বন্দে মাতরম এর সম্পূর্ণ গান না গাইলেও কোন আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না – ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের

৩৬৫ দিন। নয়াদিল্লি। সম্পূর্ণ বন্দেমাতরম গান না গাইলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনরকম আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না। আজ এমন ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ করলো সুপ্রিম কোর্ট। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানানো হয়েছিল যে কোন সরকারি অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীতের পাশাপাশি জাতীয় গান হিসেবে বন্দেমাতরম গাইতে হবে এবং স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময় থেকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে যেভাবে বন্দেমাতরমের প্রথম দুটি স্তবক গাওয়া হতো তার পরিবর্তে সম্পূর্ণ বন্দেমাতরম গান গাইতে হবে। কিন্তু চলতি বছরের স্বাধীনতা দিবসে কংগ্রেস সদর দপ্তরে সম্পূর্ণ বন্দেমাতরম গান না গাওয়া নিয়ে বিতর্কের জেরে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীসহ শীর্ষ কংগ্রেস নেতাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
তবে শুধুমাত্র কংগ্রেস নেতৃত্ব নয়, দেশের বিভিন্ন রাজ্যের সম্পূর্ণ বন্দেমাতরম গান না দেওয়ার অপরাধে এফ আই আর দায়ের করা সহ গ্রেফতারের ঘটনাও ঘটেছে গত কয়েক মাসে। এই সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি চলাকালীন আজ সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্যে প্রাথমিকভাবে নিজেদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, সম্পূর্ণ বন্দেমাতরম গান কোন ব্যক্তি না গাইলে তার বিরুদ্ধে এখনই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়। তবে এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সুপ্রিমকোর্ট জানতে চেয়েছে, সম্পূর্ণ বন্দেমাতরম গান যদি কোন ব্যক্তি গাইতে না চান বা না গান তাহলে তার বিরুদ্ধে কি ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষপাতী কেন্দ্রীয় সরকার। সম্পূর্ণ বন্দেমাতরম গান না গাইলে কি ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব সেই সম্পর্কে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশিকার প্রেক্ষিতে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে কেন্দ্রকে পরামর্শ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
প্রসঙ্গত কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটকের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণ বন্দে মাতরম সম্পর্কিত কেন্দ্রের সার্কুলারের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। এ সংক্রান্ত কেন্দ্রের সার্কুলার যেখানে বন্দে মাতরম-এর ছ’টি স্তবক গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে- সেটিকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন টি এম কৃষ্ণ। এর পাশাপাশি বন্দে মাতরম-কে জাতীয় সঙ্গীতের সমমর্যাদা দেওয়ার জন্য যে সংশোধনী আনা হয়েছে, তাকেও চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন তিনি। টি এম কৃষ্ণের বক্তব্য, বন্দে মাতরম-এর চারটি স্তবকে স্পষ্টভাবে হিন্দু দেবদেবীদের প্রতি ভক্তি নিবেদনের কথা বলা হয়েছে। এই স্তবকগুলি গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হলে তা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের পরিপন্থী হবে। আজ সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে এই মামলার শুনানি ছিল। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে শুনানি চলাকালীন প্রবীণ আইনজীবী মুরলীধর যুক্তি দেন, সর্বভারতীয় স্তরে কোনও ঐকমত্য গড়ে না তুলে এবং পর্যাপ্ত পর্যালোচনা ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে এই আইনি সংশোধনী আনা হয়েছে। এমনকি আইনের সংশোধনীতে জাতীয় গীত বিষয়টি আদতে কী, তারও কোনও স্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি। মুরলীধরের এই বক্তব্যের মাঝেই হস্তক্ষেপ করে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, আইন প্রণয়ন হয় সংবিধান মেনে, নকশালদের চিন্তাভাবনা অনুযায়ী নয়। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত হস্তক্ষেপ করে বলেন, আমরা কেবল সংবিধানের ব্যাখ্যার আইনি দিকটি পরীক্ষা করছি। আলোচনাকে সেই আইনি সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হোক।
ধর্মীয় কারণে কোন ব্যক্তি যদি সম্পূর্ণ বন্দেমাতরম গান গাইতে না চান অথবা বন্দেমাতরম গান চলার সময় মৌন্ন থাকার কক্ষপথী হন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোন আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া উচিত বলে নিজেদের পর্যবেক্ষণে জানানোর পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ১৯৮৬ সালের বিজয় ইমানুয়েল মামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। কেরালার একটি স্কুলে তিনজন স্কুল ছাত্র জাতীয় সংগীত চলার সময় ধর্মীয় কারণে, জাতীয় সংগীত না গেয়ে চুপ করে থাকায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হলেও পরবর্তীকালে সংবিধানে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য যে চুপ থাকার অধিকার বা মৌনতার অধিকার রয়েছে সেই অধিকার বলে বেকসুর খালাস পেয়ে গিয়েছিল। এই বিষয়টি মনে করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বন্দে মাতরম পুরো না গাইলে শাস্তি কী হবে – এই প্রেক্ষিতেই এ বিষয়ে কেন্দ্রের কাছ থেকে পরিষ্কার করে জানতে চাইল সুপ্রিম কোর্ট। কেন্দ্রের কাছে আগামী দু’সপ্তাহের মধ্যে এ নিয়ে জবাব তলব করল সুপ্রিম কোর্ট।

Scroll to Top