রুটসের পর এ বার খুলছে আরও ১০ রেস্তরাঁ, সবুজ সঙ্কেতের অপেক্ষায় আরও ১২ রেস্তোরাঁ

৩৬৫ দিন। রুটস রেস্তরাঁর পর এ বার কলকাতার আরও একাধিক নামী রেস্তরাঁয় খুলছে দরজা। খাদ্যনিরাপত্তা সংক্রান্ত ত্রুটি ও নিয়মভঙ্গের অভিযোগে কলকাতা পুরসভার নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া ১০টি রেস্তরাঁকে ফের ব্যবসা শুরুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও ১২টি রেস্তরাঁকে পুনরায় খোলার বিষয়ে সক্রিয় ভাবে বিবেচনা করছে পুরসভা। অর্থাৎ,সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে শীঘ্রই মোট ২২টি রেস্তরাঁ ফের স্বাভাবিক পরিষেবা শুরু করতে পারে।
রুটসের পর এ বার একে একে খুলছে দরজা
খাদ্যনিরাপত্তা সংক্রান্ত পুরসভার অভিযানের পরে রেস্তরাঁগুলির উপর তৈরি হয়েছিল চাপ। সেই পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে প্রথমে রুটস রেস্তরাঁ ফের খোলার অনুমতি পায়। তার পরেই এ বার একে একে আরও কয়েকটি রেস্তরাঁয় ফিরছে স্বাভাবিক পরিষেবা। পুরসভার সাম্প্রতিক পরিদর্শনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির রান্নাঘর, খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য পরিকাঠামো খতিয়ে দেখা হয়েছে।
তালিকায় নিজামস, করিমস, আরসালান
ফের খোলার অনুমতি পাওয়া রেস্তরাঁগুলির মধ্যে রয়েছে কলকাতার পরিচিত নাম নিজামস, করিমস এবং আরসালান।মির্জা গালিব স্ট্রিটের করিমস মঙ্গলবার থেকেই দরজা খুলেছে। অন্য দিকে, ৯৮ বছরের পুরনো নিজ়াম’স বুধবার থেকে ফের চালু হওয়ার কথা।শহরের খাদ্যরসিকদের কাছে এই খবর যথেষ্ট স্বস্তির। দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় রেস্তরাঁগুলি বন্ধ থাকায় উৎসবের মরসুমের আগে ব্যবসায়ী থেকে কর্মী সকলের মধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
কেন বন্ধ হয়েছিল এত রেস্তরাঁ?
গত সপ্তাহে কলকাতা পুরসভা মোট ৪০টি রেস্তরাঁ ও মিষ্টির দোকানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। সপ্তাহব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তা অভিযানে পুরসভার আধিকারিকেরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একাধিক অনিয়ম দেখতে পান।কোথাও খাবার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি, কোথাও খাদ্যদ্রব্যের উপরে প্রয়োজনীয় পরিচিতি বা ব্যবহারের তারিখের তথ্য ছিল না। আবার কয়েকটি রেস্তরাঁয় খাবারে ব্যবহৃত রং নিয়েও আপত্তি ওঠে। খাদ্যনিরাপত্তার নির্ধারিত মানের বাইরে কোনও উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও নজরদারি চালানো হয়।
দু’সপ্তাহের মধ্যে ত্রুটি সারানোর নির্দেশ
পুরসভার তরফে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলিকে ত্রুটি সংশোধনের জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল।নির্দেশ ছিল, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমস্ত সমস্যা মিটিয়ে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করতে হবে। তা না হলে নিষেধাজ্ঞা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।এর পর বেশ কয়েকটি রেস্তরাঁ পুরসভার কাছে ফের পরিদর্শনের আবেদন করে। গত দুদিনে আধিকারিকেরা সেই সব প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, অনেক রেস্তরাঁই বন্ধ থাকার সময়টিকে কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করেছে।
রান্নাঘর থেকে খাবার সংরক্ষণ বদলেছে ব্যবস্থাপনা
পুরসভা সূত্রে খবর, সংশোধনের ক্ষেত্রে মূলত রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা, খাদ্য সংরক্ষণ এবং উপকরণের ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। যে সব জায়গায় খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণে সমস্যা ছিল, সেখানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা হয়েছে।
খাবারে ব্যবহৃত উপকরণ সম্পর্কে যথাযথ তথ্য রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পুরসভার বক্তব্য, খাদ্যনিরাপত্তা বিধি মেনে চলা শুধু পরিদর্শনের সময় নয়, প্রতিদিনের ব্যবসার ক্ষেত্রেও বাধ্যতামূলক।
নিজামসে বিরিয়ানির রং নিয়ে বদল
নিজামস এর ক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে উঠে এসেছে বিরিয়ানিতে ব্যবহৃত রঙের প্রসঙ্গ। রেস্তরাঁটির মালিক সমর নাগ জানিয়েছেন, পুরসভার পরিদর্শনে বিরিয়ানিতে ব্যবহৃত রঙের পরিমাণ অনুমোদিত সীমার বেশি পাওয়া গিয়েছিল।তাই এ বার থেকে রেস্তরাঁটিতে রঙিন বিরিয়ানিতে কৃত্রিম রঙের বদলে শুধু জাফরান ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাদা বিরিয়ানিও থাকবে। দু’ধরনের বিরিয়ানি আলাদা ভাবে তৈরি করা হবে।প্রথম দিকে সীমিত পরিমাণে এই বিরিয়ানি তৈরি করা হবে। গ্রাহকদের প্রতিক্রিয়া দেখে পরে উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন নিজামস কর্তৃপক্ষ।
উৎসবের মরসুমের আগে স্বস্তি
রেস্তরাঁ বন্ধ থাকার প্রভাব শুধু মালিকদের উপর নয়, কর্মীদের উপরও পড়েছিল। নিজ়াম’স-এর মালিকের বক্তব্য, উৎসবের মরসুম রেস্তরাঁ ব্যবসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। আচমকা ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মীদের মধ্যে বেতন ও বোনাস নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
ফলে দ্রুত ত্রুটি সংশোধন করে ফের ব্যবসা শুরু করতে পারায় স্বস্তি ফিরেছে কর্মীদের মধ্যেও।
আরও ১২ রেস্তরাঁর দিকে নজর
প্রথম দফায় ১০টি রেস্তরাঁকে পুনরায় খোলার অনুমতি দেওয়া হলেও পুরসভার নজর এখন আরও ১২টি প্রতিষ্ঠানের দিকে। এই রেস্তরাঁগুলির সংশোধনমূলক কাজ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র দেওয়া হতে পারে।পুরসভা অবশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছে, ছাড়পত্র পাওয়া মানেই নজরদারি শেষ নয়। ভবিষ্যতেও খাদ্যনিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কি না, তা দেখতে পরিদর্শন চলবে।
নমুনা সংগ্রহও অব্যাহত
খাবারের মান যাচাইয়ের জন্য নমুনা সংগ্রহের কাজও চলছে। মঙ্গলবারের খাদ্যনিরাপত্তা অভিযানে প্রায় ২,৭০০টি খাদ্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।অর্থাৎ, এক দিকে ত্রুটি সংশোধন করা প্রতিষ্ঠানগুলিকে ব্যবসায় ফেরার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, অন্য দিকে খাবারের গুণমান ও নিরাপত্তা নিয়ে পুরসভার নজরদারিও অব্যাহত থাকছে।রুটসের পর নিজামস, করিমস, আরসালান-সহ আরও কয়েকটি পরিচিত রেস্তরাঁর দরজা খোলার খবরে তাই কলকাতার খাদ্যপ্রেমীদের মুখে হাসি ফিরছে। তবে পুরসভার বার্তা পরিষ্কার স্বাদ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে আপস নয়, কিন্তু খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রেও কোনও ছাড় নয়।

Scroll to Top