পরিচারককে ৩৫০ মেসেজে সুপারি খুনের রাতে পার্টিতে নাচ পুত্রবধূর

৩৬৫ দিন। কানপুরের ওষুধ ব্যবসায়ী বিনীত মিনোচার হত্যাকাণ্ড এখন আর সাধারণ পারিবারিক বিবাদের ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না। ৬৩ বছরের বিনীতকে নিজের ফ্ল্যাটে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়। ময়নাতদন্তে শরীরে ২৬টি আঘাতের কথা উঠে এসেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়;বাড়ি থেকে কোনও মূল্যবান জিনিস খোয়া যায়নি। ফলে শুরু থেকেই তদন্তকারীদের সন্দেহ, এটি ডাকাতি নয়; ব্যক্তিগত শত্রুতা বা পরিকল্পিত হত্যার ঘটনা। এই মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন পুত্রবধূ শালু এবং প্রাক্তন কর্মী বিশাল গৌতম। পুলিশের দাবি, শালুর নির্দেশেই হত্যার পরিকল্পনা হয়েছিল। তবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলি তদন্তকারীদের দাবি হিসেবেই দেখা উচিত। আসল কারণ কি সিসিটিভি? এই মুহূর্তে পুলিশের সামনে সবচেয়ে স্পষ্ট সূত্র সিসিটিভি-কে ঘিরে পারিবারিক সংঘাত। বিনীত মাত্র ১৫,২০ দিন আগে বাড়িতে নজরদারি ক্যামেরা বসিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল নিরাপত্তা। কিন্তু শালুর অভিযোগ ছিল, এতে তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নষ্ট হচ্ছিল।
দেরি করে বাড়ি ফেরা, রাতে পার্টিতে যাওয়া এবং সংসারের খরচ;সবকিছুর উপরই শ্বশুরের নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ২৮ জুলাই একটি পার্টি থেকে দেরিতে ফেরাকে কেন্দ্র করে শালু ও বিনীতের মধ্যে তীব্র ঝগড়াও হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে; সিসিটিভি কি শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষোভের কারণ, নাকি তার আড়ালে ছিল সম্পত্তি ও অর্থের বড় হিসাব? পুলিশ এখনও সম্পত্তির উত্তরাধিকারকে হত্যার নিশ্চিত কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেনি। বরং শালুর বক্তব্য অনুযায়ী, কোটি টাকার পারিবারিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দৈনন্দিন খরচের জন্য তাঁকে শ্বশুরের কাছে টাকা চাইতে হত। এই অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণও ক্ষোভের বড় কারণ হতে পারে। বাড়ির ভিতরে ক্যামেরা কেন;আর শালুর সন্দেহ কোথায়? এখানেই মামলার সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন। বিনীত কেন নিজের বাড়ির ভিতরে ক্যামেরা বসিয়েছিলেন? নিরাপত্তার জন্য;এটাই পরিবারের বক্তব্যের সঙ্গে মেলে। কিন্তু ক্যামেরা বসানোর পর শালুর আপত্তি কেন এত তীব্র হয়েছিল? এখনও পর্যন্ত এমন কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি যে বিনীত শালু ও বিশালের মধ্যে কোনও অবৈধ সম্পর্ক সন্দেহ করতেন। শালুর বয়স নিয়েও সংবাদমাধ্যমে ৩০ ও ৩৬;দুই ধরনের তথ্য এসেছে। বিশাল ছিলেন পরিবারের প্রাক্তন কর্মী। তদন্তে বরং উঠে এসেছে, শালু তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি করেছিলেন এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কথা বলতেন।
তাই সম্পর্কের জল্পনা করা যায়, কিন্তু সেটিকে সত্য বলে লেখা যাবে না। তদন্তে এখন পর্যন্ত যে বিষয়টি অনেক বেশি স্পষ্ট, তা হল;শালুও বিশালের মধ্যে পরিকল্পনার যোগাযোগ ছিল বলে পুলিশের দাবি। ২১ দিনে ৩৩০ ফোন সবচেয়ে বড় ডিজিটাল সূত্র এই মামলার সবচেয়ে বিস্ফোরক সূত্র সম্ভবত মোবাইলের কল-তথ্য। হত্যার আগের ২১ দিনে শালু, তাঁর স্বামী সুব্রত এবং বিশাল গৌতমের মধ্যে মোট প্রায় ৩৩০ বার যোগাযোগ হয়েছিল। এর মধ্যে শালু ও বিশালের প্রায় ৩০টি ফোন এবং সুব্রত ও বিশালের প্রায় ৩০০টি ফোন। হত্যার দিনও শালু ও বিশালের মধ্যে ১৪ বার যোগাযোগের তথ্য সামনে এসেছে। মুছে দেওয়া কথোপকথনের কিছু হোয়াটসঅ্যাপ কলের তথ্যও তদন্তকারীরা উদ্ধার করেছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এখানেই সুব্রতকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। স্বামী সুব্রত;সম্পূর্ণ নির্দোষ, নাকি আরও কিছু লুকিয়ে আছে? এখন পর্যন্ত সুব্রতের বিরুদ্ধে হত্যায় সরাসরি অংশগ্রহণের প্রমাণপ্রকাশ্যে আসেনি। তাঁর বক্তব্য;বিশাল আগে তাঁদের জন্য ছোটখাটো কাজ করত, তাই ফোনে যোগাযোগ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু প্রায় ৩০০ ফোনও তদন্তকারীদের কাছে উপেক্ষা করার মতো সংখ্যা নয়। অন্যদিকে শালুর পরিবারের লোকজন পুলিশের ‘মূলচক্রী’ তত্ত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এবং দাবি করেছেন, শালুর সঙ্গে বিনীতের সম্পর্ক ভালো ছিল। তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে সঠিক অবস্থান হল;সুব্রতের ভূমিকা সন্দেহের বাইরে নয়, কিন্তু হত্যায় তাঁর প্রত্যক্ষ যোগের প্রমাণও এখনও প্রতিষ্ঠিত নয়। তদন্তের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হবে ওই ফোনগুলির সময়, স্থায়িত্ব এবং অবস্থান মিলিয়ে দেখা। হত্যার সময় শালু নাচছিলেন
এই মামলাকে আরও চাঞ্চল্যকর করেছে সেই রাতের পার্টির দৃশ্য। বিনীত যখন নিজের বাড়িতে খুন হচ্ছেন, তখন শালু স্বামী সুব্রতের সঙ্গে একটি পার্টিতে ছিলেন। প্রকাশিত ভিডিওতে তাঁকে গাঢ় বেগুনি পোশাকে স্বামীর সঙ্গে নাচতে দেখা যায়। গোলাপি পোশাকের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে ঘুরলেও প্রকাশিত ভিডিও-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে পোশাকটির রং গাঢ় বেগুনি বলা হয়েছে। পুলিশের দাবি, সেই সময়ই বাড়িতে ঢুকে বিশাল ও রাজকিশোর বিনীতকে হত্যা করে। আরও গুরুতর অভিযোগ;হত্যাকারীদের প্রবেশের ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তারক্ষীকে বোঝানোর ক্ষেত্রে শালুর ভূমিকা ছিল। সবচেয়ে বড় রহস্য এখনও বাকি এই মামলার উত্তর তাই একটিমাত্র প্রশ্নে আটকে নেই। সিসিটিভি কি ছিল কারণ, না অজুহাত? অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কি মূল ক্ষোভ? সম্পত্তি কি ভবিষ্যৎ লক্ষ্য? শালু ও বিশালের সম্পর্কের প্রকৃতি কী ছিল? আর ৩০০ ফোনের ব্যাখ্যা সুব্রত কীভাবে দেবেন? এই প্রশ্নগুলির উত্তরই ঠিক করবে এটি এক নারীর ব্যক্তিগত প্রতিশোধ,সম্পত্তির লোভে পারিবারিক ষড়যন্ত্র, নাকি তার চেয়েও গভীর কোনও সম্পর্কের জটিল পরিণতি। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী সূত্র শালু,বিশালের যোগাযোগ এবং হত্যার রাতে তাঁদের গতিবিধি। কিন্তু সুব্রতের ভূমিকা এবং হত্যার প্রকৃত আর্থিক উদ্দেশ্য;দুটিই এখনও তদন্তের অপেক্ষায়।

Scroll to Top