আগুন, মুখোশ, পরচুলার আর্কিটাইপ উদ্দাম লোকউৎসবে সমাজ দর্পণ

পূষন গুপ্তর রিভিউ 
১. আর্কিটাইপ সম্পর্কে যে দু’চার কথা না বললেই নয়। আর্কিটাইপ হলো কোনো ধারণা, বস্তু, চরিত্র বা আচরণের আদি বা আদর্শ রূপ, যা থেকে পরবর্তীতে অনুরুপ বা প্রতিলিপি তৈরি হয়। গ্রিক শব্দ arkhetypon (অর্থ প্রথম ছাঁচ বা মডেল) থেকে এই শব্দটি এসেছে। এদেশে আমরা যাবতীয় লোকসংস্কৃতি মধ্যে এই আর্কিটাইপ পেয়ে থাকি।দেবী দুর্গা বধ করেন মহিষাসুরকে। ছৌ নাচেও আরও গ্রাফিক্যাল চেহারা পাওয়া যায়। দশেরায় কাগজ, কাপড়ের তৈরি কৃত্রিম রাবণকে ছুঁড়ে মারা হয় আগুনের তির। শুভ অশুভের প্রাগৈতিহাসিক লড়াই, যা সভ্যতার আদি থেকে জেনেটিক্যালি আমরা পেয়ে আসছি। এই ছবিতে পরিচালক জুটি সেই রেফারেন্স দেখিয়েছেন। এই ছবিতে লোকউৎসব, নাচ, গান, যাকে বলে আগুন মুখোশ ফরচুলো আর্কিটাইপ হিসাবে বারবার এসেছে। বহুরূপী মানে কিন্তু শুধু মুখোশ নয়, মুখে গালে রঙ মেখে রংচঙে পোশাক পরে। চার হাতের কালী মূর্তি থেকে, চেয়ারে বসা হঠাৎবাবু অথবা রিকশায় বসা মাতাল সাহেব (গত ৫০ বছরে চোখে পড়েনি, ছোটবেলায় মামাবাড়ি রতনবাবু রোডের গেটে, মোজাইক করা বেদিতে বসে ভাসান দেখতাম, তখন মাতাল সাহেবের সং দেখেছি) অনেক ধরনেরই হয়, ডাকাতির স্বার্থে পরিচালকরা মুখোশে একটু বেশি জোর দিয়েছেন। মুখোশ পরে ডাকাতি একটি প্রচলিত অপরাধ পদ্ধতি। এর মধ্যে সেরা ‘মানি হাইস্ট’। কিন্তু এসব তো বহিরঙ্গের ব্যাপার। শুনেছি বহুরূপী অ্যাক্ট, ছবিতে রেফারেন্সও দেখলাম, বহুরূপী সেজে ব্যাঙ্ক ডাকাতি দেখানো হয়েছে। আমি প্রথমটি দেখিনি, তাতে আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি, দ্বিতীয়টি চমৎকার এনজয় করতে। বহিরঙ্গের ডাকাত-পুলিশের লড়াই নারকেলের ছোবড়া মাত্র, ভেতরেই তো যাবতীয় শাঁস। গোটা ছবি জুড়ে লোক সংস্কৃতি ভিত্তি করে বারবার শুভ-অশুভের আর্কিটাইপ লড়াই। শিবের গাজনের মেলায়, স্ট্রিট স্মার্ট দারোগা অয়ন সোনার খোঁজে শিব ঠাকুরের মাটির মূর্তিতে জল ঢেলে গলিয়ে ফেলছে, অন্যের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করতে যে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত নয়, সেই দারোগাকে হতবাক করে, মুণ্ডহীন শিবের মাথার গর্ত থেকে উঠে আসছে নীলবর্ণ শ্রীকৃষ্ণ তথা বিক্রম প্রামাণিক, যে ডাকাতও বটে, আবার অত্যাচারিত সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিও বটে।আমার ধারণা এটি ছবির সেরা দৃশ্য। এই আর্কিটাইপ ছবিটিকে প্রথম শ্রেণির আন্তর্জাতিকতায় পৌঁছে দিয়েছে। এই আর্কিটাইপ না থাকলে এটি হয়তো ৭০ দশকের একটি জমজমাট চোর-পুলিশ সিনেমা হতো, শিল্প হতো না। শিবপ্রসাদ, নন্দিতা প্রমাণ করলেন শিল্পগুণসম্পন্ন ছবিও ভালো ব্যবসা করতে পারে। নিঃসন্দেহে এটি সাম্প্রতিককালের অন্যতম সেরা ভারতীয় ছবি, যা এবারের পুজোয় বাংলায় সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করবে।লুপ্তপ্রায় লোকশিল্পকে পুনর্জন্মদানের জন্য শিবপ্রসাদ, নন্দিতাকে সশ্রদ্ধ অভিনন্দন
২. মুখোশ নিয়ে দু’চার কথা বলা দরকার। পরিচালকরা শুধু দেশীয় মুখোশ নয়, এশিয়ান মুখোশও ব্যবহার করেছেন। ভারতীয় মুখোশে বৈচিত্র্য আছে। কথাকলি থেকে ছৌ, যদিও জটিল মুখোশ (ডেথ মাস্ক)-এ কেবল রোমানদের হাতযশ। রোমে আমার মুখোশে আগ্রহ শুনে প্রকৃত গুণীজন ‘পালাজ্জো মাসিমো’ সংগ্রহশালায় যেতে বলেন। রোমানদের মৃত্যু-মুখোশ কে পরার অধিকারী, অর্থাৎ যিনি প্রয়াতের মুখাবয়বের সবচেয়ে কাছাকাছি (লুক অ্যালাইক), কখন সেই মুখোশধারী ব্যক্তি শোককে ছাড়িয়ে বৃহত্তর বাতাবরণে পৌঁছাতে পারবে, ওই মিউজিয়ামে তার বিস্তৃত ব্যাখ্যা আছে। প্রসঙ্গত, রোমের ‘মুসেই কাপিতোলিনি’তে মৃত্যু মুখোশের বিপুল সংগ্রহ রয়েছে। ‘বহুরূপী’ ছবিতে বহুরূপী কে? মুখোশ না পরেও দারোগা অয়ন, তার অর্থলোলুপ কামনামদির স্ত্রী রেশমি অথবা সিন্ডিকেটের মাফিয়া বস, তারাও কি বহুরূপী নন? শুধু বিক্রম প্রামাণিক, শিউলি আর তার চোর-প্রধান গ্রামের লোকজনকেই কি মুখোশ পরে নিজেদের ভূমিকা পাল্টে ফেলতে হয়? কে মুখে রং মেখে সং সাজছে? চোর না রাষ্ট্র? কার মুখে মুখোশ?
৩. এই চোর-পুলিশের কাহিনি ছকে বাঁধা নয়। বুদ্ধির টক্কর আছে। কিন্তু ‘দৃশ্যম’ নয়। কঠিন বাস্তবের গল্প, কিছু রাজনৈতিক আক্রমণও আছে, কিন্তু তা প্রচারধর্মী নয়। অতি বাস্তব হতে গিয়ে ডকু-ফিচার করার আপ্রাণ চেষ্টা নেই, বরং দিলখোলা বিনোদন। অর্শের কষ্ট যা জজ সাহেবও বোঝেন, বেড়ালের দুধ খাওয়া আর ঝিমলির শ শ উচ্চরণ, সবটাই যেন রূপকথার গল্পের মতো ফ্যান্টাসি। এই নিপুণ হস্তশিল্পের কাঁথাটি বোনা হয়েছে বাংলার লৌকিক অঞ্চলে, বিষ্ণুপুর, বীরভূম, মালদহ; সঙ্গে দু’হাত কাটা ব্যান্ডেজ জড়ানো, বিক্রম প্রামাণিকের ডায়ালেক্টে। ছবির সবকটি গান লোকসঙ্গীতের আঙ্গিকে অথচ প্রচলিত গান টেম্পো বাড়িয়ে বাজানো নয়। একটা চমৎকার ক্রাইম ড্রামাকে যাকে বলে ফোক থ্রিলারে পরিণত করেছেন।পরিচালক দু’জনকে সশ্রদ্ধ অভিনন্দন।
৪. যিশু, কৌশানী, সোহিনী, রজতাভ সকলেই যে যার ভূমিকায় পারফেক্ট। কিন্তু পরিচালক শিবপ্রসাদ যে অভিনয়টা করলেন, তাতে ইন্ডাস্ট্রির সুপারস্টারেরা হেলে যাবেন তো! ভাগ্যিস উনি নিজের ছবি ছাড়া অন্যত্র অভিনয় করেন না, অনেকের বিপদ হতো। ভাত নিয়ে টানাটানি!

Scroll to Top