রিকশা সিরিজের ভাবনা সেখান থেকেই দেশের পঞ্চম দামি ছবি রিকশাওয়ালা

৩৬৫ দিন। কলকাতার সরু গলি। ঘামে ভেজা শরীর। হাতে রিকশার দণ্ড। যাত্রীর ভার টানতে টানতে এগিয়ে চলেছেন এক মানুষ। শহরের কাছে তিনি যানবাহনের চালক, কিন্তু শিল্পীর চোখে তিনি যেন গোটা মানবসভ্যতার ক্লান্তি, অসহায়তা আর বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রামের প্রতীক। এই মানুষটিকেই ক্যানভাসে বারবার ফিরিয়ে এনেছিলেন আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম প্রধান শিল্পী তায়েব মেহতা। তাঁর আঁকা ‘রিকশা পুলার’ সম্প্রতি নিলামে বিক্রি হয়েছে ৬৯ কোটি ১০ লক্ষ টাকায়। ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর শেষ হওয়া এই বিক্রি শিল্পীর নিজের নিলাম-রেকর্ড ভেঙেছে। ছবিটি শুধু বিপুল অর্থমূল্যের কারণে আলোচনায় নয়, ভারতীয় শহুরে জীবনের এক কঠিন বাস্তবকে শিল্পের আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার কারণেও গুরুত্বপূর্ণ।
১. তায়েব মেহতা জীবন ও শিল্পযাত্রা
১৯২৫ সালে গুজরাটের কাপড়বঞ্জে জন্ম তায়েব মেহতার। শৈশব ও কৈশোরের অভিজ্ঞতা, দেশভাগের হিংসা এবং মানুষের দুর্দশা তাঁর শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ১৯৪৭ সালে মুম্বইয়ের স্যার জে জে শিল্পবিদ্যালয়ে তাঁর শিল্পশিক্ষার সূচনা। পরবর্তী সময়ে তিনি যুক্ত হন প্রগতিশীল শিল্পীগোষ্ঠীর ভাবধারার সঙ্গে। এই গোষ্ঠীর শিল্পীরা ভারতীয় শিল্পকে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও প্রচলিত রীতির বাইরে এনে আধুনিকতার নতুন ভাষা দিতে চেয়েছিলেন। তায়েবের শিল্পজীবনে ছিল নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কখনও মানুষের শরীর, কখনও বাঁধা ষাঁড়, কখনও শূন্যে পতনশীল অবয়ব, আবার কখনও পৌরাণিক চরিত্র;সব ক্ষেত্রেই তিনি খু ঁজেছেন মানুষের অস্তিত্বের সংকট। তাঁর ছবিতে জ্যামিতিক বিভাজন, দৃঢ় কালো রেখাতীব্র রঙের ক্ষেত্র এবং অস্বস্তিকর নৈঃশব্দ্য এক স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি করে। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডনে ছিলেন। পরে নিউইয়র্কেও কাজের সুযোগ পান। ২০০৯ সালে তাঁর মৃত্যু হলেও ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলায় তাঁর প্রভাব আজও অমলিন।
২. তিনি কি কলকাতায় থেকেছিলেন?
হ্যাঁ, কলকাতার সঙ্গে তায়েব মেহতার সম্পর্ক ছিল বিশেষ। তবে তাঁর জীবনের প্রধান স্থায়ী ঠিকানা ছিল মুম্বই। কলকাতায় তাঁর শিকড় গড়ে ওঠে শৈশবের স্মৃতি ও পরবর্তী শিল্প-অভিজ্ঞতার সূত্রে। ছোটবেলায় গ্রীষ্মের ছুটিতে তিনি কলকাতায় ঠাকুমার কাছে আসতেন। সেই সময় শহরের হাতে টানা রিকশাতার চালকদের শারীরিক শ্রম এবং শহরের অলিগলির দৃশ্য তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলে। ১৯৮৩ সালে তিনি শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতে শিল্পী-আবাসিক হিসেবে আমন্ত্রিত হন এবং সেখানে প্রায় দুই বছর কাটান। এই সময়ের রিকশা-চিত্রের অভিজ্ঞতা ভাবনাকে তাঁর আরও গভীর করে। অতএব, কলকাতা তাঁর কাছে কেবল একটি শহর ছিল না; ছিল মানুষের শ্রম, দারিদ্র্য এবং অস্তিত্বের এক জীবন্ত পাঠশালা।
৩. কলকাতার রিকশা কীভাবে তাঁর ছবির বিষয় হয়ে উঠল?
কলকাতার হাতে টানা রিকশা পৃথিবীর বহু শহরের যানবাহনের থেকে আলাদা। এখানে মানুষই মানুষকে টেনে নিয়ে যায়। এই দৃশ্যের মধ্যে যেমন জীবিকার বাস্তবতা আছে, তেমনই রয়েছে শ্রমের অসম বণ্টন ও সামাজিক বৈষম্যের নির্মম চিত্র। তায়েব মেহতা রিকশাচালককে নিছক একটি দৃশ্যমান চরিত্র হিসেবে আঁকেননি। তাঁর কাছে রিকশা হয়ে উঠেছিল মানুষের বন্দিদশার প্রতীক। রিকশার কাঠামো এবং চালকের শরীর যেন একাকার হয়ে যায়। মানুষটি কোথাও আটকে আছে;তার চলার পথ আছে, কিন্তু স্বাধীনতা সীমিত। ১৯৬০-এর দশক থেকেই রিকশাচালক তাঁর শিল্পে ফিরে ফিরে এসেছে। ২০০২ সালের ‘রিকশা পুলার’ ছবিতেও সেই ক্লান্ত, একাকী মানুষের উপস্থিতি প্রবল। এখানে বাস্তব দৃশ্যের অনুকরণ নয়, বরং কয়েকটি রেখা, রঙের বিভাজন এবং শরীরের ভাঙা অবয়বের মধ্য দিয়ে শ্রমজীবী মানুষের মানসিক ও শারীরিক ভার প্রকাশ পেয়েছে। এই কারণেই ছবিটি কলকাতার একটি পরিচিত দৃশ্যকে অতিক্রম করে বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে। শহর বদলায়, যানবাহন বদলায়, কিন্তু শ্রমের বোঝা বহন করা মানুষের সংকট থেকে যায়।
৪ নিলামে ৬৯ কোটি ১০ লক্ষ টাকা
২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর ‘রিকশা পুলার’ নিলামে ৬৯ কোটি ১০ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়। এই মূল্য শিল্পীর আগের রেকর্ড—২০২৫ সালে ‘ট্রাসড বুল’ ছবির ৬১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা—ছাড়িয়ে যায়। ক্রেতার অতিরিক্ত মাশুল-সহ ঘোষিত এই মূল্য তাইয়েব মেহতার শিল্পের বাজারদরের নতুন শিখর। এই বিক্রি দেখায়, ভারতীয় আধুনিক শিল্প এখন আন্তর্জাতিক সংগ্রাহকদের কাছে কতটা মূল্যবান। তবে ছবির তাৎপর্য কেবল অর্থে মাপা যায় না। যে রিকশাচালক জীবনের প্রায় সমস্ত সময় শ্রমের বিনিময়ে সামান্য উপার্জন করেন, তাঁর প্রতীকী…
তবে ছবিটির তাৎপর্য শুধু অর্থমূল্যে মাপা যায় না। যে রিকশাচালক জীবনের প্রায় সমস্ত সময় শ্রমের বিনিময়ে সামান্য উপার্জন করেন, তাঁর প্রতীকী উপস্থিতিই আজ কোটি কোটি টাকার শিল্পসম্পদ।
5. নিলামে সর্বোচ্চ মূল্য পাওয়া আরও পাঁচটি ভারতীয় চিত্রকর্ম
– ক. ‘যশোদা অ্যান্ড কৃষ্ণ’ — রাজা রবি বর্মার ১৮৯০-এর দশকের এই তৈলচিত্রটি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ১৬৭ কোটি ২০ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়। ভারতীয় শিল্পকর্মের নিলামমূল্যে এটি একটি নতুন রেকর্ড গড়ে।
– খ. ‘গ্রামযাত্রা’ — এম. এফ. হুসেনের ১৯৫৪ সালের এই বৃহৎ চিত্রকর্মটি ২০২৫ সালের মার্চে প্রায় ১১৮ কোটি ৯০ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়। গ্রামীণ ভারতের জীবন ও মানুষের চলাচল এর বিষয়।
– গ. ‘আনটাইটেলড’ — ভি. এস. গাইতোণ্ডের একটি বিমূর্ত চিত্রকর্ম ২০২৫ সালে প্রায় ৬৭ কোটি ৮০ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়। রং, স্তর ও নৈঃশব্দ্যের ব্যবহারে তাঁর শিল্পভাষা অনন্য।

– ঘ. ‘ট্রাসড বুল’ — তায়েব মেহতার ১৯৫৬ সালের এই ছবিতে বাঁধা ষাঁড়ের অবয়বের মধ্য দিয়ে শক্তি ও বন্দিত্বের সংঘাত প্রকাশ পেয়েছে। ২০২৫ সালে এর নিলামমূল্য ছিল ৬১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা।
– ঙ. ‘দ্য স্ট্যাবিলিটেলার’ — অমৃতা শের-গিলের ১৯৩৭ সালের এই চিত্রকর্মটি ২০২৩ সালে ৬১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়। ভারতীয় গ্রামীণ জীবনের মানুষ ও তাঁদের নীরব উপস্থিতি ছবিটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
তায়েব মেহতার ‘রিকশা পুলার’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিল্পের বড় শক্তি পরিচিত দৃশ্যকে নতুন চোখে দেখতে শেখানো। কলকাতার রাস্তায় রিকশা টানতে থাকা মানুষটির শরীরে তিনি দেখেছিলেন সময়ের ভার, সমাজের বৈষম্য এবং মানুষের অবিরাম লড়াই। নিলামে ছবিটির মূল্য ৬৯ কোটি ১০ লক্ষ টাকা হলেও, এর প্রকৃত মূল্য হয়তো আরও গভীরে—একজন শ্রমজীবী মানুষের নীরব যন্ত্রণাকে পৃথিবীর সামনে দৃশ্যমান করে তোলার মধ্যে।
‘বুল অন আ রিকশা’ তায়েব মেহতার ছবিতে বন্দিদশা, যন্ত্রণা ও মানুষের অসহায়তা তায়েব মেহতার রিকশা-চিত্রের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ কাজ ১৯৯৯ সালের। এখানে কলকাতার রিকশা আর তার চালকের পরিচিত দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাঁধা, ছটফট করতে থাকা এক ষাঁড়। এই সংমিশ্রণ নিছক অদ্ভুত কল্পনা নয়; শিল্পীর সমগ্র শিল্পজীবনে ফিরে আসা দুটি প্রতীকের মুখোমুখি সংঘর্ষ;রিকশা এবং বন্দি ষাঁড়। ষাঁড়টি এখানে কীসের প্রতীক? তায়েবের শিল্পে ষাঁড় শক্তি, প্রাণশক্তি ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিন্তু তার পা যখন বাঁধা, শরীর যখন মাটিতে আছড়ে পড়ার উপক্রম, তখন সেই শক্তিই পরিণত চিত্রকর্ম সম্পর্কে সমালোচকরা কী বলেন? ‘বুল অন আ রিকশা’য় এই ভাবনা আরও তীব্র।
যে রিকশা সাধারণত মানুষ টানে, তার ওপরেই শুয়ে আছে একটি বাঁধা ষাঁড়। প্রাণীটি শক্তিশালী, অথচ স্বাধীন নয়; রিকশাটি চলাচলের বাহন, অথচ এখানে তা মুক্তির নয়, আটকে থাকার মঞ্চ। ষাঁড়টির শরীরের ভাঙাচোরা ভঙ্গি, তীক্ষ্ণ রেখা এবং রঙের পৃথক ক্ষেত্র যেন এক অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে ব্যর্থ প্রতিরোধকে দৃশ্যমান করে। এখানে ষাঁড়টি কেবল প্রাণী নয়, আর রিকশাটিও কেবল যানবাহন নয়। দুটিই মানুষের সামাজিক অবস্থার রূপক। শিল্পী যেন প্রশ্ন তুলছেন;শক্তি থাকা সত্ত্বেও মানুষ কেন নিজের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না? ২. কবি ও শিল্পসমালোচক নিসিম এজেকিয়েল তায়েবের ১৯৬১ সালের ‘রিকশা পুলার’ ছবির ব্যাখ্যায় রিকশাকে কেবল যাতায়াতের বাহন হিসেবে দেখেননি। তাঁর মতে, এটি বন্দিদশার প্রতীক; রিকশার পাশে বসে থাকা মানুষটি যেন শূন্যের দিকে তাকিয়ে নিজের অস্তিত্বের ভার বহন করছে। এই ব্যাখ্যা তায়েবের সমগ্র রিকশা-পর্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। ৩. শিল্পসমালোচক রঞ্জিত হোসকোটে তায়েবের ছবিতে রিকশাচালকের শরীর, জোয়াল এবং গাড়ির কাঠামোর মধ্যে এক অস্বস্তিকর মিশে যাওয়ার কথা তুলে ধরেছেন। কোথায় মানুষের মাংস শেষ হচ্ছেকোথায় কাঠ ও ধাতুর শুরু;ছবিতে সেই সীমানা স্পষ্ট থাকে না। এই দৃশ্যভাষায় শ্রমিক যেন নিজের কাজের যন্ত্রটিরই অংশ হয়ে গেছেন।
৪. শিল্প-ইতিহাসবিদ যশোধরা ডালমিয়ার বিশ্লেষণে বাঁধা ষাঁড় মানুষের অপূর্ণ সম্ভাবনার প্রতীক। প্রাণীটির শরীরে শক্তি রয়েছে, কিন্তু তার স্বাধীনতা নেই। ষাঁড়ের ভঙ্গিতে তিনি একই সঙ্গে সংগ্রাম, যন্ত্রণা এবং টিকে থাকার প্রবল ইচ্ছা দেখেছেন। ‘বুল অন আ রিকশা’য় এই ভাবনা রিকশার প্রতীকের সঙ্গে মিশে আরও জটিল হয়ে ওঠে। ৫. বস্টন জাদুঘরের শিল্পবিশেষজ্ঞ এডওয়ার্ড সয়ওয়েল তায়েবের শিল্পভাষায় বাস্তব অবয়ব ও বিমূর্ততার মধ্যবর্তী অবস্থানের কথা বলেছেন। তাঁর মতেতায়েবের শক্তিশালী সরল রেখা, সমতল রঙের ক্ষেত্র এবং সংযত অবয়ব আধুনিক পাশ্চাত্য শিল্পের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতার সঙ্গে সংলাপ তৈরি করে। ‘বুল অন আ রিকশা’য় রঙের বিভাজন ও তির্যক রেখাগুলি যেন বিপর্যয়ের ঠিক আগের একটি মুহূর্তকে স্থির করে রেখেছে।


 

Scroll to Top