রাজ্যের নতুন শিল্পনীতি
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় নতুন জমিনীতি

৩৬৫ দিন। সিঙ্গুরে আমরা কিছু একটা করবই। নামী বাণিজ্যিক ভারী গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থা অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক ভাবে কথাও হয়েছে। কিন্তু আমরা শুধু মৌ স্বাক্ষর করে লোকদেখানো চমক দিতে চাই না। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে রাজ্য সরকারের নয়া শিল্পনীতি ঘোষণা করতে গিয়ে এভাবেই সিঙ্গুরের বিতর্কিত জমিতে নতুন শিল্প স্থাপনের কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। গাড়ি নির্মাতা সংস্থা অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে সিঙ্গুরের জমিতে শিল্প নিয়ে আলোচনার কথায় তুলে মুখ্যমন্ত্রী বুঝিয়ে দিলেন সিঙ্গুরে টাটা ন্যানোর পরিবর্ত হিসেবে গাড়ি তৈরির কারখানা তৈরীর কথাই ভাবছে রাজ্য সরকার।
ইনভেস্ট ইন বেঙ্গল, গ্রো উইথ বেঙ্গল
২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন, বেঙ্গল মিনস বিজনেস।‌ এবারে রাজ্য সরকারের শিল্পনীতি ঘোষণা করতে গিয়ে বিনিয়োগ সম্পর্কে রাজ্য সরকারের নতুন স্লোগান তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমাদের মূল স্লোগান – ইনভেস্ট ইন বেঙ্গল, গ্রো উইথ বেঙ্গল।
রাজ্যের নয়া শিল্পনীতি ভূমি পুলিং
সিপিএম যেমন সরকারে থাকার সময় সরকারি উদ্যোগে কৃষকদের কাছ থেকে জোর করে জমি কেড়ে নেওয়ার শিল্পনীতি তৈরি করেছিল তার সমালোচনা করার পাশাপাশি পরবর্তীকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে শিল্পপতিদের নিজের দায়িত্বে জমি কিনে নেওয়ার যে জমি নীতি ঘোষণা করেছিলেন তারও সমালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখনোই শিল্পের জন্য জমি দিতে আগ্রহ দেখাননি। কার্যত রাজ্যে কোনো নির্দিষ্ট জমি নীতিই ছিল না। তৃণমূলের আমল ছিল সম্পূর্ণ লগ্নি-বিরোধী। আগের সরকারের জমানায় ৮টি বাণিজ্য সম্মেলনে খোদ সরকারেরই প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল, অথচ প্রকৃত কোনো বড় বিনিয়োগ আসেনি। বাংলায় আর কোনো হুলিগানিজম বা গুন্ডামি চলবে না। আমাদের সরকারের প্রথম এবং প্রধান স্লোগান- ভয় আউট, ভরসা ইন।
পাশাপাশি বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি জানান, বিজেপি শাসিত সরকার ইতিমধ্যেই ২০১৩ সালের সংশোধিত ভূমি ক্রয় আইন গ্রহণ করেছে এবং শিল্পায়নের গতি বাড়াতে ভূমি পুলিং ব্যবস্থাও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জোর করে জমি অধিগ্রহণের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে সরকার নিজেই জমি কিনে একটি স্বচ্ছ ল্যান্ড ব্যাংক তৈরি করবে এবং তা শিল্পপতিদের হাতে তুলে দেবে। যারা আগের জমানায় শিল্পের নামে জমি নিয়ে ফেলে রেখেছেন, তাঁদের অবিলম্বে সেই জমি ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। জমি নিয়ে ফেলে রাখা বরদাস্ত করা হবে না।
এদিনের অনুষ্ঠানে রাজ্যের ৩৩ শিল্প সংস্থা ও শিল্পপতিদের হাতে জমির কাগজ তুলে দিয়ে নতুন কর্মসংস্থানের দিশা দেখানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। নয়া শিল্পনীতিতে বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে রাজ্য সরকার। যোগ্য শিল্প সংস্থার জন্য নিয়োগকর্তার ইপিএফ অবদানে সহায়তা, মহিলা নিয়োগে বাড়তি সুবিধা, পিছিয়ে থাকা এলাকায় বিনিয়োগে উৎসাহ এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
তোলাবাজির অভিযোগে 15 মিনিটে গ্রেফতার
শিল্পনীতি ঘোষণার মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী বারে বারে উপস্থিত শিল্পপতি এবং শিল্প সংস্থাগুলিকে রাজ্যে নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করার আশ্বাস দিয়ে জানিয়ে দেন তোলাবাজি বা দাদাগিরির ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেবে রাজ্য সরকার। তোলাবাজির প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা, অভিযোগ পেলে ১৫ মিনিটের মধ্যে গ্রেফতার করা হবে।
শিল্পপতি বাছাইয়ে নিয়ন্ত্রণ
পশ্চিমবঙ্গ তথা দেশ-বিদেশের সমস্ত শিল্প সংস্থার কাছে বা রাজ্যে বিনিয়োগের আহ্বান জানালেও রাজ্যের নয়া শিল্পনীতি ঘোষণার মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন শিল্পপতি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কিছু নীতি মেনে চলবেন তিনি। যাঁদের বিরুদ্ধে ইডি বা সিবিআইয়ের মামলা রয়েছে কিংবা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের টাকা আত্মসাৎ ও ব্যাঙ্ক জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর কাজের সম্পর্ক থাকবে না। তিনি বলেন, সামনাসামনি দেখা হলে নমস্কার, হ্যালো বলব। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ওয়ার্কিং রিলেশন রাখা সম্ভব নয়।
রাজ্যে আসছে একাধিক শিল্প গোষ্ঠী
রাজ্যে নতুন শিল্প ইউনিট গড়ার লক্ষ্যে নবান্নে এসে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করলেন জেএসডব্লিউ গ্রুপের চেয়ারম্যান সজ্জন জিন্দল। মুখ্যমন্ত্রী জানান, সজ্জন জিন্দল জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসে এই প্রকল্পের ভূমিপুজো হতে পারে। শিল্পায়নের পাশাপাশি এই প্রকল্পের আওতায় আইটিআই-এর মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা এবং কয়েকটি মন্দির সংস্কারের দায়িত্ব জেএসডব্লিউ গোষ্ঠীকে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বিনিয়োগে মিলবে উৎসাহ ভাতা
নতুন নীতিতে হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা এবং ১০০ শতাংশ পর্যন্ত স্ট্যাম্প ডিউটি ছাড়ের কথা বলা হয়েছে। ক্ষুদ্র, মাঝারি, বৃহৎ ও পরিষেবা ক্ষেত্র— সব ধরনের শিল্পকেই এই সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অনগ্রসর এলাকায় কারখানা গড়লে মিলবে অতিরিক্ত উৎসাহ ভাতা। গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন, সবুজ বিদ্যুৎ এবং গবেষণা-উন্নয়নমূলক কাজকে। ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে চিহ্নিত করা হয়েছে ১৫টি ক্ষেত্র।
জমি অধিগ্রহণ করতে কৃষকদের রক্ত ঝরবে না
৩৪ বছরের সিপিএম জমানায় কিভাবে লাল পতাকা বিভিন্ন কারখানার গেটে লাগিয়ে দিয়ে সিপিএম তথা বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন গুলি একের পর এক শিল্প ধ্বংস করেছে তা এদিন তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। বিশেষ করে তুলে ধরেন ২০০৭ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নির্দেশে কিভাবে শিল্পপতিদের হাতে তিন ফসলি উর্বর কৃষিজমি তুলে দেওয়ার জন্য নন্দীগ্রামে ঢুকেছিল সিপিএমের হার্মাদ বাহিনী এবং রাজ্য পুলিশ। তিনি বলেন, বামফ্রন্ট জমানার মতো জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে কৃষকদের রক্ত ঝরবে না। শিল্পের জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে কৃষকের উপর গুলি চলবে না। সেইসঙ্গে কমিউনিস্টদের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এসব চলবে না। কমিউনিস্টদের বলে দেবেন, যাঁরা কাজ বন্ধ করবেন তাঁদের কাজ বন্ধ করে দেব। জেলে ঢোকাব। অনেকদিন জেলে থাকবেন। লেবার কমিশন আছে। সেখানে যান। সব হবে, কাজ বন্ধ হবে না।
শিক্ষিত বেকারদের জন্য ভরসা প্রকল্প
আজ হুগলি পুরশুড়ার একটি অনুষ্ঠান থেকে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ২৩ নভেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে
ভরসা প্রকল্পে অনুমোদন দেওয়া হবে। জানুয়ারি থেকে আবেদন করতে পারবেন শিক্ষিত বেকাররা। রাজ্যের শিক্ষিত বেকারদের উদ্দেশ্যে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, যতক্ষণ না চাকরি পান, সরকার পাশে থাকবে।

Scroll to Top