৩৬৫ দিন। সায়ন্তী অধিকারী। সত্যিই কি চোখে দেখা সব কিছু সত্য? কিংবা বারবার বলা একটি মিথ্যেও কি একসময় সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে?রহস্যের জাল, টানটান উত্তেজনা আর দর্শকের অনুমানকে বারবার চ্যালেঞ্জ জানানো ‘দৃশ্যম ৩’ আবারও ফিরিয়ে আনে বিজয় সালগাঁওকরের সেই পরিচিত জগৎ। অজয় দেবগনের অভিনয়ে বিজয় এমন এক চরিত্র, যাঁর প্রতিটি পদক্ষেপের পিছনে লুকিয়ে থাকে নতুন কোনও চাল। আর সেই চালের রহস্য উন্মোচন করাই ছবির অন্যতম বড় আকর্ষণ। ‘দৃশ্যম’ ফ্র্যাঞ্চাইজির সাফল্যের অন্যতম কারণ, এখানে লড়াইটা শুধু পরিবারকে রক্ষা করার নয়। সাধারণ মানুষের উপর চেপে বসা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজের বুদ্ধিকে অস্ত্র করে তোলার গল্পও এটি। বিজয় সেই ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলিকেই কাজে লাগিয়ে নিজের মতো করে খেলার নিয়ম তৈরি করেন। ফলে তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত দর্শককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। ২০১৫ সালে প্রথম ছবিটি যে বুদ্ধির লড়াইয়ের সূত্রপাত করেছিল, তার রেশ আজও এই ফ্র্যাঞ্চাইজির অন্যতম শক্তি। দর্শক জানেন, বিজয়ের অতীতের অন্ধকারে কত রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। তবু তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেই কৌতূহলই ছবির প্রতি মুহূর্তকে আকর্ষণীয় করে তোলে। পরিচিত চরিত্র ও চেনা আবহের মধ্যেও নতুন চমকের সম্ভাবনা দর্শককে শেষ পর্যন্ত আটকে রাখে।
সত্যের নির্মাণেই দৃশ্যম এর আসল জাদু
দৃশ্যম ফ্র্যাঞ্চাইজির অন্যতম বড় শক্তি হল সত্যের ধারণা নিয়ে তার অভিনব পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এখানে সত্য কেবল ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনা নয়, বরং এমন এক বাস্তবতা, যা পরিকল্পিত ভাবে তৈরি করা যায়, মানুষের মনে গেঁথে দেওয়া যায় এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যায়। বিজয় সালগাঁওকর এই খেলায় ব্যবহার করেন সিনেমারই দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান দৃশ্য ও সংলাপ। সিনেমাপ্রেমী বিজয় জানেন, মানুষ যা দেখে এবং যা শোনে, তার উপর নির্ভর করেই অনেক সময় বাস্তব সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। সেই মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগিয়েই তিনি এমন এক সত্যের নির্মাণ করেন, যার বাস্তবে কোনও অস্তিত্বই ছিল না। ছবির এই দিকটিই তাকে সাধারণ থ্রিলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে অন্য মাত্রা দেয়। এখানে রহস্যের সমাধান খোঁজার পাশাপাশি দর্শককে ভাবতে হয়, সত্যিই কি চোখে দেখা সব কিছু সত্য? কিংবা বারবার বলা একটি মিথ্যেও কি একসময় সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে? বিজয়ের
মিথ্যেকে সত্যি করে তোলার খেলায় বিজয়
২০১৫ সালের দৃশ্যম এর দ্বিতীয়ার্ধে বিজয় সালগাঁওকরের বুদ্ধির লড়াই এক অন্য মাত্রা পায়। নিজেকে বাঁচাতে তিনি শুধু মিথ্যে বলেন না, বরং সেই মিথ্যেকে বাস্তবের চেহারা দেওয়ার জন্য গোটা পরিবারকে একটি সাজানো গল্পের মধ্যে বাঁচতে শেখান। পরিবারের প্রত্যেকে সেই কল্পিত ঘটনার অংশ হয়ে ওঠে। বারবার সেই গল্পের পুনরাবৃত্তি করতে করতে একসময় তা আর নিছক মিথ্যে বলে মনে হয় না। বরং তৈরি হয় এমন এক স্মৃতি, যা দৃশ্যমান প্রমাণের মতোই বিশ্বাসযোগ্য। বিজয়ের কৌশলের আসল অভিনবত্ব অবশ্য এখানেই শেষ নয়। তিনি এই সাজানো সত্যকে পরিবারের চার দেওয়ালের বাইরে ছড়িয়ে দেন। দৈনন্দিন কথাবার্তায়, সাধারণ আলাপচারিতায় সেই গল্পের উল্লেখ করতে থাকেন। ফলে ধীরে ধীরে কল্পনাটি মিশে যায় সমাজের স্বাভাবিক কথোপকথনে। সাধারণ মানুষও সেই গল্পের পুনরাবৃত্তি করতে শুরু করেন, যেন তাঁরা নিজের চোখেই ঘটনাগুলি দেখেছেন। এভাবেই মিথ্যে ফিরে আসে সত্যের সমর্থন হয়ে। পরবর্তী পর্বে বিজয় এই কৌশলকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি একটি বই লেখেন, যা সিনেমার মতোই কল্পনাকে নথিতে পরিণত করে। এখানেই দৃশ্যম এর গভীরতা। সত্যকে শুধু আড়াল করা নয়, বরং এমন ভাবে নির্মাণ করা, যাতে সমাজ নিজেই সেই সত্যের সাক্ষী হয়ে ওঠে বিজয়ের বুদ্ধির আসল জাদু সেখানেই। দৃশ্যম ৩ এ বিজয়ের বুদ্ধির খেলায় নতুন মাত্রা যোগ করে হোয়াটসঅ্যাপ। মিথ্যেকে শুধু বলা নয়, ছড়িয়ে দেওয়া, ফরওয়ার্ড করা এবং বারবার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলাই তাঁর কৌশল। এমনকী নিজের সাজানো গল্পকে সত্যি বলে প্রতিষ্ঠা করতে ধর্ম ও ধর্মবিশ্বাসীদের সমষ্টিগত পরিচয়কেও কাজে লাগান তিনি। ফলে ব্যক্তিগত মিথ্যে ক্রমে সামাজিক বিশ্বাসে পরিণত হয়। এখানেই দৃশ্যম পায় রাজনৈতিক তাৎপর্য। প্রচারের কৌশল যেন হয়ে ওঠে এই ফ্র্যাঞ্চাইজির অন্তর্নিহিত ভাষ্য। বিজয় ক্ষমতাবান নন, বরং সাধারণ, স্বল্পশিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষ। অথচ সত্য নির্মাণে তিনি ব্যবহার করেন ক্ষমতাশালীদের চেনা কৌশল ব্যবস্থার ফাঁক কাজে লাগানো, জনসমর্থনের আবহ তৈরি করা এবং বারবার মিথ্যে বলে তাকেই সত্যি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। বুদ্ধির লড়াই তাই শুধু পুলিশকে ফাঁকি দেওয়ার কৌশল নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস, স্মৃতি ও উপলব্ধিকে নিজের মতো করে গড়ে তোলার এক অসাধারণ প্রয়াস। আর এখানেই ‘দৃশ্যম’-এর সিনেম্যাটিক জাদু। সত্য ও মিথ্যার মাঝের সীমারেখাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে ছবিটি দর্শককে মনে করিয়ে দেয়, বাস্তবকে দেখার চোখ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ সেই বাস্তবকে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতাও।
অভিনয়ে জমজমাট,নজর কাড়েন তব্বুও
দৃশ্যম ৩ এর ফের নিজের চেনা ছন্দে অজয় দেবগন। সিনেমাপ্রেমী, ঠান্ডা মাথার বিজয় হিসেবে তিনি বরাবরের মতোই আত্মবিশ্বাসী। আইনের চোখে ধুলো দিয়ে দুধাপ এগিয়ে থাকার যে দক্ষতা তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, তা অজয়ের অভিনয়ে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, প্রকাশ রাজের উপস্থিতি ছবিতে যোগ করে বাড়তি নাটকীয়তা। জয়দীপ আহলাওয়াতও নিজের স্বতন্ত্র অভিনয়ভঙ্গিতে দর্শকের মন জয় করেন। তাঁর অভিনয়ের ছোট ছোট মুহূর্তও মনে থেকে যাওয়ার মতো।তবে ছবির পুরুষ চরিত্রদের দাপটের মাঝেও আলাদা করে নজর কাড়েন তব্বু। সন্তানহারা এক মায়ের অসহায়তা, শূন্যতা এবং অবিশ্বাস তাঁর চোখেমুখে যে ভাবে ফুটে ওঠে, তা ছবির অন্যতম আবেগঘন দিক। যে পৃথিবীতে তাঁর একমাত্র সন্তান আর নেই, সেই বাস্তবকে মেনে নিতে না পারার যন্ত্রণা তব্বু অসাধারণ সংবেদনশীলতায় পর্দায় তুলে ধরেছেন। তাঁর অভিনয় ছবিকে অন্য মাত্রা দেয়।তবে আবহসঙ্গীতের অতিরিক্ত উচ্চতা অনেক সময় দৃশ্যের স্বাভাবিক আবেগকে ছাপিয়ে যায়। গল্প বলার উপর আরও আস্থা রাখলে ছবিটি হয়তো আরও উপভোগ্য হত। তা সত্ত্বেও, দৃশ্যম ৩ একদিকে যেমন একটি অধ্যায়ের সমাপ্তির ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে তেমনই ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দরজাও খুলে রাখে।




