হিমালয়ের মাথায় চীনের ওয়াটার বম্ব
সামান্য ভূমিকম্প,অতি বৃষ্টিতে পরমাণু বোমার থেকেও ভয়ংকর ধ্বংসলীলা হতে পারে

৩৬৫ দিন। এক বছর আগে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছিলেন হিমালয়ের ১০০ মিটার গভীরে নির্মিত হচ্ছে যে চীনের বিশ্বের বিশ্বের বৃহত্তম হাইড্রো ইলেক্টলেটিকাল প্রজেক্ট ভবিষ্যতে হিমালয়ের ইকোসিস্টেম ও জিওগ্রাফির উপর প্রভাব ফেলতে চলেছে। তিব্বতের ইয়ার্লুং সাংপো নদীর ওপর নির্মাণাধীন মেগা ড্যাম বা সুপার-ড্যাম প্রকল্প। নদীর গ্রেট বেন্ড  এলাকায় হিমালয়ের পাদদেশে এই বিশাল প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে।এই অঞ্চলটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ভূমিকম্পপ্রবণ টেকটনিক ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত, যা এ ধরনের বিশাল অবকাঠামোর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভের সাম্প্রতিক গবেষণায় খোদ চীনা ভূতত্ত্ববিদরাই স্বীকার করেছেন যে, এই মেগা ড্যামটি অত্যন্ত বিপজ্জনক পাইঝেন ফল্ট লাইনএর ঠিক ওপরে অবস্থিত।এই অঞ্চলে তীব্র ভূমিকম্পের ফলে যদি কোনোভাবে বাঁধটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা ভেঙে যায়, তবে ভারত ও বাংলাদেশে প্রলয়ঙ্কারি বন্যা ধেয়ে আসবে। ফলে একটি ও আগ্নেয়াস্ত্র বা বোমা ব্যবহার না করেও পরমাণু বোমার দশগুণ শক্তিশালী এই জমা জল যে কোন সামান্য ভূমিকম্পের ফলে ড্যাম ভেঙে নিচের দিকে নেমে আসবে।
নেপালের এই তাণ্ডব চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, ভূকম্পনপ্রবণ হিমালয় অঞ্চলে সামান্য ৪.৪ মাত্রার একটি মৃদু কম্পন বা একটি সাধারণ হিমবাহ ভাঙার ঘটনাই কত বড় দুর্যোগের কারণ হতে পারে। তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো বা ভারতে যা ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত, তার নামচা বারওয়া বাঁকের ঠিক কাছেই চীন প্রায় ১৬৭ বিলিয়ন ডলার খরচ করে বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধটি নির্মাণ করছে। হিমালয় পর্বতমালা এখনও বয়সে তরুণ, অস্থির এবং প্রায়শই নিজের ভয়াল রূপ দেখিয়ে মানবজাতিকে স্তব্ধ করে দেয়। বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ এই অঞ্চলে সম্প্রতি নেপাল-তিব্বত সীমান্তে এক বিধ্বংসী হিমবাহ ধস ও আকস্মিক হরপাবানে একশোরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন শতাধিক মানুষ, যার মধ্যে বহু ভারতীয় পুণ্যার্থীও রয়েছেন। প্রায় দুই হাজার মিটার উঁচু থেকে নেমে আসা কাদা, পাথর আর জলের দেওয়াল যেভাবে জনপদগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল, তা কেবল নেপালের ক্ষয়ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং আন্তর্জাতিক মহলের চোখ খুলে দিয়েছে আরও এক মারাত্মক বিপদের দিকে। আর সেই বিপদটি হল তিব্বতের মেদগে ভারত সীমান্তের ঠিক ওপরেই চীনের তৈরি করা দানবীয় ৬০,০০০ মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, যাকে বিশেষজ্ঞরা আখ্যা দিচ্ছেন এক ভয়ঙ্কর জলবোমা হিসেবে।
যার ধংসের ক্ষমতা দশটি পরমাণু বোমার সমান। উদ্বেগজনক বিষয় হল, খোদ চীনের নিজস্ব ভূত্বাত্ত্বিক সমীক্ষায় ধরা পড়েছে যে প্রস্তাবিত এই মেদগ ড্যামটি একটি অত্যন্ত সক্রিয় ভূকম্পন ফাটলের ওপর গড়ে উঠছে। এমন একটি সংবেদনশীল ও ভঙ্গুর ভৌগোলিক অবস্থানে এত বিশাল জলরাশি আটকে রাখা যে কোনও দিন উত্তর-পূর্ব ভারতের অরুণাচল প্রদেশ, আসাম এমনকি দূরবর্তী বাংলাদেশের জন্যও সাক্ষাৎ মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সতর্ক করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও কূটনীতিকরা।ভাটির দেশ হওয়া সত্ত্বেও চীন থেকে নেমে আসা এই প্রলয়ঙ্কর জলের কোনও আগাম সতর্কবার্তা পায়নি নেপাল প্রশাসন, যার ফলে বহু নিরীহ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রেও এই একই আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি ঘনীভূত হচ্ছে। চীন ও ভারতের মধ্যে কোনও সামগ্রিক জলবণ্টন চুক্তি না থাকায়, বর্ষার সময় হঠাৎ বাঁধের জল ছেড়ে দেওয়া কিংবা শুষ্ক মৌসুমে নদীর জল আটকে রাখার মতো পরিস্থিতি সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে ব্রহ্মপুত্রের গতিপ্রকৃতি ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রকে। মেদগ বাঁধটিকে ভারতের বিরুদ্ধে ভূ-কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। নেপালের ধ্বংসলীলা তাই ভারতের জন্য কেবল একটি ভৌগোলিক বিপর্যয় নয়, বরং সীমান্তের ওপারে তৈরি হতে থাকা মহাবিপদের এক স্পষ্ট ও কঠোর সতর্কবার্তা।অনেকে এও দাবি করছে, চিন নাকি নেপালকে এত বড় বিপর্যয়ের আগে সতর্ক করতে পারত। কিন্তু তা করেনি। অনেকে দাবি করছে, রাসুওয়াগাধি-গিরং সীমান্ত ক্রসিং এবং গিরং বন্দরের পরিকাঠামো যখন বন্যার ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হলে ভাটির দিকে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হত। নেপালের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম উকেরা-র একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৩০ মিনিট নাগাদ তিব্বতের কেরুং কাউন্টিতে হড়পা বান আছড়ে পড়ে, যা নেপালের সময় অনুযায়ী সকাল ৮টা ১৫ মিনিট। এর প্রায় ৪৫ মিনিট পর সেই হড়পা বান নেপালের ভোটকোশি নদীর উপর দিয়ে ধেয়ে আসে।

Scroll to Top