অজিত দোভালের চিন সফরের আগেই অরুণাচলের মানচিত্র প্রকাশ ভারতের, ভারত জাপান যৌথ সামরিক মহড়ায় চাপে চীন

৩৬৫ দিন। সৌগত মণ্ডল,  বারে বারে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা দখলের জন্য প্রতিবেশী চিন যে চেষ্টা চালিয়ে আসছে এবারে তার পাল্টা জবাব দিল ভারত। ১৯৫৯ সাল থেকে শুরু করে ১৯৬২ সালে ইন্দো-চিন যুদ্ধের পরে যেভাবে ভারতের সীমান্তবর্তী একাধিক এলাকা দখল করে রেখে দিয়েছে লাল চিন, তার মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্ট হিসেবে স্বীকৃত ২৭ এলাকার নাম বদল করে ভারতের মানচিত্রের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া। কয়েকদিন পরেই যেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মুখ্য নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল বেইজিং যাচ্ছেন ভারত এবং চীনের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা নিয়ে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসার জন্য, সেই আবহে এই ঘটনা রীতিমত তাৎপর্যপূর্ণ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফ থেকে প্রকাশিত এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, অরুণাচল প্রদেশ সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মানচিত্রে এই স্থানগুলির নাম ও ভৌগোলিক অবস্থান নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করার মূল উদ্দেশ্য হল, দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই অঞ্চলগুলি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং এগুলির ভৌগোলিক অস্তিত্ব সুনিশ্চিত করা।
২৭ জায়গার নামকরণ ভারতের
অরুণাচল প্রদেশের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা সংলগ্ন ২৭টি জায়গাকে কাল্পনিক নাম দিয়ে নিজেদের বলে দাবি করেছিল চিন। এবার চিনের দাবি করা সেই জায়গাগুলিকেই মানচিত্রে চিহ্নিত করল ভারত। ওই ২৭ জায়গা যে ভারতেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা স্পষ্ট করে দেওয়া হল ভারতের তরফে। ২০১৭ সাল থেকে দফায় দফায় কৌশল নেওয়া হয়েছে চিনের তরফে। অভিযোগ, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর গ্রাম-গিরিপথ-হ্রদ দখলের ছক কষেছে চিন। বিভিন্ন সময় সীমান্ত সংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামকে নিজেদের বলে দাবি করেছে। এমনকী ওই গ্রামগুলিতে কাল্পনিক নামও বসাতে শুরু করে। এবার ভারত সরকারের তরফে সার্ভে অফ ইন্ডিয়া একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছে। একইসঙ্গে জানানো হয়েছে, চিনের দাবি একেবারেই ভিত্তিহীণ। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এমন কিছু গ্রাম রয়েছে, যা ১৯৬২ সালে ভারত-চিন যুদ্ধের সময় দখল করেছিল বেজিং। পরবর্তী ক্ষেত্রে সেই গ্রামকে নিজেদের দখলে নিয়ে আসে। সেইসব জায়গাগুলি ম্যাপে চিহ্নিত করে শুধু চিন নয়, আন্তর্জাতিক মহলকে বিশেষ বার্তা দিতে চাইল ভারত সরকার। এমনটাই মত কূটনৈতিক মহলের।
বেইজিং যাচ্ছেন অজিত দোভাল
ভারত এবং চীনের মধ্যে সীমান্তবর্তী অরুনাচল প্রদেশ নিয়ে এই টানাপোড়েনের আবহে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই বেইজিং সফরে যাচ্ছেন দেশের মুখ্য নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল।‌ মূলত ২ দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিভিন্ন এলাকা দখলে রাখা এবং নামকরণ করা নিয়ে যে সমস্যা গত কয়েক বছরে তৈরি হচ্ছে তার প্রেক্ষিতে নিজেদের অধিকার সুনির্দিষ্ট করার জন্যই এই আলোচনা হবে বলে প্রাথমিকভাবে স্থির হয়েছে দুই দেশের বিদেশ মন্ত্রকের আলোচনায়।
চলতি মাসেই ভারত জাপান যৌথ সামরিক মহড়া
অরুণাচল সীমান্তে চীনের দখলে থাকা এলাকার নামকরণ করে একদিকে যেমন চীনের চিন্তা বাড়িয়েছে ভারত, তার পাশাপাশি সব থেকে বেশি চিন্তা বাড়িয়েছে চীনের চিরশত্রু বলে পরিচিত জাপানের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিকতম সামরিক মিত্রতার সম্পর্ক বৃদ্ধি পাওয়ায়। জাপানের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে গত বছরই শপথ নেন সানায়ে তাকাইচি। এরপরেই গত মাসের অর্থাৎ জুলাইয়ে ভারতের আসেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশেষ আমন্ত্রণে ১৬তম ভারত-জাপান বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমার ছোট বোন বলে বারে বারে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর এই আলোচনাতেই ২ দেশের সামরিক সম্পর্ক বাড়ানোর পাশাপাশি চিনা ড্রাগনকে আটকানোর জন্য ভারত এবং জাপানের সামরিক মহড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
দুই দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর স্তরে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে চীন যেমন ভারত সীমান্তে সামরিক রণসজ্জা করে চাপ তৈরি করতে চাইছে তার পাল্টা চাপ দিতে ভারত এবং জাপানের যৌথ সামরিক শক্তির মহড়া দেখানো হবে চীনকে। এই ঘটনাটিকে চিনের সরকারি মিডিয়া গ্লোবাল টাইমস বেজিংয়ের বিরুদ্ধে নয়াদিল্লির সঙ্গে সামরিক সমন্বয় জোরদার করার ক্ষেত্রে টোকিওর প্রচেষ্টা হিসাবে বিবেচিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই গ্লোবাল টাইমসে এই সম্পর্কিত একটি বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি আগামী ১৭ অগাস্ট থেকে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া সফরে যাবেন বলে। নয়াদিল্লি সফরে এসে শিনজিরো কোইজুমি ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। যেখানে জাপান এয়ার সেলফ-ডিফেন্স ফোর্স-এর প্রস্তাবিত এফ-২ যুদ্ধবিমান মোতায়েনের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দ্বিপাক্ষিক প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে এটিই হবে জাপানি যুদ্ধবিমানের প্রথম মোতায়েন। আর চীনকে প্রতিহত করার জন্য মোদি সরকারের এই আন্তর্জাতিক কৌশল রীতিমতো চাপ তৈরি করেছে কমিউনিস্ট চিনের উপরে।

Scroll to Top