সুগার ল্যান্ডে ‘স্ট্যাচু অব ইউনিয়ন’—অভিবাসী সমাজ, ধর্মীয় স্থাপত্য ও আমেরিকার বহুত্বের এক দৃশ্যমান চিহ্ন
৩৬৫ দিন। আমেরিকার টেক্সাসে হিউস্টন শহরের কাছে সুগার ল্যান্ড। সেই এলাকার আকাশরেখায় এখন চোখে পড়ে ৯০ ফুট উঁচু এক বিশাল হনুমান মূর্তি। নাম—‘স্ট্যাচু অব ইউনিয়ন’। ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট মূর্তিটির আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা হয় শ্রী অষ্টলক্ষ্মী মন্দির প্রাঙ্গণে। প্রায় ৯০ টন ওজনের মূর্তিটি উত্তর আমেরিকায় হনুমানের সবচেয়ে উঁচু মূর্তি বলে মন্দির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। মূর্তিটি পঞ্চধাতুর তৈরি—সোনা, রুপো, তামা, দস্তা ও লোহার সংমিশ্রণ। ভারতে এটি খণ্ডে খণ্ডে নির্মাণ করে বিশাল পাত্রে আমেরিকায় পাঠানো হয়। পরে সুগার ল্যান্ডে তা জোড়া লাগানো হয়। টেক্সাস হারিকেনপ্রবণ এলাকা হওয়ায় নির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রবল বাতাস। প্রকৌশলীরা ঘণ্টায় ১৮০ মাইলের বেশি গতির বাতাস সহ্য করার মতো কাঠামো তৈরি করেন। ২০২৪ সালের হারিকেন বেরিলের সময় মূর্তিটি তখন নির্মাণস্থলেই ছিল।
কেন ‘স্ট্যাচু অব ইউনিয়ন’?
নামটির পিছনে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট ধারণা। মন্দির কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, হনুমানকে তাঁরা রামায়ণের এমন একটি চরিত্র হিসেবে দেখেন যাঁর সঙ্গে সেতুবন্ধন, আনুগত্য এবং ঐক্যের ধারণা যুক্ত। সেই থেকেই ‘ইউনিয়ন’ বা ঐক্যের প্রতীক হিসেবে মূর্তিটির নামকরণ। এটি কোনও প্রাচীন ভারতীয় স্থাপনা নয়। একেবারেই নতুন আমেরিকান প্রেক্ষাপটে নির্মিত একটি ধর্মীয় স্থাপত্য। ফলে এর ইতিহাস মূলত ভারত থেকে আমেরিকায় আসা অভিবাসী সমাজের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে।
মন্দিরটির ইতিহাস
শ্রী অষ্টলক্ষ্মী মন্দিরটি সিনট রোডে অবস্থিত। মন্দিরের বর্তমান ঠিকানা ১০০৯৮ সিনট রোড। ২০১০ সালে মন্দিরটি চালু হয়। মূল উপাসনা লক্ষ্মীর আটটি রূপকে কেন্দ্র করে। পাশাপাশি লক্ষ্মী-নারায়ণের উপাসনা, ধর্মীয় শিক্ষা, শিশুদের জন্য বৈদিক পাঠ, সংগীত ও নৃত্যশিক্ষা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডও চলে। মন্দিরটি জীয়র শিক্ষা ট্রাস্টের হিউস্টন শাখার সঙ্গে যুক্ত। এর সঙ্গে যুক্ত আছেন শ্রী চিন্না জীয়র স্বামী। মন্দিরের নিজস্ব বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন প্রজন্মের মধ্যে ভারতীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বজায় রাখাই তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।
খরচ—৮০ লক্ষ ডলার
৯০ ফুটের মূর্তিটি তৈরি করতে খরচ হয়েছে প্রায় ৮০ লক্ষ মার্কিন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় ২০২৪ সালের বিনিময়মূল্য ধরলে অঙ্কটি প্রায় ৬৬ কোটি টাকা। অর্থ এসেছে সরকারি তহবিল থেকে নয়; হিউস্টনসহ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের অনুদান থেকে। এই বিপুল ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে মূর্তি নির্মাণ, পরিবহণ, স্থাপন, প্রকৌশলগত নিরাপত্তা এবং প্রাঙ্গণ তৈরির খরচ।
হিউস্টনেই কেন?
এর উত্তর ধর্মের পাশাপাশি অভিবাসনের ভূগোলে। বৃহত্তর হিউস্টন এলাকায় বহু বছর ধরে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস। সুগার ল্যান্ড ও আশপাশের ফোর্ট বেন্ড অঞ্চলে ভারতীয় পরিবার, ব্যবসা, মন্দির, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। ফলে মন্দিরটি কোনও বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি ওই অভিবাসী সমাজের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক পরিকাঠামোর অংশ। মূর্তিটি সেই উপস্থিতিকে আরও দৃশ্যমান করেছে। স্থানীয় মন্দির কর্তৃপক্ষের আশা, বিশাল মূর্তিকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়াও দর্শনার্থীদের আনাগোনা এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান বাড়বে। মূর্তির পিছনের প্রাঙ্গণে প্রায় ৬০০ মানুষের সমাবেশের ব্যবস্থা রয়েছে।
শুধু প্রশংসা নয়, বিতর্কও
মূর্তিটি প্রতিষ্ঠার পর স্থানীয় খ্রিস্টান ধর্মীয় গোষ্ঠীর একাংশ প্রতিবাদ জানায়। ২০২৪ সালের আগস্টে একটি গির্জার প্রায় ২৫ জন সদস্য মন্দিরের কাছে গিয়ে প্রার্থনা ও ধর্মীয় প্রচার করেন। পরে মন্দির কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগ এবং নজরদারি ক্যামেরা বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থাৎ ৯০ ফুটের হনুমান শুধু একটি ধর্মীয় মূর্তি নয়। এটি একই সঙ্গে আমেরিকায় ভারতীয় অভিবাসী সমাজের দৃশ্যমান হয়ে ওঠা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং স্থানীয় সামাজিক প্রতিক্রিয়ার গল্প। হিউস্টনের শহরতলিতে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিটি তাই ভারতের কোনও প্রাচীন ইতিহাসের নিদর্শন নয়। বরং এটি আমেরিকায় তৈরি হওয়া ভারতীয় প্রবাসী ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায়।





