেহনের চোখে সেই গান্ধি কোনও দূরের নেতা নন। তিনি হাঁটছেন, মানুষের বাড়িতে যাচ্ছেন, প্রার্থনা করছেন, অসুস্থ হচ্ছেন, বিশ্রাম নিচ্ছেন, আবার কাজে বেরিয়ে পড়ছেন। এই নৈকট্য বইটিকে বিশেষ করে তোলে।
বইটির সীমাবদ্ধতাও আছে
এই বইকে গান্ধির পূর্ণাঙ্গ জীবনী হিসেবে পড়লে হতাশ হতে হয়। বইটি ছোট, পরিসর সীমিত এবং লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত ব্যক্তিগত। মনুবেহন গান্ধীর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলির সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করেননি। গান্ধির ব্যক্তিগত জীবনের বিতর্কিত বিষয়গুলিও এখানে বিস্তৃতভাবে আলোচিত হয় না। তাই এই বই থেকে গান্ধির সম্পূর্ণ রাজনৈতিক দর্শন বোঝা সম্ভব নয়। বরং এটি একটি স্মৃতিকথা এবং চরিত্রচিত্রণ—একজন খুব কাছের মানুষের চোখে দেখা গান্ধি। এই সীমাবদ্ধতাই আবার বইটির শক্তি। কারণ দূরত্ব কমে গেলে ইতিহাসের মানুষটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠেন
আজকের দিনে বইটি কেন পড়া দরকার?
আজ গান্ধিকে নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক যত বাড়ছে, তাঁকে নিয়ে তৈরি প্রতিকৃতিগুলিও তত বেশি দুই মেরুতে ভাগ হয়ে যাচ্ছে—কেউ তাঁকে প্রায় পবিত্র প্রতিমূর্তি হিসেবে দেখেন, কেউ তাঁর সিদ্ধান্ত ও মতাদর্শের তীব্র সমালোচনা করেন। এই দুই চরম অবস্থানের বাইরে ‘বাপু—মাই মাদার’ একটি তৃতীয় দরজা খুলে দেয়। এখানে গান্ধীকে বুঝতে হলে তাঁর বড় বড় বক্তৃতা নয়, তাঁর দৈনন্দিন আচরণ দেখতে হয়। একটি ফুলের মালা তিনি কীভাবে গ্রহণ করছেন। অপচয় সম্পর্কে তাঁর মনোভাব কী। সময়কে তিনি কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন।কাউকে শিক্ষা দেওয়ার সময় তাঁর ভাষা কেমন।একজন তরুণীকে তিনি কীভাবে নিজের জীবনের অংশ করে নিচ্ছেন।এই ছোট ঘটনাগুলির মধ্যেই বড় গান্ধিকে খুঁজে পাওয়া যায়।
শেষ কথা
‘বাপু—মাই মাদার’ আসলে গান্ধির জীবনী নয়; এটি গান্ধির সঙ্গে বসবাসের একটি স্মৃতি। মনুবেহনের চোখে দেখা সেই মানুষটি একই সঙ্গে কঠোর, স্নেহশীল, নিয়মনিষ্ঠ, অস্বস্তিকর, অনুপ্রেরণাদায়ক এবং কখনও কখনও অসম্ভব কঠিন। বইটির সবচেয়ে বড় সাফল্য হল—এটি গান্ধিকে তাঁর মূর্তি থেকে নামিয়ে তাঁর অভ্যাসের মধ্যে বসিয়ে দেয়। জাতির ‘বাপু’কে আমরা সবাই চিনি। কিন্তু একজন তরুণীর কাছে তিনি কীভাবে ‘মা’ হয়ে উঠেছিলেন—এই ছোট বইটির আসল আবিষ্কার সেই গল্প। আর সেই কারণেই, মাত্র কয়েক ডজন পৃষ্ঠার এই স্মৃতিকথা গান্ধি-সাহিত্যে তার আকারের তুলনায় অনেক বড় একটি বই।

Scroll to Top