৩৬৫ দিন। প্রায় বছর পাঁচেক ধরে ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে খাতায়-কলমে রেজিস্টার্ড বা নথিভুক্ত রাজনৈতিক দল হওয়া সত্বেও বিগত কয়েকটি নির্বাচনে ৬ রাজনৈতিক দলের সাকুল্যে প্রার্থী সংখ্যা মাত্র ১৫! কিন্তু এই ৫ বছর সময়ের মধ্যেই মাত্র ৬ রাজনৈতিক দলের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে গিয়েছে নয় নয় করে অন্তত ১৭০১ কোটি টাকা। তাও আবার এই অনুদান জমা পড়ার সময়সীমা ঘটেছে নির্দিষ্ট একটি অর্থ বর্ষের মধ্যে। তার থেকেও মজার কথা হলো এই প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল জাতীয় নির্বাচন কমিশনের খাতায় নথিভুক্ত হয়েছে শুধুমাত্র গুজরাতের বিভিন্ন ঠিকানা থেকে। এমন বিস্ফোরক তথ্য উঠে এলো বিবিসি-র সাম্প্রতিকতম অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনে।
তদন্তের প্রেক্ষাপট
২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক পরেই যেভাবে রাতারাতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তৃণমূল থেকে বেরিয়ে গিয়ে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটের বিজয়ী হয়ে লোকসভায় সাংসদ হিসেবে যাওয়া ২০ সংসদ রাতারাতি নিজেদের এনসিপিআই-র সাংসদ বলে দাবি করেন সেখান থেকেই শুরু হয় বিবিসির তদন্ত। যে রাজনৈতিক দলের নাম পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কেন গোটা দেশের কোথাও কেউ কখনো শোনেননি, রাতারাতি সেই দলের সাংসদ সংখ্যা ভারতের মতো দেশের কেন্দ্রীয় শাসক জোট এনডিআর বৃহত্তম শরিক বিজেপির পরেই পৌঁছে যাওয়ায় কৌতুহল তৈরি হয় আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক দুনিয়াতেও। কিন্তু সেখান থেকেই উঠে আসে আর এক বিস্ফোরক তথ্য। দেখা যায় শুধুমাত্র এনসিপিআই নয়, জাতীয় নির্বাচন কমিশনের খাতায় রেজিস্টার্ড বা নথিভুক্ত হওয়া সত্বেও বহু রাজনৈতিক দল আছে যারা কখনো ভোটে লড়াই করেই না অথবা লড়লেও কালে ভাবে সাথে একজন বা দুজন প্রার্থী দিয়ে নামকাওয়াস্তে নিজেদের নাম টিকিয়ে রাখে সেই দলগুলিকে বলা হয় রেজিস্টার্ড আনরেকগনাইজ পলিটিকাল পার্টি বা আরইউপিপি।
মাত্র এক বছরে অনুদান ১৭০১ কোটি
বিবিসির প্রতিবেদনে ওই দলগুলির বিরুদ্ধে কোনও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করা হচ্ছে না। তবে বিপুল অনুদান এবং নির্বাচনী কার্যকলাপের মধ্যে যে অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।রীতিমতো তথ্য প্রমাণ তুলে ধরে যে তথ্য সামনে আনা হয়েছে সেখানে দেখা যাচ্ছে, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে এই ছ’টি দলের মোট অনুদান পাঁচটি জাতীয় রাজনৈতিক দল – বিজেপি বাদে কংগ্রেস, সিপিএম, আম আদমি পার্টি, বিএসপি এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মতো সর্বভারতীয় স্তরে পরিচিত রাজনৈতিক দলগুলির মিলিত আয়ের থেকেও প্রায় ২০০ কোটি টাকা বেশি। ওই পাঁচ জাতীয় দলের মোট আয় ছিল ১৪৮০.৪৩ কোটি টাকা। বিবিসির অনুসন্ধান অনুযায়ী, গুজরাতের বিভিন্ন ঠিকানায় রেজিস্টার্ড হওয়া এই ৬ রাজনৈতিক দল বিগত ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মিলিয়ে মাত্র ১৫ জন প্রার্থী দিয়েছিল। সেখানে বিজেপি বাদে ওই ৫ জাতীয় দল মিলিয়ে প্রার্থী দিয়েছিল ৮৯৩ জন।
আম জনমত পার্টির ২ বছরে প্রায় সাড়ে ৮০০ কোটি
বিবিসির অনুসন্ধান মূলক প্রতিবেদনের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে আম জনমত পার্টি। কারণ যে ছয় রাজনৈতিক দলের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে সবথেকে বেশি অনুদান পেয়েছে এই দলটি। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে দলটির অনুদান বাবদ আয় ৬২০ কোটি টাকা। আগের অর্থবর্ষে যা ছিল ২১৬ কোটি টাকা। অথচ ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দলটি মাত্র এক জন প্রার্থী দিয়েছিল।২০২০ সালে পটনায় অনামিকা পাসওয়ানের নেতৃত্বে দলটির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। পরে দলটির সদর দফতর গুজরাতে স্থানান্তরিত হয় বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অনামিকা পাসওয়ান বর্তমানে বিহারেবিজেপির রাজ্য সহ-সভাপতি। বিবিসিকে তিনি জানিয়েছেন, দলটি আহমেদাবাদে চলে যাওয়ার পর তিনি পদত্যাগ করেন।
সত্যবাদী রক্ষক পার্টির অনুদান 330 কোটি
বিজেপি কংগ্রেস সিপিএম অথবা তৃণমূলকে বহু পেছনে ফেলে দিয়ে যেভাবে এই রাজনৈতিক দলগুলি এক অর্থবর্ষে বিপুল পরিমাণ রাজনৈতিক অনুদান পেয়েছে সেই অনুদানের অংকের নিরিখে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সত্যবাদী রক্ষক পার্টি। শুধুমাত্র ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে এই দলের একাউন্টে রাজনৈতিক অনুদান ঢুকেছে ৩৩০.৫৫ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তারা মাত্র একজন প্রার্থী দিয়ে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা নির্বাচনী প্রচারে খরচ করেছে বলে দাবি করেছে। আর বাকি প্রায় ৩১৬ কোটি টাকা তারা নাকি দেশের বিভিন্ন জায়গায় জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের জন্য খরচ করেছে। বাকি চারটি দলের মধ্যে স্বতন্ত্রতা অভিব্যক্তি পার্টি পেয়েছে ২১৯.৬৯ কোটি টাকা, নিউ ইন্ডিয়া ইউনাইটেড পার্টি ২০০.৬৯ কোটি, ভারতীয় ন্যাশনাল জনতা দল ১৯১.৬১ কোটি এবং গরিব কল্যাণ পার্টি ১৩৮ কোটি টাকা।
তদন্তের দাবি বিরোধীদের
ভোটের ময়দানের প্রায় লড়াই না করেই যেভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নাম করে নয় ছয় করা হচ্ছে তার বিস্তারিত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছে ইন্ডিয়া জোটের শরিক দলগুলি। তৃণমূলের লোকসভার সংসদ তথা বিশিষ্ট আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছেন, যে দলগুলির কোনও সাংসদ বা বিধায়ক নেই, তারা এত বিপুল অর্থ কোথায় খরচ করছে? লালু প্রসাদ যাদবের দল আরজেডির রাজ্যসভা সাংসদ ও জাতীয় মুখপাত্র মনোজ কুমার ঝা বিষয়টি নিয়ে অবিলম্বে সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে তদন্তের দাবি তুলে বলেন, ইডি বা সিবিআইয়ের তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
৬ টি দলের সার্ভে রিপোর্ট
তহবিলে জাতীয় দলের চেয়ে ২০০ কোটি বেশি
- khabar365din
- September 7, 2026
- 1:33 pm
- No Comments




