৩৬৫ দিন। চেস্টার, ২৩ সেপ্টেম্বর একসময় শহরের খবর, রাজার ফরমান, নতুন আইন, হারানো জিনিসের খবর;সবকিছুই মানুষের কাছে পৌঁছত এক বিশেষ মানুষের গলায়। হাতে ঘণ্টা, গায়ে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক, সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে ঘোষণা;‘ওয়েইজ! ওয়েইজ! ওয়েইজ!’ সেই বহু পুরনো ঐতিহ্যই গতকাল নতুন রূপে ফিরে এল ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক শহর চেস্টারে। শুরু হল ২০২৬ বিশ্ব টাউন ক্রায়ার টুর্নামেন্ট। ২০১৪ সালের পর প্রথমবার চেস্টার এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে। বিশ্বের আটটি দেশ থেকে ২৫ জন ঘোষক এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন। শহরের টাউন হল স্কোয়ারে প্রথম দিনের প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল ‘হোমটাউন ক্রাই’; অর্থাৎ নিজের শহরকে নিয়ে ঘোষণা। প্রতিযোগীদের শুধু জোরে চিৎকার করলেই চলবে না।
কণ্ঠের শক্তি, উচ্চারণের স্বচ্ছতা, আত্মবিশ্বাস, উপস্থাপনা, ঘোষণার বিষয়বস্তু এবং দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ; সবকিছুর বিচার হচ্ছে। চার সদস্যের বিচারকমণ্ডলী প্রতিটি পরিবেশনা মূল্যায়ন করছে। পোশাকও এই ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; তাই সেরা পোশাকের জন্যও রয়েছে বিশেষ পুরস্কার। এবারের প্রতিযোগিতায় ইংল্যান্ডের পাশাপাশি রয়েছে চ্যানেল আইল্যান্ডস, বেলজিয়াম, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং আমেরিকার ঘোষকরা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার জুডি ক্যাম্পবেল, কানাডার ২৫ বছরের সামার গ্যালান্ট এবং বিভিন্ন ব্রিটিশ শহরের অভিজ্ঞ ঘোষকেরা। গ্যালান্টের অংশগ্রহণ বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে, কারণ তিনি মাত্র কয়েক মাস আগে টাউন ক্রায়ারের দায়িত্ব নিয়েছেন। এই পেশার ইতিহাস অবশ্য প্রতিযোগিতার চেয়েও অনেক পুরনো। মধ্যযুগীয় ইউরোপে যখন সাধারণ মানুষের বড় অংশ লিখতে-পড়তে পারতেন না, তখন শহরের ঘোষক ছিলেন জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যবাহক। ঘণ্টা বাজিয়ে মানুষকে জড়ো করে তিনি রাজকীয় নির্দেশ, স্থানীয় আইন, বাজারের খবর, সরকারি ঘোষণা কিংবা জরুরি সংবাদ পড়ে শোনাতেন। ‘ওয়েইজ’ শব্দটির উৎস ফরাসি, যার অর্থ ‘শুনুন’। ঘোষণার আগে এই ডাক দিয়েই মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করা হত। চেস্টারের সঙ্গে এই ঐতিহ্যের সম্পর্ক আরও গভীর। শহরের টাউন ক্রায়ার প্রথার ইতিহাস ১৫৫৪ সাল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আজও গ্রীষ্মের মরসুমে চেস্টারে নিয়মিত ঘোষণার ঐতিহ্য বজায় রয়েছে। শহরের ক্রস এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ে ঘোষকের উপস্থিতি এখন পর্যটকদের কাছেও একটি আকর্ষণ। ডেভিড এবং জুলি মিচেল এই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন; তাঁরা শহরের নাগরিক অনুষ্ঠান ও বিশেষ অতিথিদের স্বাগত জানানোর পাশাপাশি ১৫টি ভাষায় নাগরিক অভ্যর্থনাও করেন।
চেস্টারে গতকালের আয়োজন তাই নিছক ‘কে সবচেয়ে জোরে চিৎকার করতে পারেন’; তার পরীক্ষা ছিল না। ঘণ্টার শব্দ, ঐতিহাসিক পোশাক, পতাকা, পুরনো শহরের স্থাপত্য আর দর্শকদের উচ্ছ্বাস মিলে তৈরি হয়েছিল এক অভিনব দৃশ্য। আধুনিক সংবাদমাধ্যম, মোবাইল ফোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে দাঁড়িয়ে কয়েক শতাব্দী পুরনো মৌখিক ঘোষণার শিল্পকে নতুন করে মঞ্চে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। প্রতিযোগিতা অবশ্য একদিনেই শেষ হচ্ছে না। ২৪ সেপ্টেম্বর ইস্টগেট স্কোয়ারে ‘রিটেল ক্রাই’ পর্ব এবং ২৬ সেপ্টেম্বর এক্সচেঞ্জ স্কোয়ারে চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। তিন পর্বের সম্মিলিত ফলের ভিত্তিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হবে। রয়েছে ‘সেরা রাষ্ট্রদূত’, সেরা পোশাক, সেরা জুটি-সহ একাধিক বিশেষ পুরস্কারও। চেস্টারের কাছে এই আয়োজন আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। রোমান প্রাচীর, মধ্যযুগীয় স্থাপত্য এবং বিখ্যাত ‘দ্য রোজ’-এর শহরটি নিজের ইতিহাসকে পর্যটনের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করছে। বিশ্বজুড়ে ২৫ জন ঘোষকের গলা এখন সেই ইতিহাসেরই নতুন শব্দ;‘ওয়েইজ! ওয়েইজ! ওয়েইজ!’
আইজ আইজ আইজ, ইংল্যান্ডের চেস্টারশহরে ১০ দেশের ঘোষকদের প্রতিযোগিতা




