রিতু বেরির প্যারিস শো’তে তাঁতবস্ত্রের সঙ্গে আদিবাসী পোশাকের ভ্রমণ

৩৬৫ দিন।প্যারিসের ঝলমলে পোশাকমঞ্চে এবার নজর কেড়েছে ভারতের তাঁতশিল্প। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নকশাশিল্পী ঋতু বেরির নতুন প্রদর্শনীতে ভারতীয় হাতবোনা কাপড়ের সঙ্গে বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের নকশা ও শিল্পঐতিহ্যের অভিনব মেলবন্ধন ইউরোপের রুচিবান দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। আধুনিক পোশাকের ভাষায় দেশীয় ঐতিহ্যের এই উপস্থাপনা এখন ইউরোপের পোশাকজগতে আলোচনার অন্যতম বিষয়
ঋতু বেরির সংগ্রহে উঠে এসেছে ভারতের নানা প্রান্তের তাঁত, সূচিশিল্প ও প্রাচীন অলংকরণরীতি। বিশেষ আকর্ষণ ছিল আদিবাসী শিল্পভাবনা থেকে নেওয়া নকশা, রঙের ব্যবহার এবং প্রকৃতিনির্ভর নান্দনিকতা। এই মেলবন্ধন শুধু পোশাকের সৌন্দর্য বাড়ায়নি, ভারতীয় সংস্কৃতির গভীর শিকড়কেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুনভাবে তুলে ধরেছে।

প্যারিসের প্রদর্শনীতে উপস্থিত ক্রেতা, পোশাকসমালোচক এবং শিল্পবিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বিশ্বজুড়ে দ্রুত বদলে যাওয়া পোশাকরুচির মধ্যে এখন টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং ঐতিহ্যনির্ভর বস্ত্রের চাহিদা বাড়ছে। সেই কারণেই ভারতের হাতবোনা কাপড় এবং প্রাকৃতিক রঙে তৈরি পোশাক ইউরোপের বাজারে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, একসময় ভারতীয় তাঁতকে মূলত উৎসব বা ঐতিহ্যবাহী পোশাকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ মনে করা হত। কিন্তু এখন সেই ধারণা বদলেছে। আধুনিক কাট, নতুন বিন্যাস এবং আন্তর্জাতিক রুচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভারতীয় বস্ত্রকে উপস্থাপন করায় তরুণ প্রজন্মের কাছেও এর গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়ছে।প্যারিসের প্রদর্শনীতে সবচেয়ে বেশি প্রশংসা কুড়িয়েছে আদিবাসী নকশা থেকে অনুপ্রাণিত সূক্ষ্ম কারুকাজ। পোশাকে ফুটে উঠেছে পাহাড়, বন, নদী, বন্যপ্রাণী এবং লোকজ জীবনের নানা চিত্র। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে রঙ ও রেখার মাধ্যমে তুলে ধরার এই প্রচেষ্টা দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা ইতিমধ্যেই এই সংগ্রহের পোশাকের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

ভারতের তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের জন্যও এই সাফল্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন শিল্পমহল। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়লে গ্রামীণ তাঁতশিল্প, হস্তশিল্প এবং আদিবাসী শিল্পীদের কাজের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিলুপ্তপ্রায় বহু নকশা ও শিল্পরীতির পুনর্জাগরণের সম্ভাবনাও বাড়বে।
ফ্যাশনের ভাষা আজ আর কেবল সৌন্দর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার সঙ্গে জুড়ে গেছে সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং মানুষের জীবনযাত্রার গল্প। ঋতু বেরির সাম্প্রতিক উপস্থাপনা সেই বার্তাই আরও একবার স্পষ্ট করে দিল। বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় তাঁত এবং আদিবাসী শিল্পঐতিহ্যের এই সম্মিলিত উপস্থিতি প্রমাণ করল, দেশীয় ঐতিহ্যকে আধুনিক রূপে উপস্থাপন করতে পারলে তা আন্তর্জাতিক রুচির কেন্দ্রবিন্দুতেও স্থান করে নিতে পারে।
পোশাকবিশ্বের পর্যবেক্ষকদের ধারণা, প্যারিসের এই সাফল্যের পর ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ভারতীয় হাতবোনা কাপড় এবং আদিবাসী নকশাভিত্তিক পোশাকের চাহিদা আরও বাড়বে। ফলে ভারতীয় তাঁতশিল্পের সামনে খুলে যেতে পারে নতুন আন্তর্জাতিক বাজার, আর দেশীয় কারিগরদের হাতে পৌঁছাতে পারে আরও বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।

Scroll to Top