আবার চিত্রচোর ফ্রান্সের রেঁনোয়া মিউজিয়াম থেকে

৩৬৫ দিন। কখন ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ভোর ৫টা ৪৮ মিনিট চুরি অগুস্ত রেনোয়ার চারটি চিত্র উদ্ধার ২টি নিখোঁজ ২টি মোট আনুমানিক মূল্য প্রায় ৯০ লক্ষ ইউরো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আগে;ঘটনাটি প্যারিসে নয়। চুরি হয়েছে ফ্রান্সের দক্ষিণে, নিস শহরের কাছাকাছি ক্যাগন-সুর-মেরের রেনোয়া জাদুঘরে। তবে চারটি চিত্রই প্যারিসের অর্সে জাদুঘরের মালিকানাধীন, এবং ১৯৯৫ সাল থেকে রেনোয়ার শেষ বাসভবনে প্রদর্শনের জন্য রাখা ছিল।
১. যে জাদুঘরেই হানা
রেনোয়া জাদুঘর কোনও সাধারণ শিল্পশালা নয়।এটি অগুস্ত রেনোয়ার জীবনের শেষ বাড়ি;ক্যাগন-সুর-মেরের লে কোলেত্ত এস্টেটে অবস্থিত। রেনোয়া ১৯০৭ সালে জমিটি কেনেন এবং ১৯০৮ সালে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করেন। ১৯১৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পর পরিবার বাড়িটি সংরক্ষণ করে। ১৯৬০ সালে পৌরসভা তাঁর ছেলে ক্লোদ রেনোয়ার কাছ থেকে সম্পত্তিটি কিনে জাদুঘরে রূপান্তর করে। বর্তমানে এখানে রেনোয়ার ১৩টি মূল চিত্র, প্রায় ৪০টি ভাস্কর্য, পারিবারিক আসবাব, ছবি ও নানা স্মারক রয়েছে। চুরি হওয়া চারটি চিত্রই ছিল একই কক্ষের;গ্যাঁগনা কক্ষ; এবং অর্সে জাদুঘরের আমানত হিসেবে সেখানে রাখা ছিল।
২. মাত্র কয়েক মিনিটে কীভাবে ঘটল চুরি?
ভোরের অন্ধকার। জাদুঘর তখন দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ। প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, দু’জন সশস্ত্র নয়, কিন্তু বিশেষ সরঞ্জামে সজ্জিত ও মুখ ঢাকা ব্যক্তি বাগানের দিক থেকে ঢোকে। তারা প্রথমে ঘেরাটোপের তারের বেড়ার একটি অংশ কেটে ফেলে। তারপর নিচতলার জানালা দিয়ে ভবনে প্রবেশ করে। তাদের হাতে ছিল বৈদ্যুতিক কাটার বা করাতজাতীয় সরঞ্জাম। ভিতরে ঢুকে তারা ছবির ফ্রেমের আটকানো অংশ কেটে চারটি চিত্র খুলে নেয়। অর্থাৎ এটি তাৎক্ষণিক সুযোগসন্ধানী চুরি ছিল, নাকি আগে থেকেই নির্দিষ্ট চিত্র বেছে পরিকল্পনা করা অভিযান;তদন্তের অন্যতম প্রশ্ন সেটিই। সময়টাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ভোর ৫টা ৪৮ মিনিটে জাদুঘরের সতর্কসংকেত বেজে ওঠে। মাত্র পাঁচ মিনিট পরে, ৫টা ৫৩ মিনিটে, পৌর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে জাতীয় পুলিশও অভিযানে নামে। শহরের নজরদারি ক্যামেরাতেও সন্দেহভাজনদের গতিবিধি ধরা পড়ে। পুলিশ এগিয়ে আসতেই তারা বাগানের দিকে পালাতে শুরু করে।
৩. পালানোর সময় কী ঘটল?
এখানেই চুরির মোড় ঘুরে যায়। চারটি চিত্র নিয়ে বেরিয়েছিল চোরেরা। কিন্তু পুলিশের দ্রুত উপস্থিতিতে তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। পালানোর সময় তারা দুটি চিত্র বাগানে ফেলে যায়। উদ্ধার হওয়া দুটি হল; * ‘মাদাম স্টিফেন পিশোঁর প্রতিকৃতি’ * ‘কোকো পড়ছে’ অন্যদিকে তারা সঙ্গে নিয়ে পালাতে সক্ষম হয়; * ‘মাদাম কোলোনা-রোমানোর প্রতিকৃতি’ ‘কুয়োর ধারে তরুণী’ এই দু’টি এখনও নিখোঁজ।
৪. চারটি চিত্রের ইতিহাস
৩. ‘কুয়োর ধারে তরুণী’ সৃষ্টিকাল আনুমানিক ১৮৮৬ এটি তুলনামূলক ছোট, কাঠের ওপর তেলরঙে আঁকা কাজ। ছবিটিকে অসম্পূর্ণ বলেও শিল্প-ইতিহাসবিদেরা চিহ্নিত করেন। এর ইতিহাস আরও জটিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্স থেকে শিল্পকর্ম লুঠের সঙ্গে এর সম্ভাব্য যোগসূত্র রয়েছে। যুদ্ধের পরে জার্মানি থেকে উদ্ধার হয়ে এটি ফরাসি রাষ্ট্রের যুদ্ধোত্তর উদ্ধারকৃত শিল্পকর্মের সংগ্রহে আসে। বর্তমান অবস্থা এখনও নিখোঁজ।
৪. ‘মাদাম কোলোনা-রোমানোর প্রতিকৃতি’
সৃষ্টিকাল আনুমানিক ১৯১৩ এটি রেনোয়ার পরবর্তী সময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিকৃতি। অর্সে জাদুঘরের নথি অনুযায়ী ছবিটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি থেকে উদ্ধার করা হয় এবং ১৯৫০ সালে ফরাসি জাতীয় জাদুঘরগুলির হেফাজতে আসে। ১৯৯৫ সালে এটি রেনোয়া জাদুঘরে আমানত হিসেবে পাঠানো হয়। বর্তমান অবস্থা এখনও নিখোঁজ। ৫. চারটি ছবিত্ব র দাম কত? এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রাখা দরকার। ফরাসি কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী চারটি চিত্রের সম্মিলিত আনুমানিক মূল্য প্রায় ৯০ লক্ষ ইউরো, অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় আনুমানিক ৯০,১০০ কোটি টাকার কাছাকাছি, বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু এটিকে চারটি ছবির নিলামে প্রমাণিত বাজারদর বলা যাবে বিভিন্ন অপরাধী নেটওয়ার্কও সক্রিয় হচ্ছে। রেনোয়া-কাণ্ডে সংগঠিত চক্রের সন্দেহ আছে; প্রমাণিত মাফিয়া-যোগ নেই। ৯. ইউরোপে সাম্প্রতিক জাদুঘর-লুঠ বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় না। এগুলির প্রত্যেকটির সাম্প্রতিক প্রকাশ্য নিলামদর নেই। বিশেষত জাদুঘরের সংগ্রহে থাকা এবং রাষ্ট্রের মালিকানাধীন বা আমানতভুক্ত শিল্পকর্ম সাধারণ বাজারে নিয়মিত কেনাবেচা হয় না। কালোবাজারে দাম? এখানেই চোরদের বড় সমস্যা। একটি চুরি হওয়া রেনোয়া চিত্রের বৈধ বাজারমূল্য কোটি কোটি টাকা হলেও কালোবাজারে তার মূল্য একই থাকে না। ছবিটি পরিচিত, নথিভুক্ত এবং আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত। এটি প্রকাশ্যে বিক্রি করা কার্যত অসম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন চিত্র চোরের হাতে গেলে তার প্রকৃত আর্থিক মূল্য মারাত্মকভাবে কমে যায়;কখনও কার্যত শূন্যের কাছাকাছি। অর্থাৎ ৯০ লক্ষ ইউরোর ছবি মানেই ৯০ লক্ষ ইউরো পাওয়া যাবে;এমন নয়।
৫. কেন দু’টি ছবি ফেলে গেল চোরেরা?
সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত উত্তর;সময় ফুরিয়ে গিয়েছিল। সতর্কসংকেত বাজল, নজরদারি ক্যামেরায় তাদের দেখা গেল এবং মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে পুলিশ এসে পৌঁছল। ফলে চারটি ছবি নিয়ে পালানোর বদলে তাদের দ্রুত বেরিয়ে যেতে হয়। তবে পুলিশ এখনও বলেনি যে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে দু’টি ছবি বেছে ফেলে গেছে। আর একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধার হওয়া ছবিগুলির কোনওটিই যে তকম দামীদ বলে ফেলে দেওয়া হয়েছে;এমন প্রমাণ নেই। বরং তাড়াহুড়োয় বহনক্ষমতা, পালানোর গতি এবং পুলিশের চাপই আপাতত সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাখ্যা।
৬. চোর কারা? কতজন?
এখন পর্যন্ত দু’জন ব্যক্তিকে সরাসরি অভিযানের সঙ্গে যুক্ত বলে দেখা হয়েছে। তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি এবং তাঁরা গ্রেপ্তারও হননি। তবে মার্সেইয়ের সরকারি কৌঁসুলির দফতর তদন্তটি সংগঠিত অপরাধী চক্রের মাধ্যমে শিল্পকর্ম চুরি হিসেবে দেখছে। অর্থাৎ ঘটনাস্থলে দু’জন দেখা গেলেও তদন্তকারীরা এর পিছনে আরও মানুষ;পরিকল্পনাকারীক্রেতা, পাচারকারী বা আশ্রয়দাতা;আছে কি না তা খতিয়ে দেখছেন। ৮. কোনও গোপন আন্তর্জাতিক চক্র বা মাফিয়ার যোগ? এখনও কোনও প্রমাণ নেই। এ মুহূর্তে তক্যাবালদ বা নির্দিষ্ট কোনও মাফিয়া সংগঠনের নাম বলা সাংবাদিকতার দিক থেকে দায়িত্বজ্ঞানহীন হবে। তবে বৃহত্তর ছবিটি উদ্বেগজনক। ইউরোপীয় পুলিশ সংস্থা ইউরোপোলের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাদুঘর-চুরির ধরন বদলাচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী পেশাদার চোরচক্রের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া সুযোগসন্ধানী অপরাধী এবং রেনোয়া-কাণ্ডকে একা দেখলে ভুল হবে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে একের পর এক বড় চুরি হয়েছে; ২০২৪, প্যারিস ; কগনাক-জে জাদুঘর মুখ ঢাকা চার ব্যক্তি ঢুকে সোনা ও হিরে বসানো সাতটি বস্তু নিয়ে যায়। ২০২৫, নেদারল্যান্ডস ; দ্রেন্ট জাদুঘর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ঢুকে প্রাচীন স্বর্ণনির্মিত প্রত্নবস্তু চুরি। ২০২৫, প্যারিস ; লুভর রাজপরিবারের গহনার প্রদর্শনীতে হানা দিয়ে আটটি ঐতিহাসিক বস্তু নিয়ে যায় চোরেরা। ফরাসি কর্তৃপক্ষের হিসাবে এগুলির ঐতিহাসিক মূল্য অপরিমেয়। মার্চ ২০২৬, ইতালি ; মাগনানি-রোক্কা ফাউন্ডেশন রেনোয়া, সেজান ও মাতিসের তিনটি চিত্র চুরি হয়। পরে ইতালীয় পুলিশ তিনটিই উদ্ধার করে; একাধিক সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়। জুলাই ২০২৬, ফ্রান্স ; লালিক জাদুঘর তিন মুখোশধারী চোর মাত্র ১১ মিনিটে ২৭টি মূল্যবান শিল্প ও অলংকারসামগ্রী নিয়ে যায়; আনুমানিক মূল্য প্রায় ৪৫ লক্ষ ইউরো। জুলাই ২০২৬, ফ্রান্স ; ভিক্সের গুপ্তধন জাদুঘর প্রাচীন সোনার মূল্যবান বস্তু চুরি হয়। আগস্ট ২০২৬, ইতালি ; মেসিনা চারটি ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম চুরি। আগস্ট ২০২৬, স্পেন ; ভিয়েনা ও ভিয়েনা-সংলগ্ন জাদুঘরগুলির ধারাবাহিক ঘটনা মূল্যবান সোনা, রত্ন ও ঐতিহাসিক বস্তু লক্ষ্য করে একাধিক অভিযান হয়েছে।
আগস্ট ২০২৬, ভিয়েনা ; প্রয়োগশিল্প জাদুঘর মিশরের প্রাক্তন রানি নাজলির ৬৭৩টি হিরে বসানো একটি বিরল হার প্রদর্শনী থেকে হাতুড়ি দিয়ে কাচ ভেঙে নিয়ে যাওয়া হয়। শেষ কথা শিল্পের দাম আছে, কিন্তু চোরের হাতে তার দাম নেই রেনোয়া জাদুঘরের এই চুরি তাই শুধুমাত্র ৯০ লক্ষ ইউরোর চিত্রকর্ম চুরি নয়। চারটি ছবির মধ্যে তিনটিরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী উদ্ধার ইতিহাস রয়েছে। অর্থাৎ এগুলি শুধু শিল্পবস্তু নয়;ইউরোপের যুদ্ধ, লুঠ, পুনরুদ্ধার এবং সাংßৃñতিক স্মৃতির দলিলও। আর সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হল;চোরেরা যে দুটি ছবি নিয়ে পালিয়েছে, সেগুলিই এখন তাদের সবচেয়ে বড় বোঝা। পরিচিত রেনোয়ার ছবি আন্তর্জাতিক শিল্পবাজারে লুকিয়ে বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব। ছবির পরিচয় বদলানো যায় না, ইতিহাস মুছে ফেলা যায় নাআর বৈধ সংগ্রাহক এমন চুরি-করা ছবি কিনতে পারবেন না। দুটি ছবি ফিরে এসেছে। দুটি এখনও অদৃশ্য। আর তদন্তের আসল প্রশ্ন এখন শুধু; তকে ছবি চুরি করল?দ নয়। প্রশ্ন হল; কে এই চারটি ছবিকে লক্ষ্য করেছিল? কে জানত কোন ঘরে সেগুলি রাখা আছে? কে তাদের পরবর্তী গন্তব্যের ব্যবস্থা করেছিল? এবং নিখোঁজ দুই রেনোয়া এখন কোথায়?

 

Scroll to Top