৩৬৫ দিন। তখন সকাল ৭ টা। দিল্লির রামলীলা ময়দানে পিল পিল করে ঢুকছে কয়েক হাজার কালো মাথা। দেখে মনে হবে এক্ষুনি বোধ হয় নবরাত্রির রাবণ দহন হবে বা রামলীলায় কোনও মেলা বসেছে। কে বলবে এটা দিল্লির বুকে কেন্দ্র বিরোধী আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে মোদি শাহ বিরোধী জনসভায় সভাস্থলে জায়গা পাওয়ার হিড়িক! ভিড় সামলানোর দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মীদের জিজ্ঞেস করে জানা গেল অন্ধকার থাকতে ভিড় হতে শুরু করে রামলীলায়। ভোর ৫ টার মধ্যে সভার সামনের অংশ ভরে যায়। ভিড়ের এই ছবি দেখে তারাও খানিকটা বিস্মিত। আরো বিস্ময়ের হল, ভিড়ের শৃঙ্খলাবদ্ধ ছবি। গত কয়েকদিন ধরে দিল্লি পুলিশ যে ভাবে গোটা দিল্লিকে দুর্গ করে ফেলেছিল তাতে মনে হচ্ছিল রবিবার দিল্লিতে বড় সর কিছু ঘটবে, সর্বত্র একটা কি জানি কি হয় ভাব ছিল অথচ দেখা গেল এক কনট প্লেসে পোস্টার ছেঁড়া বাদ দিলে কোনো ঘটনাই ঘটল না। ১৫-২০ দিন ধরে দিল্লির রামলীলায় বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের জ্ঞানেশ হঠাও ডাক দিয়ে যে মেগা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে তার সমর্থনে নাগাড়ে প্রচার চলেছে। বিশেষ করে কংগ্রেস শেষ কবে গোটা দলকে সব মান অভিমান সিন্দুক বন্দি করে ময়দানে নামাতে পেরেছে তা মনে করা কঠিন। এত সংগঠিত ও নিরন্তর প্রচার বোধহয় সেই সোনিয়ার জমানায় হত। তার সুফল মিলল রবিবার। গোটা দেশে কংগ্রেসের যত সংগঠন আছে সবাই আদা জল খেয়ে নেমে রামলীলা ভরালো। শুধু ভরালোই নয় রামলীলার ৫০-৭৫ হাজারের ধারণ ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে ভিড় উপচে পড়ল আশপাশের রাস্তায়। অনেকে আবার মাঠে বা রাস্তায় জায়গা না পেয়ে চড়ে বসলেন গাছে। গাড়ির ভিড় মনে করালো কৃষক আন্দোলনকে। কংগ্রেসের পাশাপাশি শরিক দলগুলোও কসুর করেনি লোক নিয়ে আসার। সব মিলিয়ে জ্ঞানেশ বিদায় হোক বা না হোক দিল্লির বুকে রামলীলায় মেগা জনসভা করে শক্তি প্রদর্শনে ইন্ডিয়া জোট যে জলপানি পেয়ে পাশ করল তা নিঃসংশয় ভাবে বলা যায়। সাধে কি আর উচ্ছ্বসিত নেতারা বলছেন, বিরোধী জোটের অনুষ্ঠানে ভিড়ের ঠেলায় জায়গা না পেয়ে কর্মী সমর্থকরা হাজারে হাজারে রাস্তায় বসে পড়ছেন, কিঞ্চিত অনুযোগ করে ইউটিউবে অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে বাড়ির পথ ধরছেন এই ছবিটাই তো বলে দিচ্ছে হাওয়া শুধু ঘুরছে তাই নয় পালে হাওয়া ধরে গিয়েছে এবার ওড়ার সময়।
জ্ঞানেশ জেলে যাবেন,ছাড় পাবেন না মোদি-শাহ, রামলীলার জন সমুদ্রে হুঙ্কার রাহুলের
রবিবার বেলা ১১ টা নাগাদ রাহুল মমতা অখিলেশরা যখন জিপে চেপে রামলীলায় এসে পৌঁছলেন তখন সেখানে জনসমুদ্র। আকাশে উড়ছে একাধিক ড্রোন। রামলীলার বাইরেও কিছু না হলেও হাজার দশেক লোকের ভিড়। স্বভাবতঃই ভিড়ের এই বহর দেখে রাহুলের মুখে দেখা যায় চওড়া হাসি। মঞ্চে ততক্ষণে পৌঁছে গিয়েছেন মল্লিকার্জুন খাড়্গে, সোনিয়া গান্ধিরা। বক্তব্য রাখতে উঠে আগাগোড়া আক্রমণাত্মক রাহুল তুলোধনা করেন মোদি-শাহ সহ বিজেপিকে। রাহুল বলেন, ভেবে খারাপ লাগে, ওঁরা ( জ্ঞানেশ, মোদি,শাহ) রাতে ঘুমোতে পারেন না। কিন্তু কী করা যাবে, ক্রাইম করেছেন। খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই। মেনে নিতে হবে রাতে ঘুম আসে না। দেশের সংবিধান নিয়ে যা তা করেছেন। এই আওয়াজ তো ওঠারই ছিল,’ রামলীলা ময়দানে ‘ইন্ডিয়া’র সভা শেষে বললেন রাহুল গান্ধী। সকলকে সমবেত হয়ে লড়াইয়ের আহ্বান জানালেন। রাহুলের কথায়,’মোদী-শাহ কোথাও যেতে চাইলেও আমরা যেতে দেব না’।দেশে যা চলছে, তার জন্য ছাড়া হবে না মোদী-শাহকেও! ওরা কেউ আমার শত্রু নয়, সিস্টেমের বিরুদ্ধে এই লড়াই। আমরা হিংসা ছড়াব না, আমরা ভালবেসে কাজ করব। কিন্তু সংবিধান নষ্ট করতে দেব না। এর এটাই আমার-আপনার মধ্যে পার্থক্য! রামলীলা ময়দানে ঝাঁঝালো বক্তব্য রাহুল গান্ধীর। রামলীলা থেকে রাহুল দাবি করেন, মোদি যে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তার পিছনেও জ্ঞানেশের কলকাঠি আছে। রাহুল বলেন, জ্ঞানেশ কুমার ছাড়া প্রধানমন্ত্রী হতেন না মোদী। শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, সিবিআই থেকে ইডি, বিচারব্যবস্থা থেকে প্রশাসনিক যেকোনও স্তর, দেশবাসীর। যা দখল করে নিয়েছে আরএসএস। এর ফল কৃষকরা অধিকার থেকে বঞ্চিত, আপনিও তাই। আর দেশের ধন আদানি-আম্বানির পকেটে। ওরা সব স্বপ্ন দেখতে পারেন। সব ঋণ মকুব হয়ে যায়। কিন্তু গরিবের ছেলে টাকা দিতে না পারলে জুতো মেরে জেলে ঢোকায়। এই দেশ আমাদের চাই না। আমি যা বলি, মিলে যায়। কোভিড নিয়ে বলেছিলাম। আমি বলে রাখছি, জ্ঞানেশ কুমার পদ থেকে সরবে। জেল যাবে। এটা কোনও সাধারণ চুরি না। এটা দেশের গণতন্ত্রের বিষয়।’
বাংলায় ভোট চুরি হয়েছে, অখিলেশ
রাহুলের পাশাপাশি ভরা রামলীলা থেকে ভোপট চুরির প্রসঙ্গ টেনে তীব্র আক্রমণ শানান সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব। বাংলার বিধানসভা ভোটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “বাংলার নির্বাচনের সেই দৃশ্য কেউ ভুলতে পারবে না, যেখানে লাখ লাখ পুলিশ-সেনা মোতায়েন করে এবং নির্বাচনের আগেই কারসাজি করে হাজার হাজার ভোট কেটে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল।” জনগণের মাঝে গিয়ে বিজেপি কোনওভাবেই জিততে পারবে না। তাই তারা নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ভোট চুরির পথ বেছে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন সপা প্রধান। সামনেই উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা ভোট। সেখানেও ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে বিজেপি কারচুপি করে জিততে চাইছে আর এই কাজে জ্ঞানেশ কুমার তাদের সাহায্য করছে বলে অভিযোগ করেন অখিলেশ। তাঁর দাবি, কারচুপি ছাড়া ভোট হলে উত্তরপ্রদেশে বিজেপি হারবে। ভোট চুরি রুখতে তারা প্রস্তুত বলেও দাবি করেন অখিলেশ।
এসআইআর যেন মহাভারতের পাশা খেলা, তেজস্বী
ইন্ডিয়া জোটের আরেক শরিক দল আরজেডি-র প্রধান তেজস্বী যাদব ভোট চুরির কথা বলতে গিয়ে টেনে আনেন মহাভারতের প্রসঙ্গ। সেখানে শকুনির চালে পাশা খেলায় পাণ্ডবদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল তেজস্বীর কথায় তেমন-ই জ্ঞানেশ কুমার, মোদি, শাহের চালে এস আই আর করে বিরোধীদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে জোর করে। তেজস্বী বলেন, এস আই আর শুরু হয়েছিল বিহার থেকে। আরজেডি সহ সেখানকার সব বিরোধী দল এস আই আর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। লাখ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল তথ্য প্রমাণ দিয়ে দেখানো হয়েছিল কী ভাবে বৈধ ভোটারদের নাম কাটা হয়েছে তারপরেও কোনো নাম ফেরানো হয়নি। এরপরেই তেজস্বী বলেন, মহাভারতের যুদ্ধ কিন্তু ময়দানে শুরু হয়নি তা পাশা খেলা থেকে শুরু হয়েছিল, যুদ্ধটা এবার হবে।
যেন স্বাধীনতা সংগ্রাম, বেবি, পুলিশ রাষ্ট্র চলছে, দীপঙ্কর
রবিবার রামলীলায় মেগা কর্মসূচি যোগ দেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি এবং সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের সর্ভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য। দুজনেই মঞ্চ থেকে বক্তব্য রাখেন। ভিড় দেখে উচ্ছ্বসিত বেবি বলেন, “আজকের পরিস্থিতি দেশের জন্য দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। যিনি ভোট চুরি করেছেন, সেই জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতেই হবে।” বেবির কথায়, স্বাধীনতা সংগ্রামে মহাত্মা গান্ধী সত্যের পথ অনুসরণ করেছিলেন, আর এখন নরেন্দ্র মোদী মিথ্যাচারকে অস্ত্র করেছেন। অন্যদিকে দীপঙ্কর বলেন, “রামলীলা ময়দান থেকে বহু বার ইতিহাস নতুন করে লেখা হয়েছে। আজ আমরা ঠিক তেমনই এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছি। বাংলা ও বিহারের মানুষ ইতিমধ্যেই ভুক্তভোগী। আমি আপনাদের সবার কাছে প্রতিরোধের আবেদন জানাচ্ছি।”





