ECI SIR Review/SM
দেশজুড়ে এসআইআর প্রক্রিয়ার রিভিউ শুরু, এসআইআর পূর্ববর্তী ভোটার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও চূড়ান্ত তালিকায় নাম বাদ কেন? বাড়ি বাড়ি গিয়ে বৈধ ভোটারদের নাম তোলার নির্দেশ নির্বাচন কমিশনের
৩৬৫ দিন। নয়াদিল্লি। এসআইআর পূর্ববর্তী ভোটার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও চূড়ান্ত তালিকায় কোটি কোটি ভোটারের নাম বাদ গেল কেন? এসআইআর পূর্ববর্তী ভোটার তালিকার সঙ্গে নাম মিলিয়ে প্রত্যেকের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে বৈধ ভোটারদের নাম তোলার জন্য দেশ জুড়ে নির্দেশিকা জারি করল জাতীয় নির্বাচন কমিশন। গত ১০ মাসে দেশের নির্বাচন কমিশনের দুই কমিশনারকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে অন্তত ১৪ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে অভিযোগ নিয়ে দেশ জুড়ে বিরোধীরা তীব্র আন্দোলনে নেমেছে, এই আবহে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের এসআইআর নিয়ে এমন নির্দেশিকা রীতিমতো তাৎপর্যপূর্ণ। প্রসঙ্গত, দেশজুড়ে এসআইআর -এর পরে ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছিল। এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়েই নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন মামলায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এসআইআর প্রক্রিয়ায় সংশোধনীর নির্দেশ
নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিকতম এই নির্দেশিকায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বারেবারে উল্লেখ করা হয়েছে গত বছর থেকে শুরু হওয়া স্পেশাল ইনটেন্সিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়ার ফলে এসআইআর পূর্ববর্তী ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া বৈধ ভোটাররা কেন বাদ পড়ল তা খোঁজ করার পাশাপাশি তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেই সমস্ত লেফট আউট বাদ পড়া ভোটারদের পুনরায় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন কার্যত স্বীকার করে নিল পশ্চিমবঙ্গ সহ গোটা দেশে ভোটার তালিকায় যে বিশেষ নিবিড় সংশোধনী বা এসআইআর প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল তাতে বড়সড়ো গলতি রয়ে গিয়েছে। তাই অবিলম্বে সেই প্রক্রিয়া সংশোধন করতে হবে।
এসআইআর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী তালিকা মেলান
জাতীয় নির্বাচন কমিশন দেশের সমস্ত রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়েছে, এসআইআর পূর্ববর্তী তালিকার সঙ্গে এসআইআর পরবর্তী তালিকা মিলিয়ে দেখতে হবে প্রত্যেকটি বুথে। কোন ভোটারের নাম পূর্ববর্তী তালিকায় থাকলে তার নাম কেন বাদ পড়ল চূড়ান্ত তালিকায় তা অবিলম্বে খতিয়ে দেখার পাশাপাশি নতুন করে নাম তোলার ব্যবস্থা করতে হবে। কার কার নাম বাদ গিয়েছে, সেই তালিকা তৈরি করতে হবে। এরপর দেখতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অন্য কোথাও ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছেন কি না, তিনি ডুপ্লিকেট ভোটার ছিলেন কি না অথবা তাঁর মৃত্যু হয়েছে কি না। এর কোনওটিই না হলে অথচ তাঁর নাম তালিকা থেকে বাদ গিয়ে থাকলে, তাঁকে লেফট আউট ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করে ফের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজন হলে বিএলও বা নির্বাচনী আধিকারিকরা সংশ্লিষ্ট ভোটারের বাড়িতে গিয়ে ফর্ম ৬ পূরণে সাহায্য করবেন। রাজনৈতিক দলগুলির বুথ স্তরের এজেন্টদের সাহায্যও এই কাজে নেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ কার্যত নতুন করে আবার শুরু করা হবে এসআইআর প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় পর্যায়।
বৈধ ভোটারদের নাম তুলতে বিশেষ শিবির
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের তরফে যে নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে সেখানে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, এসআইআর পূর্ববর্তী ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া বৈধ ভোটারদের নিজের তাগিদে নিজেদের বৈধ ভোটার প্রমাণ করার জন্য দৌড়াতে হবে না। বরং প্রত্যেক বুথে বুথে প্রয়োজনে বিশেষ ক্যাম্প করতে হবে সেই সমস্ত ভোটারদের খুঁজে বের করে তাদের নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় তোলার জন্য। কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, শুধু ভোটার নিজে আবেদন করবেন—এমন নয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক, সমস্ত জেলা নির্বাচনী আধিকারিক এবং ইআরও-দের সক্রিয়ভাবে খুঁজে দেখতে হবে, এসআইআর-এর পরে কোনও যোগ্য ভোটার তালিকার বাইরে থেকে গিয়েছেন কি না। প্রয়োজনে তাঁদের বাড়িতে পৌঁছে ফর্ম-৬ পূরণ করিয়ে ফের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
বাংলার ট্রাইবুনালে ঝুলছে ৩৭ লক্ষের ভাগ্য
জাতীয় নির্বাচন কমিশন গত সেপ্টেম্বর মাসে যে তথ্য প্রকাশ করেছিল তার নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর সংক্রান্ত ৩৮.২০ লক্ষ আপিলের মধ্যে তখন মাত্র ১.০২ লক্ষের নিষ্পত্তি হয়েছিল। অর্থাৎ বিপুল সংখ্যক আবেদন তখনও ঝুলে ছিল। অর্থাৎ এখনো প্রায় ৩৭ লক্ষ আবেদনকারী ভোটারের ভাগ্য ঝুলে রয়েছে ট্রাইবুনালের ফাইলে।
ফর্ম ৬ পূরণের জন্য শর্ত পরিবর্তন
এসআইআর-এর পরে বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদের ফের তালিকায় আনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে ফর্ম ৬। নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রেও এই ফর্ম ব্যবহৃত হয়। এসআইআর চলাকালীন অনলাইন ফর্ম ৬-এ একটি অতিরিক্ত ঘোষণা বা প্রশ্ন যোগ করা হয়েছিল। আবেদনকারী অথবা তাঁর বাবা-মায়ের নাম আগের এসআইআর-এর ভোটার তালিকায় ছিল কি না, সেই তথ্য চাওয়া হচ্ছিল। এই পরিবর্তন নিয়েই নির্বাচন কমিশনের ভিতরে আপত্তি উঠেছিল। একই বিষয় নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে ইন্ডিয়া জোটের শরিক সমস্ত রাজনৈতিক দলের নেতারা। তার প্রেক্ষিতেই নির্বাচন কমিশন নতুন নির্দেশিকায় জানিয়েছে, ওই অতিরিক্ত ডিক্লেয়ারেশেন শুধু এসআইআর চলাকালীনই ব্যবহার করা হবে। এসআইআর শেষ হয়ে যাওয়া রাজ্যগুলিতে এতদিন ধরে চলে আসা ফর্ম ৬ দিয়েই নতুন এবং বাদ পড়ে যাওয়া যোগ্য ভোটাররা আবেদন করতে পারবেন।
বলির পাঁঠা বিএলও-রা
তবে নির্বাচন কমিশনের এই এস আই আর প্রক্রিয়ার রিভিউ ঘোষণা করার পরেই বুথ লেভেল অফিসারদের কার্যত বলির পাঁঠা করা হলো বলে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম এবং দেশের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এসওয়াই কুরেশি। নির্বাচন কমিশন নিজেদের দায়ে এড়ানোর জন্য বুথ লেভেল অফিসারদের উপরে দায়ে চাপাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন দুজনেই।





