৩৬৫ দিন।সিনেমার আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের মুখ হয়ে ইতালিতে গিয়েছিলেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। কিন্তু ভেনিসে সেই সফরই পরিণত হল আতঙ্কের অভিজ্ঞতায়। পার্কে ভাই এবং পরিবারের ছোট্ট শিশুকে নিয়ে হাঁটতে গিয়ে একদল বাংলাদেশির হাতে হেনস্থার অভিযোগ তুললেন অভিনেত্রী। তাঁর দাবি, তাঁকে লক্ষ্য করে জল, কোক এবং ডিম ছোড়া হয়েছে, ধাক্কা দেওয়া হয়েছে, গায়ে হাত তোলা হয়েছে। এমনকি তাঁকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ বলে কটাক্ষ করে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলতে বাধ্য করা হয়েছে বলেও অভিযোগ বাঁধনের।ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভে এসে বিস্ফোরক একের পর এক অভিযোগ করেন অভিনেত্রী।
বাঁধন বলেন
তাঁর দাবি, হামলাকারীরা নিজেদের আওয়ামি লিগ এবং ছাত্রলিগের কর্মী-সমর্থক বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। যদিও অভিযুক্তদের তরফে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি নিয়ে ইতিমধ্যেই স্থানীয় থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন বাঁধন।তিনি বলেছেন,আমার গায়ে হাত তুলেছে, ভাইয়ের পরিবারকেও হেনস্থা।বাঁধনের বয়ান অনুযায়ী, ভেনিসের মেস্ত্রে এলাকায় একটি পার্কে ভাই এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন তিনি। আচমকাই কয়েক জন বাংলাদেশি তাঁদের ঘিরে ধরেন। শুরু হয় বাগ্বিতণ্ডা। তার পরেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।অভিনেত্রীর অভিযোগ, আমার গায়ে পানি, কোক ছুড়ে মেরেছে। আমার গায়ে হাত তুলেছে। আমাকে ধাক্কা মেরেছে।তাঁর ভাইয়ের পরিবারের সদস্যদেরও হেনস্থা করা হয়েছে বলে দাবি বাঁধনের। একটি শিশুকে সামনে রেখেও হামলা থামেনি,এই অভিযোগই সবচেয়ে বেশি আলোড়ন ফেলেছে।বাঁধনের কথায়, তাঁর ভাইয়ের বাচ্চা ভয়ে চিৎকার করে কাঁদছিল। অথচ সেই কান্নাতেও অভিযুক্তরা থামেননি, বরং উল্লাস করছিলেন বলে অভিযোগ অভিনেত্রীর। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিয়োতেও ঘটনাস্থলে উত্তেজিত কয়েক জনকে দেখা গিয়েছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
জুলাই যোদ্ধা? বাঁধনের জবাব, ‘হ্যাঁ, আমি তাই’
হামলার পিছনে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানই কারণ বলে মনে করছেন বাঁধন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রকাশ্যে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। অভিনেত্রীর অভিযোগ, সেই অবস্থানের কারণেই বিদেশের মাটিতে তাঁকে নিশানা করা হয়েছে।তাঁর বক্তব্য,তারা বলেছে আমি জুলাই যোদ্ধা। হ্যাঁ, আমি তাই।
এখানেই শেষ নয়। বাঁধনের অভিযোগ, তাঁকে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক বলতে বাধ্য,করা হয় এবং জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলতে বাধ্য করা হয়। পুরো ঘটনাটি ভিডিয়ো করা হচ্ছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিয়োয় তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক স্লোগান এবং উত্তেজিত বাক্যবিনিময়ের দৃশ্য দেখা গিয়েছে।
আজ মনে হচ্ছিল, বোধহয় মরেই যাব
লাইভে নিজের আতঙ্কের কথাও জানিয়েছেন বাঁধন। তাঁর দাবি, পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে একসময় তাঁর মনে হয়েছিল,বোধহয় মরেই যাব।একজন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিতে যাওয়া অভিনেত্রীর সঙ্গে বিদেশের মাটিতে এমন ঘটনা কী করে ঘটতে পারে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। আরও তীব্র হয়েছে তাঁর ক্ষোভ, কারণ তাঁর সঙ্গে পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন।আমার ভাইয়ের বাচ্চা চিৎকার করে কাঁদছিল আর তারা উল্লাস করছিল,বলেন বাঁধন।অভিযোগ, তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজও করা হয়। এই আচরণকে কেবল ব্যক্তিগত হেনস্থা হিসেবে দেখছেন না অভিনেত্রী। তাঁর মতে, এর মধ্যে বাংলাদেশের মহিলাদের প্রতি একটি ভয়ঙ্কর বার্তা লুকিয়ে রয়েছে।
এই আচরণ করে বাংলাদেশের মহিলারা সুরক্ষিত থাকবে?
বাঁধনের প্রশ্ন, আসলে তারা বলতে চায় এই আচরণ করে বাংলাদেশের মহিলারা সুরক্ষিত থাকবে?’’
এর পরেই তাঁর কণ্ঠে তীব্র প্রতিবাদ। অভিযুক্তদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, এই ধরনের আচরণ করে তাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক জায়গা শক্ত করতে পারবেন না।আপনাদের এই অসংলগ্ন ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসা উচিত ছিল, যেটা আপনারা করতে পারেননি,বলেন তিনি।তার পরেই সেই বহুচর্চিত ঘোষণা—একজন আজমেরী হক বাঁধনকে দমানো এত সহজ না। এইটুকু আপনারা মনে রাখবেন।
যে ছবির জন্য ভেনিসে বাঁধন
ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়েছেন বাঁধন। রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। ছবিটি উৎসবের প্রতিযোগিতামূলক ‘অরিজন্তি’ বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছে। বাঁধনের সঙ্গে ছবিতে অভিনয় করেছেন জাইনীন করিম, রিকিতা নন্দিনী শিমু এবং সুনেরাহ বিনতে কামাল।বাঁধনের দাবি, ছবির পরিচালক রুবাইয়াত হোসেনের বাবা বাংলাদেশের আওয়ামি লিগের প্রাক্তন মন্ত্রী ছিলেন। অথচ জুলাইয়ের পরেই সেই পরিচালকের ছবিতে কাজ করেছেন তিনি। এই প্রসঙ্গ তুলে অভিনেত্রী প্রশ্ন তোলেন, তাঁর সঙ্গে কাজ করার সময় যে পরিচয় ছিল, তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক মতের কারণে তাঁকে কেন এ ভাবে হেনস্থা করা হল?
গোটা বিশ্ব জানবে
ঘটনার পর পিছিয়ে যাওয়ার বদলে আরও সরব হয়েছেন বাঁধন। তাঁর কথায়, এই ঘটনা তাঁকে চুপ করানোর বদলে বরং আন্তর্জাতিক স্তরে আরও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।ধন্যবাদ আপনাদের এই আচরণের জন্য। আজ গোটা বিশ্ব জানবে যে অভিনেত্রী ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এসে হেনস্থার শিকার হলেন,-বলেন তিনি।
ঘটনার বিচার না হওয়া পর্যন্ত ভেনিস ছাড়বেন না বলেও জানিয়েছেন অভিনেত্রী। ইতিমধ্যেই স্থানীয় থানায় অভিযোগ করেছেন তিনি।
ঢাকার কড়া বার্তা, ইতালির কাছে ব্যবস্থা চাইল বাংলাদেশ
ঘটনাটি নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, বাঁধনকে হেনস্থা ও শারীরিক লাঞ্ছনার ঘটনায় ইতালির কাছে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। অভিনেত্রীকে প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে বলে সরকারি সূত্রে খবর। বিষয়টি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদেও ওঠে।অর্থাৎ, ভেনিসের একটি পার্কে শুরু হওয়া এই ঘটনা এখন আর শুধুই এক অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত অভিযোগে আটকে নেই। তা গড়িয়েছে কূটনৈতিক স্তরেও।সিনেমার আলোয় বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে যে অভিনেত্রী দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁরই অভিযোগ-রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাঁকে বিদেশের মাটিতে নিশানা করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই,অভিযোগের তদন্তে কী বেরিয়ে আসে? আর সত্যিই কি বিচার না হওয়া পর্যন্ত ভেনিস ছাড়বেন না বাঁধন?



