৭৯ বছর পর ভারতে চিতা শিকার! চোরাশিকারীদের ছররা গুলিতে জখম চিতা শাবকের মৃত্যু

৩৬৫ দিন। ১৯৪৭ সাল। শেষ তিন জীবিত এশিয়াটিক চিতা গুলি করে মারেন মহারাজা রামনুজ প্রতাপ সিং দেও। বাঘ মারাকে একেবারে বাঁ হাতের খেল করে ফেলছিলেন রামানুজ। ১৭০০-র বেশী বাঘ মেরে কুখ্যাত হয়েছিলেন। তবে ১৯৪৭-র সেই তিন চিতা খুনের পর আর এ দেশে চিতা দেখা যায়নি। প্রায় সাত দশক পর ফের চিতা শিকারের ঘটনা ঘটল দেশে। অবশ্য-ই চোরাশিকার। হাই প্রোফাইল প্রোজেক্ট চিতায় জন্ম নেওয়া ১৯ মাসের চিতা শাবককে ছররা গুলিতে ঝাঁঝরা করে মারল চোরাশিকারীরা। অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় তার চিকিৎসা চলছিল কিন্তু বাঁচানো গেল না। চিতা শাবকের মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করে চমকে উঠেছেন চিকিৎসকরা। সেখানে বলা হয়েছে চিতা শাবকের দেহে ৫ টি ছররা গুলি বিঁধেছিল। এ ছাড়া সারা শরীরে আঘাত তো ছিল-ই। চিতার মত ধূর্ত ও লড়াকু বলেই হয়তো এতো অত্যাচারের পরেও প্রাণঘাতী আঘাত নিয়ে সে চোরাশিকারীদের গ্রাস থেকে পালিয়ে যায় যদিও তার প্রাণ বাঁচানো গেল না। কুনো জাতীয় উদ্যান সূত্রে জানা যাচ্ছে,এক্স রে -তে চিতা শাবকের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় অজ্ঞাত বস্তুর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। পরে জবলপুরের NDVSU-র ভেটেরিনারি সার্জারি বিভাগে সিটি স্ক্যান করা হলে দেখা যায়, ওই বস্তুগুলি তার অভ্যন্তরীণ অঙ্গ, পেশি ও স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করেছে। অস্ত্রোপচারে চিতাটির শরীর থেকে ৫টি ছররা গুলি বের করা হয়। শাবকটিকে বাঁচানোর সবরকম চেষ্টা হলেও মঙ্গলবার মৃত্যু হয় তার। এদিকে এই ঘটনা সামনে আসার পর নডেচড়ে বসেছে কেন্দ্রের বনদফতর ও মধ্যপ্রদেশ সরকার।‌ কুনো সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি শুরু হয়েছে। কী ভাবে চোরাশিকারীরা কুনোর ভেতর ঢুকে চিতা শাবককে গুলি করল তার তদন্ত শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রদেশ সরকারের বন বিভাগ ও পুলিশ আধিকারিকদের নিয়ে একটি স্পেশাল টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে। তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন রাজ্যের প্রধান মুখ্য বন সংরক্ষক (বন্যপ্রাণ) ড. সমীতা রাজোরা। তদন্তকারীদের অনুমান করা হচ্ছে, চোরাশিকারির হামলাতেই মৃত্যু হয়েছে চিতাটির। একইসঙ্গে এই ঘটনায় দেশে মোট চিতার সংখ্যা দাঁড়াল ৫৮তে। এর মধ্যে কুনো জাতীয় উদ্যানে ৫২টি। ৪টি গান্ধী সাগর অভয়ারণ্যে এবং ২টি বীরাঙ্গনা দুর্গাবতী টাইগার রিজার্ভে রয়েছে।
ঘটনাটি কী?
কুনোর বনদফতর জানাচ্ছে, রবিবার রুটিন তল্লাশির সময় কুনো অভয়ারণ্যের অন্তর্গত মোরেনায় পাহাড়পুর এলাকা থেকে ১৯ মাসের একটি পুরুষ চিতাশাবককে অত্যন্ত সঙ্কটজনক অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে জানা যায় ওই চিতা শাবক স্ত্রী চিতা নিরভার সন্তান। দ্রুত চিতাশাবকটিকে কুনোর পশু চিকিৎসালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আপাতত সেখানেই তার চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, ওই চিতাশাবকের শরীরে একাধিক গুরুতর আঘাত রয়েছে। এই আঘাত অন্য কোনো বন্য জন্তুর সঙ্গে মারামারিতে হতে পারে না। একমাত্র ধারালো কোনো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করলে ওই রকম মারাত্মক আঘাত লাগতে পারে। যদিও কুনোর তরফে সরাসরি চোরাশিকারীদের উৎপাতের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কুনোর চিফ কনজারভেটর অফ ফরেস্ট উত্তম শর্মা। তিনি জানিয়েছিলেন, ‘আগামী ৭২ ঘণ্টার আগে চিতাটির শারীরিক পরিস্থিতি নিয়ে নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। ওর শরীরে গুরুতর জখম রয়েছে। তবে সেটা কীভাবে হয়েছে, তা বলার সময় এখনও আসেনি।’ শেষ পর্যন্ত চিতা শাবকটিকে বাঁচানো গেল না।
কোথায় প্রশ্ন?
কুনোয় লাগাতার চোরাশিকারীর উৎপাতে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠছে। কুনো সূত্রে যে পরি সংখ্যান দেওয়া হচ্ছে তাতে সেখানে এখন চিতার সংখ্যা ৬০-এর আশেপাশে। তার মধ্যে ৪১ টির জন্ম কুনো তে হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি যদি প্রোজেক্ট চিতার সাফল্য হয় তাহলে উদ্বেগ হল নজরদারি। অতীতে একাধিক বার কুনোর নজরদারি ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চোরাশিকারীরা একটি ১৯ মাসের শাবককে জখম করে ফেলল তা জানতেই পারল না বনদফতর? এদিকে খাতায় কলমে কুনো জাতীয় উদ্যানের নিজস্ব টাইগার স্ট্রাইক ফোর্স রয়েছে। নজরদারির জন্য অত্যাধুনিক সরঞ্জাম রয়েছে, ডগ স্কোয়াড রয়েছে অর্থাৎ সরকারি সব রকম ব্যবস্থা থাকার পরেও কেন গাফিলতি? এই প্রশ্ন বার বার উঠছে।

Scroll to Top