SIR নিয়মাফিক হয়নি! ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন ঘিরে তোলপাড় দেশজুড়ে

৩৬৫ দিন। ১০ মাসে ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছি। কথা কানেই তোলেননি জাতীয় নির্বাচন কমিশনার! এস আই আর নিয়ে মারাত্মক অভিযোগ সামনে আনলেন দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং বিবেক জোশী। তাঁদের সাফ কথা, ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনের সিদ্ধান্ত একা জ্ঞানেশ কুমারের। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি না শুনে একতরফা এস আই আর চাপিয়ে দেন তিনি। বিস্ফোরক এই অভিযোগ সামনে আসতেই জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে সরব হয়েছে তৃণমূল এ। রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনের ট্যুইট, আগে একবার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের প্রস্তাব এনেছিলেন বিরোধী দলের সাংসদরা। প্রয়োজনের চেয়ে বেশী সাংসদের সমর্থন থাকলেও তা খারিজ হয়ে যায়। ডেরেকের প্রস্তাব নতুন করে ফের জাতীয় নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ চেয়ে মোশন আনা হোক।
দুই নির্বাচন কমিশনারের অভিযোগ
একটি সর্বভারতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ এর জুনে যখন প্রথম এস আই আর নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং জম্মু-কাশ্মীর দিয়ে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন শুরু হবে বলা হয় তখন-ই তা নিয়ে আপত্তি জানান দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং বিবেক জোশী। তারা এস আই আর প্রক্রিয়ার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে পদ্ধতিতে এস আই আর করা হচ্ছে তাতে কোটি কোটি বৈধ ভোটারের নাম বাদ চলে যাবে এর বাইরে আরও কয়েক কোটি ভোটারকে চরম হয়রানির মুখে পড়তে হবে। সেই সময় জাতীয় নির্বাচন কমিশনার তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন আইন অনুসারেই এস আই আর হচ্ছে। এতে চিঁড়ে না ভিজলে জ্ঞানেশ কুমার দুই নির্বাচন কমিশনারকে না জানিয়েই একের পর এক সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন বা চাপিয়ে দিতে থাকেন।
কোন কোন বিষয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত?
সান্ধু এবং জোশীর অভিযোগ ছোট বড় অসংখ্য বিষয় নিয়ে তাঁদের অন্ধকারে রাখা হলেও চারটি বড় বিষয়ে তাদের না জানিয়েই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া হয়। মন্ত্রিগোষ্ঠীর সচিব পর্যায়ে এই নিয়ে অভিযোগ জানিয়েও কোনও ক আজ হয়নি। চারটি বিষয় হল –
১. নতুন ভোটার যুক্ত করার ক্ষেত্রে যে যে পদক্ষেপ করা হয়, তা ‘অননুমোদিত’ এবং ‘বেআইনি’। রাজ্যের নির্বাচনী আধিকারিকদের অন্ধকারে রেখে ভোটারদের সব তথ্য দিল্লিতে সংরক্ষণ করা হয় যা নীতি বিরুদ্ধ।
২. নাম নথিভুক্ত এবং বাদের ক্ষেত্রে যে সফট ওয়ার ব্যবহার করা হয়েছে তা নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার প্রশ্ন তোলেন। তাদের অভিযোগ ছিল যে সফট ওয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে তা যথাযথ নয় প্রচুর ভুল ভ্রান্তির আশঙ্কা রয়েছে। তার প্রমাণ মিললেও জাতীয় নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ওই নির্দিষ্ট‌ সফট ওয়ার ব্যবহারেই অনড় থাকেন।
৩. ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে দেওয়া এবং নতুন নাম যুক্ত করা নিয়ে কিছু জানানো হয়নি তাঁদের। অর্থাৎ কোন যুক্তিতে কত ভোটারের নাম বাদ গেল তার কোনো আগাম তথ্য তাদের কাছে ছিল না। ভোটার তালিকায় নতুন ভোটারের নাম যুক্ত করা, তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং তালিকায় নাম ফিরিয়ে আনা, নাম ফেরানোর আবেদ, ভোটার তালিকার সুরক্ষা এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে যা যা আপত্তি ছিল, তা লিখিত আকারেও জমা দেন সান্ধু এবং জোশী, যার প্রতিলিপি পাঠানো হয়েছিল জ্ঞানেশকেও। যদিও তাতে কোনও কাজ হয়নি।
৪. দুই নির্বাচন কমিশনার চলতি বছরে ভোটার হওয়ার আবেদনপত্রে মা-বাবা, দাদু-ঠাকুমার তথ্য চাওয়ায় আপত্তি জানান। তাঁরা মতামত দেন, সরকারি নিয়ম না বদলে ফর্ম ৬ পাল্টানো যায় না। কিন্তু তারপরেও জ্ঞানেশ কুমার একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন।
দুই নির্বাচন কমিশনারের প্রশ্ন
এই পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগকারী দুই নির্বাচন কমিশনার বেশ‌ কিছু প্রশ্ন তুলছেন যেখানে জাতীয় নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভুমিকা ঘোরতর প্রশ্নের মুখে পড়ছে-
১. জাতীয় নির্বাচন কমিশনার এবং দুই নির্বাচন কমিশনারের পদমর্যাদা সমান। কোনও বিষয়ে যদি সহমত না হওয়া যায় তাহলে নিয়ম হল গরিষ্ঠ অংশের মত গ্রহণ করতে হয়। তাহলে প্রশ্ন দুই নির্বাচন কমিশনার যখন এস আই আর নিয়ে আপত্তি জানান তখন জ্ঞানেশ কুমার কী ভাবে একার সিদ্ধান্তে এস আই আর করে ফেললেন?

২. সম্প্রতি আদালতে কমিশন জানায়, ট্রাইব্যুনালে ৩৮ লক্ষ আবেদন বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ২২ লক্ষ ২১ হাজার আবেদন দায়ের করেন ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষজন। পুনরায় নাম তুলতে চেয়েছিলেন তাঁরা। বাকি ১৬ লক্ষ ১০ হাজার আবেদন জমা পড়ে ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য। কারা ওই আবেদনগুলি জমা করে, তার কোনও উল্লেখ ছিল না, কেন এই অস্বচ্ছতা? দুই কমিশনারের প্রশ্ন একজন ভোটারের যখন নাম বাদ যাচ্ছে তখন কেন তার জানার অধিকার থাকবে না কার আপত্তিতে কোন যুক্তিতে নাম বাদ গেল?

৩. প্রযুক্তিতে বার বার ত্রুটি ধরা পড়ার পরেও কেন এত বেশী সফট ওয়ার নির্ভরতা? গোয়ায় সফ্টওয়্যার সংক্রান্ত সমস্যাগুলি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও ৯৭ জন যোগ্য ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। ওই ৯৭ জন ERO-দের কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়েছিলেন। তাঁদের যোগ্য ভোটার বলে মেনে নেন ERO-রা। কিন্তু দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সদর দফতরের সফ্টওয়্যার ERO-দের সিদ্ধান্ত মানেনি। মাঠে থাকা আধিকারিকদের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে কেন্দ্রীয় ভাবে পরিচালিত সফ্টওয়্যারের মাধ্যমে যোগ্য ভোটারদের নথিভুক্তিকরণ আটকে দেওয়া হল কেন?
বিরোধীদের বক্তব্য
সর্বভারতীয় দৈনিকে দুই নির্বাচন কমিশনারের যে বিস্ফোরক বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে আদা জল খেয়ে ময়দানে নেমে পড়েছে প্রায় সব বিরোধী দল। তাদের দাবি তিনটি- ১.জাতীয় নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে জ্ঞানেশ কুমারের অপসারন,২. এস আই আর পরবর্তী বাংলা বিহার সহ দেশের যেখানে যত ভোট হয়েছে হব বাতিল করতে হবে এবং ৩.এস আই আর বাতিল করতে হবে এবং জ্ঞানেশ কুমারকে তদন্তের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
কমিশনের বক্তব্য
যদিও এই গোটা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন বলছে যা হয়েছে সব আইন মেনে হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য,যে কোনো বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মত পার্থক্য হতে পারে তার মানে এই নয় যে কমিশনের অন্দরে মতপ্রকাশের সুযোগ নেই। সংবাদ মাধ্যমে যা বলা হচ্ছে তা সঠিক নয়। এস আই আর প্রক্রিয়া জাতীয় নির্বাচন কমিশন এবং দুই নির্বাচন কমিশনারের সহমতের ভিত্তিতে হয়। দুই নির্বাচন কমিশনার সম্মতি দেওয়ার পরেই এস আই আর শুরু হয়। এই নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ বা সংশয়ের অবকাশ নেই।

Scroll to Top