প্রেসিডেন্সিতে আর এস এসের বন্দনা, বন্দেমাতরম

৩৬৫ দিন। সৌগত মণ্ডল।বাইরের দেওয়ালে সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআই-এর পক্ষ থেকে লেখা আজাদী স্লোগান। শিক্ষাঙ্গনে বিজেপি আরএসএসের আক্রমণ মানছি না। তার পাশেই আরেকটি দেওয়ালে লেখা, দুনিয়ার সব ফুল বাগিচায় লাল গোলাপ ফুটে উঠুক, দুনিয়ার সব ভুখা শিশু লেনিন হয়ে উঠুক। আর এই দুই স্লোগান লেখা দেওয়ালের পাশের দরজা দিয়ে ঢুকেই তখন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ছাত্র সংগঠন এবিভিপির উদ্যোগে আয়োজিত, ১৫০ বর্ষে বন্দেমাতরম শীর্ষক সেমিনার ও আলোচনা সভা। ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুই ছবির মধ্যে কী অসাধারণ বৈপরীত্য চোখে পড়ল আজ বৃহস্পতিবার। তবে সম্প্রতি এসআরএফটিআই-এর ঘটনাকে মাথায় রেখে বামপন্থী ও অতি বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির সঙ্গে এবিভিপি-র কোন সংঘাতের পরিস্থিতি যেন না তৈরি হয় তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে বিপুল পুলিশী প্রহরার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটেও ছিল তুমুল কড়াকড়ি। যদিও শান্তিপূর্ণভাবেই মিটেছে এদিনের সেমিনার।
ঘোষিতভাবে আজ প্রথমবার ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সির ক্যাম্পাসের ভিতরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত হল জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রবাদী সেমিনার। ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র এবং তার অমর সৃষ্টি বন্দেমাতরম গানের ইতিহাস নিয়ে সেখানে বক্তব্য রাখলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের পূর্ব ভারত প্রান্তের প্রচার প্রমুখ জিষ্ণু বসু। তিনি সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের বিজ্ঞানীও। উপস্থিত ছিলেন এবিভিপির প্রদেশ সভাপতি অধ্যাপক মনোরঞ্জন রায় সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা।
প্রেসিডেন্সির ঐতিহ্য মেনে রাষ্ট্রবাদী ভাবধারা
বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম গানের ইতিহাস প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে একদিকে যেমন গানটির রচনা নিয়ে যে সমস্ত ইতিহাস রয়েছে সেই ইতিহাস তুলে ধরেন জিষ্ণু বসু। পাশাপাশি গুরুত্ব দেন কিভাবে ব্রিটিশের হাতে পরাধীন ভারতবর্ষের বুকে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ঐক্যবদ্ধ করতে শুধুমাত্র বন্দেমাতরম স্লোগান যুদ্ধ নির্ঘোষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিভাবে গোটা দেশকে এক সুতোয় বেঁধেছিল বন্দেমাতরম। পাশাপাশি ব্রিটিশ ভারতে জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপের আঁতুড়ঘড় বলে পরিচিত প্রেসিডেন্সির ঐতিহ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্সিতে এলে গায়ে কাঁটা দেয়। ‌ ভারতবর্ষে নবজাগরণের কেন্দ্র ছিল এই প্রেসিডেন্সি। এরপরেই ডিরোজিওর নেতৃত্বে ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন থেকে শুরু করে রাজনারায়ণ বসু, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ এবং ভগিনী নিবেদিতা ও কিভাবে প্রেসিডেন্সি থেকে শুরু হওয়া জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে বন্দেমাতরম গানকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলমন্ত্রে পরিণত করেছিলেন সেই ইতিহাস তুলে ধরেন বিজ্ঞানী জিষ্ণু বসু। পাশাপাশি তুলে ধরেন এই প্রেসিডেন্সির সঙ্গে এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সম্পর্কের ইতিহাস।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখলের অভিযোগ অমূলক
তবে সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলনের সময় থেকে যেভাবে তৎকালীন প্রেসিডেন্সি কলেজ ও পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পরেও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এপিসেন্টার থেকে যেভাবে প্রেসিডেন্সি নকশাল তথা বামপন্থী ও অতি বামপন্থীদের আঁতুরঘর হয়ে উঠেছে তা বদলের সময়ে এসেছে বলে আজ নিজের বক্তব্যে দাবি করেন এবিভিপির প্রদেশ সভাপতি অধ্যাপক মনোরঞ্জন রায়। তিনি বলেন আজ এখানে হয়তো মাত্র কয়েক জন রাষ্ট্রবাদী চিন্তাধারায় দীক্ষিত ছাত্র এই সেমিনারে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্সির হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী এবিভিপির ছাতার তলায় আসবেন। যদিও সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এর পাশাপাশি বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি বিজেপি ও আরএসএস এর বিরুদ্ধে শিক্ষাঙ্গন দখলের রাজনীতির যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা এক কথায় উড়িয়ে দেন জিষ্ণু বসু। দেশ জুড়ে সাম্প্রতিক ককরোচ আন্দোলন প্রসঙ্গে অবশ্য তিনি রাজনৈতিক কোন মন্তব্য করতে না চাইলেও তাৎপর্যপূর্ণভাবে বলেন, আশা করবো কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের সুমতির উদয় হবে। বর্তমান প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে বন্দেমাতরম এর জাতীয়তাবাদী ভাবধারাকে নতুন করে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। তাহলেই তারা বুঝতে পারবে যে দেশমাতৃকা বা ভারতবর্ষের বুকে দাঁড়িয়ে তারা ভারত তেরে টুকরে হোঙ্গে স্লোগান দিচ্ছেন, সেই ভারত বর্ষ আমাদের মা।
অন্যদিকে, এই সেমিনারের অন্যতম উদ্যোক্তা এবিভিপির প্রেসিডেন্সি ইউনিট সভাপতি মৃদুল বণিকের বক্তব্য, প্রেসিডেন্সি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং স্বামী বিবেকানন্দের মতো ব্যক্তিত্বদের স্মরণ করতেই এই ক্যাম্পাসকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

Scroll to Top