৩৬৫ দিন।জাকির হোসেন, ঢাকা: ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দ্রুত প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে ফের জোরালো দাবি জানাল বাংলাদেশ। সোমবার ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বৈঠকে অন্যতম প্রধান আলোচ্য হয়ে উঠল হাসিনার প্রত্যর্পণ। একই সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের নেতা শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বাংলাদেশে ফেরানোর দাবিও নতুন করে তুলেছে ঢাকা। বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানিয়েছে, “বাংলাদেশ আশা করে, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ভারত দ্রুততর করবে।”
সোমবার সকাল ১১টা নাগাদ ঢাকার সচিবালয়ে তারেকের দফতরে যান ত্রিবেদী। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য “উপযুক্ত পরিবেশ” তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দু’মাসের অভিজ্ঞতাও তারেককে জানান ভারতীয় হাইকমিশনার৷ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর বিদেশবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে আসেন হাসিনা। তার পর থেকে তিনি ভারতেই রয়েছেন। আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অভিযানের অভিযোগে বাংলাদেশের একটি ট্রাইব্যুনাল পরে তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। হাসিনা অবশ্য অভিযোগগুলিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ঢাকার প্রত্যর্পণ আবেদন নিয়ে আইনি এবং বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে আগেই জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
গত ৫ অগস্ট নয়াদিল্লির একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখার পরে হাসিনাকে ঘিরে বিতর্ক নতুন করে বাড়ে। সেখানেই ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তীব্র আপত্তি জানায় ঢাকা। নয়াদিল্লির বক্তব্য, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যমের উদ্যোগে হয়েছিল; ভারত সরকার ওই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিল না এবং সেখানে করা বক্তব্যকেও সমর্থন করেনি।
হাদি হত্যা মামলাও আলোচনায়: শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের ফেরানোর বিষয়টিও ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে তুলেছে বাংলাদেশ।
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের অন্যতম পরিচিত মুখ এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ছিলেন হাদি। তাঁর হত্যাকাণ্ডে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত দুই বাংলাদেশি ফয়সাল করিম মাসুদ এবং আলমগীর হোসেন গত মার্চে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের হাতে উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁর কাছে গ্রেফতার হন।
এর পরে ঢাকা এবং নয়াদিল্লির মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়, দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় হাদি হত্যায় অভিযুক্তদের ফেরানোর বিষয়টি দেখা হবে। বাংলাদেশ তাঁদের বিচারের মুখোমুখি করতে দেশে ফেরাতে চাইছে। তবে অবৈধ ভাবে সীমান্ত পার হওয়ার অভিযোগে ভারতে চলা আইনি প্রক্রিয়ার কারণে প্রত্যর্পণে কিছুটা দেরি হতে পারে বলে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা আগেই জানিয়েছিলেন।
‘এমন কোনও সমস্যা নেই, যা বসে মেটানো যাবে না’: প্রত্যর্পণ নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন ত্রিবেদী। সোমবার বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে আলাদা বৈঠকের পরে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, “এমন কোনও সমস্যা নেই, যা আমরা একসঙ্গে বসে মেটাতে পারি না। আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই এটা বলতে পারি।” গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতপার্থক্যকে স্বাভাবিক বলেও উল্লেখ করেন তিনি। “গণতন্ত্রে সমস্যা থাকবেই। কোনও সমস্যা না থাকলে গণতন্ত্রও থাকে না,” বলেন ত্রিবেদী। তাঁর মতে, পরিবারের মধ্যেও মতপার্থক্য দেখা যায়।
ভারত ও বাংলাদেশকে “দুই প্রাণবন্ত গণতন্ত্র” হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর মন্তব্য, “ভারতের সাধারণ মানুষ এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ একই জিনিস চান–ভাল সম্পর্ক।” দুই দেশের ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে ভারতীয় দূত বলেন, “আমরা শুধু সীমান্তই ভাগ করি না, স্বপ্নও ভাগ করি।” সমস্যা মেটানো সম্ভব কি না জানতে চাইলে তাঁর জবাব, “আমি খুবই আত্মবিশ্বাসী, খুব, খুব আত্মবিশ্বাসী।” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিনকে “বিনয়ী” বলেও উল্লেখ করেন ত্রিবেদী। তাঁর বক্তব্য, প্রায় দু’মাসের বাংলাদেশবাসে তিনি যথেষ্ট সম্মান, স্নেহ এবং উষ্ণতা পেয়েছেন।
দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্নে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, “তাঁরা একসঙ্গে বসলে ভাল হবে।” এর এক দিন আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তারেক রহমান মুখোমুখি হলে বহু দ্বিপাক্ষিক সমস্যার সমাধান হতে পারে বলে মন্তব্য করেছিলেন ত্রিবেদী। দুই প্রধানমন্ত্রীকেই তিনি “মানুষের নেতা” বলে বর্ণনা করেন।
ভারত ইতিমধ্যেই তারেককে নয়াদিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। পাশাপাশি বিমস্টেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনেও তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ রাজনীতিক এবং ভারতের প্রাক্তন রেলমন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে গত এপ্রিলে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার করা হয়। ২৫ জুন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করে আনুষ্ঠানিক ভাবে দায়িত্ব নেন তিনি। তাঁর আগে ওই পদে ছিলেন প্রণয় কুমার ভার্মা।
সোমবারের আলোচনায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান দ্বিমুখী ছবিটিই স্পষ্ট, এক দিকে হাসিনার প্রত্যর্পণ-সহ একাধিক স্পর্শকাতর বিষয়ে নয়াদিল্লির উপর চাপ বাড়াচ্ছে ঢাকা, অন্য দিকে বাণিজ্য, সীমান্ত, জলবণ্টন, জ্বালানি এবং দু’দেশের মানুষের যোগাযোগের মতো ক্ষেত্রগুলিতে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বার্তাও দিচ্ছে দুই সরকার। এ ধরনের বিষয় সামলাতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪০টিরও বেশি দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা রয়েছে।





