রামলীলা ময়দানে ইন্ডিয়া জোটের বিক্ষোভ

৩৬৫ দিন। দিল্লির রামলীলা ময়দান ইন্ডিয়া জোটের মহাসমাবেশের মঞ্চ থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে হঠানোর ডাক দিলেন ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্বরা। পাশাপাশি দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতেও সোচ্চার হয়েছে ইন্ডিয়া জোট।
এসআইআর করে ওরা বাংলা দখল করেছে, আমরা দিল্লি থেকে ওদের তাড়াব, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘বাংলা এসআইআর প্রক্রিয়ার শিকার হয়েছে। তবুও আমরা কখনও মাথা নত করব না। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্য আমরা প্রাণ দিতেও প্রস্তুত, লড়াইও চালিয়ে যাব। দিল্লি থেকে বাংলাকে লুট করতে দেব না। আমরা গণতন্ত্রকে বাঁচাব, গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনব।আপনারা ইভিএম লুঠ করেছেন, গণতন্ত্র লুঠ করেছেন, সংবিধান লুঠ করেছেন, মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়েছেন, এমনকী ভোট গণনার প্রক্রিয়াটাও লুঠ করেছেন। জ্ঞানেশ কুমারজ্বী, আপনারা শুধু ভোট উধাও করেননি, গোটা ব্যবস্থাটাকে নিজেদের হাতে নিয়ে ভোট গণনার প্রক্রিয়াটাকেও উধাও করে দিয়েছেন।
বাংলার এক কোটিরও বেশি ভোট বাদ দিয়েছেন। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের গণতান্ত্রিক লড়াই চলবে। আমি জ্ঞানেশ কুমারজ্বীকে প্রশ্ন করছি, আপনি কবে উধাও হবেন? আমরা সেই দিনের অপেক্ষায় রয়েছি। ভ্যানিশ ভ্যানিশ? হ্যাঁ পাপা! ভোট চুরি? হ্যাঁ পাপা! ভোট চুরি? হ্যাঁ পাপা! গণতন্ত্র চুরি? হ্যাঁ পাপা! এর পিছনে কে? বিজেপি পাপা! চাকরি চুরি? বিজেপি পাপা! মানুষের সম্মান কেড়ে নেওয়া? বিজেপি পাপা! কৃষকদের অসম্মান? বিজেপি পাপা! শ্রমিকদের বাড়ি-ঘর ভেঙে দেওয়া? বিজেপি পাপা! আমরা কি বিজেপিকে চাই? না পাপা! আমরা কী জ্ঞানেশ কুমারকে চাই? না পাপা।’ একই সঙ্গে মমতার সংযোজন, ‘আপনারা কী লুঠ করেননি? মন্দির লুঠ করেছেন, রাম জন্মভূমির নামে তোলা টাকা লুঠ করেছেন, বাংলার মন্দিরের টাকা লুঠ করেছেন, মানুষের সম্পত্তি লুঠ করেছেন, সরকারি সম্পদ লুঠ করেছেন, সরকারি কোষাগার লুঠ করেছেন। ধর্মের কথা বলেন, অথচ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেন।মানুষের সম্মান, গণতন্ত্র ও সংবিধানের উপর আঘাত করেছেন। আমরা কী এসব চলতে দিতে পারি না। কীভাবে পুলিশকে একটি রাজনৈতিক দলের স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। পুলিশ এখন বিজেপির সঙ্গী হয়ে গিয়েছে। নিজেদের সংগঠনের উপর ভরসা না রেখে বিজেপি রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করছে। আমি পুলিশ ও সমস্ত তদন্তকারী সংস্থাকে বলতে চাই, আপনারা বিজেপির হয়ে কাজ করবেন না। মনে রাখবেন, কোনও সরকারই চিরকাল ক্ষমতায় থাকে না। বিজেপিও চলে যাবে। যাঁরা ক্ষমতার আসনে রয়েছেন, তাঁরা রাজনৈতিক নির্দেশে নয়, আইন মেনে কাজ করুন। আমাকে বলা হচ্ছে, বাড়ির বাইরে বেরোবেন না। ওরা আমাকে ঘরবন্দি করে রাখতে চায়। কিন্তু আমি ভয় পাই না।
গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকারের জন্য আমি আমার আওয়াজ তুলে যাব।গণতান্ত্রিক পথেই আমাদের বিজেপিকে হারাতে হবে। আমরা আমাদের আওয়াজ তুলে যাব, বিজেপি হটাও।’ এদিন বিচার ব্যবস্থার প্রতি মমতার আবেদন, ‘আমি বিচারব্যবস্থার কাছেও আবেদন জানাচ্ছি, গণতন্ত্র রক্ষা করতে এবং মানুষকে ন্যায়বিচার দিতে আপনারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করুন। দেশের মানুষ যেন ন্যায়বিচার পান, তাঁদের যেন কষ্টের মধ্যে ফেলে রাখা না হয়। আমাদের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
বাংলায় ভোট চুরি হয়েছে, অখিলেশ
ভরা রামলীলা ময়দান থেকে ভোট চুরির প্রসঙ্গ টেনে তীব্র আক্রমণ শানান সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব। বাংলার বিধানসভা ভোটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘বাংলার নির্বাচনের সেই দৃশ্য কেউ ভুলতে পারবে না, যেখানে লাখ লাখ পুলিশ-সেনা মোতায়েন করে এবং নির্বাচনের আগেই কারসাজি করে হাজার হাজার ভোট কেটে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’ জনগণের মাঝে গিয়ে বিজেপি কোনওভাবেই জিততে পারবে না। তাই তারা নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ভোট চুরির পথ বেছে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন সপা প্রধান। সামনেই উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা ভোট। সেখানেও ভোটারদের নাম বাদ‌ দিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে বিজেপি কারচুপি করে জিততে চাইছে আর এই কাজে জ্ঞানেশ‌ কুমার তাদের সাহায্য করছে বলে অভিযোগ করেন অখিলেশ। তাঁর দাবি, কারচুপি ছাড়া ভোট হলে উত্তরপ্রদেশে বিজেপি হারবে‌। ভোট চুরি রুখতে তারা প্রস্তুত বলেও দাবি করেন অখিলেশ।
এসআইআর যেন মহাভারতের পাশা খেলা, তেজস্বী
ইন্ডিয়া জোটের আরেক শরিক দল আরজেডি-র প্রধান তেজস্বী যাদব ভোট চুরির কথা বলতে গিয়ে টেনে আনেন মহাভারতের প্রসঙ্গ।‌ সেখানে শকুনির চালে পাশা খেলায় পাণ্ডবদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল তেজস্বীর কথায় তেমন-ই জ্ঞানেশ কুমার, মোদি, শাহের চালে এস আই আর করে বিরোধীদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে জোর করে। তেজস্বী বলেন, এস আই আর শুরু হয়েছিল বিহার থেকে। আরজেডি সহ সেখানকার সব বিরোধী দল এস আই আর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।‌ লাখ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল তথ্য প্রমাণ দিয়ে দেখানো হয়েছিল কী ভাবে বৈধ ভোটারদের নাম কাটা হয়েছে তারপরেও কোনো নাম ফেরানো হয়নি। এরপরেই তেজস্বী বলেন, মহাভারতের যুদ্ধ কিন্তু ময়দানে শুরু হয়নি তা পাশা খেলা থেকে শুরু হয়েছিল, যুদ্ধটা এবার হবে।
যেন স্বাধীনতা সংগ্রাম, বেবি
রবিবার রামলীলায় মেগা কর্মসূচি যোগ দেন সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি। ভিড় দেখে উচ্ছ্বসিত বেবি বলেন, ‘আজকের পরিস্থিতি দেশের জন্য দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। যিনি ভোট চুরি করেছেন, সেই জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতেই হবে।’ বেবির কথায়, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে মহাত্মা গান্ধী সত্যের পথ অনুসরণ করেছিলেন, আর এখন নরেন্দ্র মোদী মিথ্যাচারকে অস্ত্র করেছেন। আপনাদের ফ্যাসিবাদী রাজনীতি ভারতে চলবে না। এটা দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। ফ্যাসিবাদী আরএসএসের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে আমরা ঐক্যবদ্ধ ভাবে লড়াই করছি। ভোট চুরি করা জ্ঞানেশ কুমারকে ইস্তফা দিতে হবে। নরেন্দ্র মোদী অসত্যের মহারাজ। উনি ক্ষমতায় আসার আগে বলেছিলেন দেশের কৃষকের আমদানি দ্বিগুণ হবে। কিন্তু তার বদলে দেশে কৃষকের মৃত্যু দ্বিগুণ হয়েছে। দেশ থেকে এই মিথ্যাবাদী সরকারকে সরাতে হবে।’
অন্যদিকে সিপিআই এমএল এর সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেন, ‘রামলীলা ময়দান থেকে বহু বার ইতিহাস নতুন করে লেখা হয়েছে। আজ আমরা ঠিক তেমনই এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছি। বাংলা ও বিহারের মানুষ ইতিমধ্যেই ভুক্তভোগী। আমি আপনাদের সবার কাছে প্রতিরোধের আবেদন জানাচ্ছি।’
বিজেপি মনে করে ২০১৪ সালে ভারত স্বাধীন হয়েছে, নেহা বোরা
আইসা নেত্রী নেহা বোরা বলেন, ‘বিজেপি মনে করে ২০১৪ সালে ভারত স্বাধীন হয়েছে এবং দেশের ইতিহাস ভাজপা থেকে শেষ হবে। দেশের ইতিহাস নতুন করে লেখা হলে ভাজপার জায়গা আস্তাকুঁড়ে হবে। দেশের মানুষের থেকে ভোট গ্রহণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আপনারা কোন অধিকারে দেশের মানুষকে বলছেন, যে দেশের মানুষ নাগরিকত্ব প্রমাণ করবে। ইংরেজরা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের থেকে পিস বন্ডে সই করিয়েছিল। আজকে ভারতীয় জনতা পার্টি দেশের মানুষকে সেই পিস বন্ডে সই করাতে বলছে। ভাজপা দেশের সেই কলঙ্কিত ইতিহাস আবার পুনরাবৃত্তি করছে। বাংলায় যাদের ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে ৫০ শতাংশ মহিলা। ৭০ শতাংশ মুসলমানদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।’

Scroll to Top