পুজোর আগেই বাংলায় শিল্পের বড় চমক! হলদিয়া পেট্রোকেমে ৬ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ মুখ্যমন্ত্রীর

৩৬৫ দিন। হলদিয়া, পূর্ব মেদিনীপুর। পুজোর মুখে বাংলার শিল্পক্ষেত্রে বিরাট পদক্ষেপ এর ঘোষণা করলো হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যাল। পূর্ব মেদিনীপুরের শিল্পশহর হলদিয়ায় ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে উঠেছে ফেনল ও অ্যাসিটোন উৎপাদন কেন্দ্র। বুধবার এই বৃহৎ শিল্প প্রকল্পের উদ্বোধন করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস লিমিটেডের কর্ণধার পূর্ণেন্দু চ্যাটার্জী সহ অন্যান্য বিশিষ্ট জনেরা। হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস লিমিটেডের সহযোগী সংস্থা অ্যাডপ্লাস পলিমার্স অ্যান্ড কেমিক্যালসের অধীনে গড়ে উঠেছে এই প্রকল্প। দেশের বৃহত্তম ফেনল উৎপাদন ইউনিট হিসেবে এই কারখানা ভারতের রাসায়নিক শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে।
শিল্পমহলের মতে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের রাসায়নিক উৎপাদন ক্ষমতা আরও বাড়বে। বিশেষ করে ফেনল ও অ্যাসিটোনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিকের ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে দেশীয় উৎপাদন বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সম্ভাবনাও আরও প্রসারিত হতে পারে। এই প্রসঙ্গে হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের কর্ণধার পূর্ণেন্দু চ্যাটার্জী বলেন, ‘এইচসিএলকে যদি এক কথায় প্রকাশ করা যায়, তাহলে অগ্নিপরীক্ষা। এইচপিএল পাঁচ থেকে সাত লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। বাংলা স্বয়ংসম্পূর্ণ হবার সমস্ত সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের আরো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। প্রত্যেক জেলায় পলি পার্ক গঠন করা হবে। আমরা ফুড টেকনোলজি নিয়ে কাজ করছি। আমরা বিকশিত ভারতের পাশাপাশি বিকশিত বাংলা গঠন করার উদ্দেশ্য নিয়ে চলেছি।’
কী কাজে লাগে ফেনল?
ফেনল একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প-রাসায়নিক উপাদান। ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্প, বিভিন্ন ধরনের রেজিন, প্লাস্টিক, রং ও পেইন্ট, আঠা বা অ্যাডহেসিভ এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্পের নানা উপকরণ তৈরিতে ফেনল ও তার থেকে উৎপাদিত রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। ফলে এই কারখানায় উৎপাদন শুরু হলে বিভিন্ন সহযোগী ও পরবর্তী পর্যায়ের শিল্পের জন্য কাঁচামালের জোগান আরও সহজ হতে পারে।
দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানি নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য
বর্তমানে বহু গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিকের চাহিদা মেটাতে ভারতকে বিদেশি সরবরাহের উপর নির্ভর করতে হয়। হলদিয়ার এই নতুন প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হল দেশে রাসায়নিক উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানি নির্ভরতা কমানো। দেশীয় শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল দেশে উৎপাদিত হলে সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার প্রভাবও কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। এই প্রকল্পে ফেনল উৎপাদনের পাশাপাশি অ্যাসিটোন উৎপাদনের ব্যবস্থাও রয়েছে। একই সঙ্গে, প্রকল্পের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল ওলেফিন কনভার্সন প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রোপিলিন উৎপাদনের বিশেষ ইউনিট। এই প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা দেশের পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।
কর্মসংস্থান ও হলদিয়ার শিল্প মানচিত্রে নতুন সম্ভাবনা 
হলদিয়া দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকেন্দ্র। পেট্রোকেমিক্যালস, বন্দর এবং বিভিন্ন উৎপাদন শিল্পকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। নতুন এই বৃহৎ প্রকল্পকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি পরিবহণ, সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পরিষেবা ক্ষেত্রেও কাজের সুযোগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রকৃত কর্মসংস্থানের পরিমাণ নির্ভর করবে প্রকল্পের পরিচালন ব্যবস্থা, উৎপাদনের মাত্রা এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পের সম্প্রসারণের উপর।
আত্মনির্ভর ভারতের লক্ষ্যে আরও এক ধাপ 
দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিকের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিদেশি আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো—এই বৃহৎ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ভবিষ্যতে উৎপাদন ও বাজারের পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে রপ্তানির ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। ৯৮ একর জমির উপর পেপসির নতুন প্ল্যান্ট তৈরি হবে, ৫০ একর জমির উপর মেডিকেল ইকুইপমেন্ট তৈরি করবে প্রভিস কোম্পানি, মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি এদিন অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন রাজ্যে আটানব্বই একর জমির উপর গড়ে উঠছে পেপসির প্লান্ট।
মেডিকেল ইকুইপমেন্ট তৈরীর জন্য প্রভিস কোম্পানি ৫০ একর জমির উপর তাদের প্ল্যান্ট করে তুলবে। পাশাপাশি হলদিয়া এনার্জির সঞ্জীব গোয়েনকা হলদিয়ার প্ল্যান্টের অতিরিক্ত জমিতে আরেকটি প্ল্যান্ট গঠন করতে উদ্যোগী হয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস ইতিমধ্যেই ৬০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। পাইপ লাইনে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা রয়েছে। আমি যখন প্যান্ট পরিদর্শন করছিলাম, তখন পূর্ণেন্দু চ্যাটার্জি আমাকে বলছিলেন, আপনি ছেলেমেয়েদের স্কিল ট্রেনিং দিন। আমাদের ক্যাম্পাসিং চালু করতে হবে। এই প্ল্যান্টে বিনিয়োগের ফলে ৪০০ কর্মসংস্থান হয়েছে সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে ১০০০ কর্মসংস্থান হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ভাতা নির্ভর হয়ে গেছে, এই জায়গা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের আত্মনির্ভর হতে হবে। পূর্ণেন্দু চ্যাটার্জীকে অনুরোধ করব বাংলায় একটি ডাটা সেন্টার করুন, রাজ্য সরকার সব রকম সহযোগিতা করবে। ৯৮ একর জমির ওপর পেপসির একটি নতুন প্ল্যান আমরা করছি। ৫০ একর জমির উপর মেডিকেল ইকুইপমেন্ট তৈরির জন্য প্রভিস কোম্পানিকে জমি দেওয়া হচ্ছে। হলদিয়া এনার্জির সঞ্জীব গোয়েনকা সেখানকার অতিরিক্ত জমিতে একটি প্ল্যান্ট গঠন করতে চান। হলদিয়ায় উন্নতমানের ট্রমা কেয়ার সেন্টার তৈরি করা হবে।’

Scroll to Top