গান্ধিকে আবার পর্দায় ফিরিয়ে আনছেন সুধীর মিশ্র
লখনউয়ে শুরু হল মনোজ বাজপেয়ীর নতুন ছবি ‘গান্ধী অ্যান্ড মাই মাদার’-এর শুটিং

সদাশিব রানা। মুম্বই। মহাত্মা গান্ধীকে ভারতীয় চলচ্চিত্রে বহুবার দেখা হয়েছে। কখনও তিনি ইতিহাসের চরিত্র, কখনও পরিবারের কাছে এক কঠিন বাবা, কখনও বা সমকালীন বিবেকের প্রতীক। এবার সেই দীর্ঘ তালিকায় নতুন সংযোজন সুধীর মিশ্রের ‘গান্ধী অ্যান্ড মাই মাদার’। ছবির নাম এখনও চূড়ান্ত নয়। পরিচালক সুধীর মিশ্র, প্রযোজনায় অনুরাগী সহযোদ্ধা অনুবভ সিনহা, আর গান্ধীর ভূমিকায় মনোজ বাজপেয়ী। লখনউয়ে ছবির শুটিং শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। ছবির প্রথম দফার শুটিং হয়েছে লখনউ চিড়িয়াখানার কাছে নরহি এলাকায়। সেখানে একটি কিশোরী এবং গান্ধীর জনসমাবেশকে ঘিরে দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে। চল্লিশের দশকের আবহ তৈরি করতে ব্যবহার করা হচ্ছে পুরনো গাড়ি, সেই সময়ের পোশাক এবং পুরনো ধাঁচের সাইনবোর্ড। লখনউতেই অক্টোবর পর্যন্ত শুটিং চলবে বলে জানিয়েছেন অনুবভ সিনহা।
ছবির আসল গল্প কোথায় ?

এই ছবিকে নিছক আর একটি গান্ধী-জীবনী বলা ভুল হবে। সুধীর মিশ্র নিজেই জানিয়েছেন, ছবির কেন্দ্রবিন্দু গান্ধীর জীবনের একটি অপেক্ষাকৃত অচর্চিত ২১ দিনের অধ্যায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, ছবির মধ্যে থাকবে ছবির মধ্যেই আর একটি ছবি—এক অভিনেতার গান্ধীকে অভিনয় করার দ্বিধা এবং সেই গান্ধীকে আজকের চোখে দেখার প্রশ্ন।এই ব্যক্তিগত সূত্রটিই ছবির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। সুধীরের মা দুর্গা দেবেন্দ্রনাথ মিশ্র ছোটবেলায় গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। গান্ধীকে নিয়ে মায়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। ২০২২ সালে মায়ের মৃত্যুর আগে তাঁকে সুধীর কথা দিয়েছিলেন, গান্ধীকে নিয়ে ছবি করবেন। মায়ের মৃত্যুর পর সেই প্রতিশ্রুতি থেকেই চিত্রনাট্যের কাজ শুরু করেন তিনি।
অর্থাৎ, এটি কোনও দূরবর্তী ঐতিহাসিক চরিত্রকে নিয়ে পরিচালকের আকস্মিক আগ্রহ নয়। গান্ধী এখানে পারিবারিক স্মৃতি, ব্যক্তিগত প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক ইতিহাস—তিনটির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছেন।
কেন এই সময়ে গান্ধী?
সুধীর মিশ্রের ছবিতে রাজনীতি কখনও কেবল পটভূমি নয়। তাঁর ‘হাজারো খোয়াইশেঁ এমন’ জরুরি অবস্থার রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে প্রজন্মের স্বপ্ন ও ভাঙনকে দেখেছিল। ‘ধারাভি’ শহরের শ্রেণি ও বেঁচে থাকার লড়াইকে সামনে এনেছিল। ‘ইস রাত কি সুবহ নহিঁ’, ‘ইয়ে সালি জিন্দগি’, ‘দাস দেব’, ‘সিরিয়াস মেন’—বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতা, সমাজ, শ্রেণি, আকাঙ্ক্ষা ও নৈতিকতার সংঘাত তাঁর ছবির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়েছে। তাঁর প্রথম ছবি ‘ইয়ে ওহ মঞ্জিল তো নহিঁ’-ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিল।
তাই বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে গান্ধীকে নিয়ে তাঁর ছবি তৈরি হওয়া স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করে। তবে সুধীর মিশ্র নিজে বলেননি যে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিবাদ বা প্রতিক্রিয়া হিসেবেই ছবিটি তৈরি করছেন। বরং তাঁর বক্তব্য থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হল—মায়ের স্মৃতি এবং গান্ধীকে নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত অনুসন্ধান থেকেই ছবির সূত্রপাত।
তবু ছবিটির সময়কালকে উপেক্ষা করা যায় না। আজকের ভারতে গান্ধীর নাম, তাঁর অহিংসা, সত্য, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং রাজনৈতিক নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক চলছে। ফলে অতীতের একটি ২১ দিনের ঘটনাকে আজকের দর্শকের সামনে আনা নিছক ইতিহাসচর্চা হয়ে থাকবে না। গান্ধী তখন কে ছিলেন এবং আজ আমরা তাঁকে কীভাবে দেখি—এই দুই প্রশ্নের মধ্যে ফাঁকটাই সম্ভবত ছবিটির আসল নাটক।
মনোজের আগে কারা গান্ধী?
ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্দায় গান্ধীকে বহু অভিনেতা অভিনয় করেছেন। প্রত্যেকের গান্ধী আলাদা।সবচেয়ে স্মরণীয় নাম অবশ্যই বেন কিংসলে। রিচার্ড অ্যাটেনবরোর ১৯৮২ সালের ‘গান্ধী’ ছবিতে তাঁর অভিনয় বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয় এবং তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার অস্কার পান। ছবিটি মোট আটটি অস্কার জেতে।এরপর রাজিত কাপুর শ্যাম বেনেগালের ‘দ্য মেকিং অব দ্য মহাত্মা’-য় তরুণ গান্ধীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার দিনগুলিকে কেন্দ্র করে তৈরি ছবিটি গান্ধীর চরিত্র গঠনের প্রথম পর্যায়কে সামনে আনে। এই অভিনয়ের জন্য রাজিত কাপুর জাতীয় পুরস্কারও পান।নাসিরুদ্দিন শাহ-কে দেখা যায় কমল হাসানের ‘হে রাম’-এ। সেখানে গান্ধী প্রধান চরিত্র নন; দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িক হিংসার আবহে তাঁর উপস্থিতি শান্তি ও সম্প্রীতির এক নৈতিক অবস্থানকে সামনে আনে।দর্শন জারিওয়ালা ২০০৭ সালের ‘গান্ধী, মাই ফাদার’-এ গান্ধীর একেবারে অন্য দিক দেখান—জাতির পিতা নয়, পরিবারের পিতা হিসেবে। বড় ছেলে হরিলালের সঙ্গে তাঁর জটিল সম্পর্ক ছিল ছবির কেন্দ্রে।আর তারপর দিলীপ প্রভাবলকর-এর গান্ধী। ‘লগে রহো মুন্নাভাই’-এ তিনি বাস্তব ইতিহাসের পুনর্নির্মিত চরিত্র নন; বরং মুনাভাইয়ের বিবেক, নৈতিক পথপ্রদর্শক এবং গান্ধীয় দর্শনের প্রতীক। এই চরিত্রটি গান্ধীকে ইতিহাসের বই থেকে বের করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ফিরিয়ে দিয়েছিল।এর বাইরেও বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিকে গান্ধীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন জে. এস. কাশ্যপ, স্যাম ডাস্টর, অন্নু কাপুর, মোহন গোখলে-সহ আরও অনেকে।এই দীর্ঘ তালিকার পর মনোজ বাজপেয়ীর গান্ধী তাই নিছক আর একটি অভিনয় নয়। দর্শকের সামনে প্রশ্ন থাকবে—তিনি পরিচিত গান্ধীকে পুনরায় তৈরি করবেন, না কি তাঁর নিজস্ব অভিনয়শৈলীতে এক নতুন গান্ধী আবিষ্কার করবেন?
সুধীর মিশ্র ও অনুবভ সিনহা: আবার একসঙ্গে
এই ছবিতে সুধীর মিশ্র ও অনুবভ সিনহার জুটি নতুন নয়। দু’জন এর আগে ‘আফওয়াহ’-তে একসঙ্গে কাজ করেছেন। সেই সহযোগিতার পরই গান্ধীকে কেন্দ্র করে এই নতুন প্রকল্পে তাঁদের দ্বিতীয় বড় মিলন।অনুবভ সিনহা নিজে পরিচালক হিসেবে ‘মুল্ক’, ‘আর্টিকল ১৫’, ‘থাপ্পড়’, ‘ভীড়’-এর মতো রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে তীক্ষ্ণ ছবি করেছেন। ফলে সুধীর মিশ্রের এই বিষয়ের সঙ্গে তাঁর প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হওয়াটিও তাৎপর্যপূর্ণ।সুধীরের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি চিত্রনাট্য লিখেছিলেন মায়ের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে। আর অনুবভ সেই চিত্রনাট্যের পাশে দাঁড়িয়ে ছবিটিকে বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়েছেন। এই সহযোগিতার মধ্যে ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণ—দুই ধারাই এক জায়গায় এসে মিলেছে
লখনউ কেন?
লখনউ শুধু শুটিংয়ের স্থান নয়; সুধীর মিশ্রের নিজের শহরও। তাঁর আগের ছবির মধ্যে ‘ইয়ে ওহ মঞ্জিল তো নহিঁ’, ‘দাস দেব’ এবং ‘আফওয়াহ’-এর শুটিংও লখনউয়ে হয়েছে।নতুন ছবির জন্য শহরটিকে চল্লিশের দশকের আবহে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পুরনো গাড়ি, ঐতিহাসিক পোশাক, সেকালের সাইনবোর্ড এবং জনসমাবেশ—সব মিলিয়ে বর্তমান লখনউয়ের ভিতরেই তৈরি হচ্ছে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ের লখনউ। মনোজ বাজপেয়ীও চরিত্রটির জন্য উল্লেখযোগ্য শারীরিক পরিবর্তন করেছেন। অনুবভ সিনহার কথায়, তিনি অনেকটা ওজন কমিয়েছেন এবং নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের মধ্যে রয়েছেন। অর্থাৎ গান্ধীর চেহারা অনুকরণ করার পাশাপাশি তাঁর শরীরী উপস্থিতিকেও চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। অভিনেতাদের মধ্যে মনোজ বাজপেয়ীর পাশাপাশি দিব্যা দত্ত ও সৌরভ শুক্লা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন। গান্ধীকে নিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাস দীর্ঘ। কিংসলে তাঁকে ইতিহাসের মহাকাব্যে পরিণত করেছেন, রাজিত কাপুর দেখিয়েছেন তাঁর গড়ে ওঠার সময়, নাসিরুদ্দিন শাহ দেখিয়েছেন সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মুহূর্তে তাঁর নৈতিক অবস্থান, দর্শন জারিওয়ালা দেখিয়েছেন তাঁর পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আর দিলীপ প্রভাবলকর তাঁকে ফিরিয়ে এনেছেন সমকালীন মানুষের বিবেক হিসেবে। সুধীর মিশ্রের ‘গান্ধী অ্যান্ড মাই মাদার’ সেই ধারায় আর একটি জীবনী নয় বলেই কৌতূহল বেশি। এখানে ইতিহাসের গান্ধী, পরিচালকের মায়ের স্মৃতির গান্ধী এবং আজকের সমাজের চোখে দেখা গান্ধী—তিনটি প্রতিচ্ছবি মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আর সেই গান্ধীর মুখ মনোজ বাজপেয়ীর—এটাই ছবিটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস, মানিকন্ট্রোল, নিউজবাইটস, দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং গান্ধী-চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতাদের নিয়ে প্রকাশিত চলচ্চিত্র-তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন।

Scroll to Top