স্পোর্টস ব্র্যান্ডের নামে নগ্নতার প্রদর্শন
২৪ ঘণ্টায় ৫৫ কোটি ভিউ

নগ্ন সিডনি সুইনি, নোভিগের বিজ্ঞাপন: খেলা কোথায়, যৌনতা কোথায়?
নগ্ন শরীর। স্তন ঢাকা কখনও রাগবি বল দিয়ে, কখনও দুটি আমেরিকান ফুটবল দিয়ে। কখনও বেসবল ব্যাট, কখনও হকি স্টিক। চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে থাকা সিডনির পিঠে বাস্কেটবল, হাঁটুর পিছনে টেনিস বল, পায়ের কাছে ফুটবল। আর একটি ছবিতে নিতম্বের ফাঁকে টেনিস র‌্যাকেট।
খেলাধুলার বিজ্ঞাপন এমনই হবে? এই প্রশ্নেই এখন উত্তাল আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার ক্রীড়াজগৎ। বিতর্কের কেন্দ্রে হলিউড অভিনেত্রী সিডনি সুইনি এবং ক্রীড়া-পূর্বাভাসের বাজার নোভিগ। ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রায় এক মিনিটের বিজ্ঞাপনটিতে সিডনিকে প্রায় সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় নানা খেলার সরঞ্জাম নিয়ে দেখা যায়। কয়েক দিনের মধ্যেই বিজ্ঞাপনটি কোটি কোটি বার দেখা হয়েছে। তারপরই মহিলা ক্রীড়াবিদদের একের পর এক তীব্র প্রতিবাদ।
সিডনি কে?
১৯৯৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের স্পোকেনে জন্ম সিডনি সুইনির। কিশোরী বয়সেই অভিনয়ের জন্য লস অ্যাঞ্জেলেসে চলে যান। ছোট চরিত্র দিয়ে শুরু করে পরে ‘ইউফোরিয়া’ এবং ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’ তাঁকে আন্তর্জাতিক তারকা করে। বড় পর্দাতেও তাঁর পরিচিতি দ্রুত বাড়ে।
খেলাধুলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও একেবারে নেই, এমন নয়। ছোটবেলায় ফুটবল, সফটবল, জলক্রীড়া এবং বিভিন্ন মার্শাল আর্টে অংশ নিয়েছেন। ফলে নোভিগের প্রচারে খেলার ভাষা ব্যবহার তাঁর কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত বিষয় নয়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা—তিনি এই বিজ্ঞাপনে অনিচ্ছুক মডেল নন। নোভিগের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সাধারণ মুখপাত্রের নয়। তিনি সংস্থার কৌশলগত অংশীদার এবং অংশীদারিত্বের মালিক। নোভিগের প্রধান নির্বাহীও বলেছেন, সিডনি প্রচারের মূল বার্তা তৈরিতে সাহায্য করেছেন।
নগ্ন দৃশ্যে অভিনয় করতে তিনি স্বচ্ছন্দ কি না—এই প্রশ্নের উত্তরে তাঁর কোনও আলাদা সাক্ষাৎকারে “আমি নগ্ন বিজ্ঞাপনে স্বচ্ছন্দ” ধরনের সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু তিনি স্বেচ্ছায় প্রচারের অংশ হয়েছেন, মালিকানাও নিয়েছেন এবং নোভিগের দেওয়া বিবৃতিতে প্রচারটিকে “মজার ভাবনা”, আত্মবিশ্বাস, হাস্যরস ও খেলাচ্ছলে তৈরি বলে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ এটি তাঁর অজান্তে বা অনিচ্ছায় করা কাজ নয়।
বিজ্ঞাপনে আসলে কী আছে?
নোভিগের উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের অন্য ভবিষ্যদ্বাণী-বাজার থেকে আলাদা করা। যেখানে রাজনীতি, যুদ্ধ, মৃত্যু, বিনোদন—বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাজি বা পূর্বাভাসের সুযোগ থাকে, নোভিগ নিজেকে শুধু খেলাধুলার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরতে চায়। সেই ধারণার নাম দিয়েছে—“শুধু খেলা”। কিন্তু সেই “শুধু খেলা” দেখাতে গিয়ে সিডনির শরীরই হয়ে উঠেছে বিজ্ঞাপনের প্রধান দৃশ্য। শুরুতেই তিনি নগ্ন অবস্থায় দুটি বড় আমেরিকান ফুটবল দিয়ে নিজের স্তন ঢেকে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। পরে বাস্কেটবল হুপের উপর নগ্ন হয়ে বসে বাস্কেটবল ঘোরান। তারপর ফুটবল, টেনিস, বেসবল, হকি, গল্ফ—একটির পর একটি খেলা আসে। কোথাও স্তন ঢাকে ব্যাট, কোথাও র‌্যাকেট, কোথাও বল। বেশিরভাগ সময়ই তাঁর স্তন খোলা অবস্থায় থাকে এবং শরীরের নীচের অংশও কেবল খেলার সরঞ্জাম দিয়ে আংশিক আড়াল করা হয়েছে।
শেষদিকে তাঁকে নগ্ন অবস্থায় বিলিয়ার্ডের টেবিলের উপর শুয়ে থাকতে দেখা যায়। সেখানে তাঁর সংলাপ—এই শরীর নিয়ে নোভিগে লেনদেন করা যাবে না, তিনি শুধু এখানে দেখতে ভালো লাগছেন। স্থিরচিত্রের ক্ষেত্রেও একই কৌশল। প্রকাশিত ছবির সংখ্যা অন্তত সাতটি। এক ছবিতে রাগবি বল দিয়ে স্তন ঢাকা, অন্যটিতে বেসবল ব্যাট; কোথাও হকি স্টিক, কোথাও টেনিস র‌্যাকেট; আর একটি ছবিতে চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে থাকা নগ্ন সিডনির শরীরে বিভিন্ন খেলার বল সাজানো। অর্থাৎ এটি একটি ছবি নয়। ভিডিও + অন্তত সাতটি প্রচার-ছবি + দেশজুড়ে প্রচারাভিযান। নোভিগ জানিয়েছে, প্রচারটি ডিজিটাল মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ভিডিও এবং রাস্তায় বড় বিজ্ঞাপন—সব জায়গায় চালানো হবে। ফুটবল মরসুম জুড়ে আরও প্রচার এবং নতুন দৃশ্য আসার কথা।
কত টাকা পেয়েছেন সিডনি?
সঠিক অঙ্ক প্রকাশিত হয়নি। এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, সিডনি শুধু বিজ্ঞাপনের পারিশ্রমিক নেওয়া অভিনেত্রী নন। তিনি নোভিগের অংশীদার এবং অংশীদারিত্বের মালিক। তাঁর মালিকানার শতাংশ, চুক্তির মূল্য বা নগদ পারিশ্রমিক—কোনওটাই প্রকাশ্যে নেই। ফলে “এই বিজ্ঞাপনের জন্য সিডনি অমুক কোটি টাকা পেয়েছেন”—এমন কোনও নির্ভরযোগ্য সংখ্যা এখন বলা যায় না। অভিযোগ: খেলাধুলাকে যৌন করা হয়েছে প্রতিবাদের মূল অভিযোগ খুব সরল—মহিলা খেলাধুলাকে আবারও নারীদেহ ও যৌনতার প্যাকেটে বিক্রি করা হচ্ছে। অলিম্পিক সাঁতার চ্যাম্পিয়ন আরিয়র্ন টিটমাস সবচেয়ে তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বছরের পর বছর নিজেদের দক্ষতা, পরিশ্রম, শক্তি ও সাফল্য দিয়ে মহিলা ক্রীড়াবিদরা সম্মান আদায় করেছেন। সেখানে এই ধরনের বিজ্ঞাপন সেই লড়াইকেই পিছনে ঠেলে দেয়।bব্রিটিশ দৌড়বিদ অ্যামি হান্টও সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলেন—“সিডনি সুইনি, খেলাধুলায় একজন নারীকে এমনই দেখতে হয়।” তারপর নিজের কথার ব্যাখ্যায় বলেন—পেশি, পরিশ্রম, ঘাম, রক্ত এবং চোখের জল। প্রাক্তন মার্কিন জিমন্যাস্ট গ্রেসি ক্রেমারও একই ছবি তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, মহিলা ক্রীড়াবিদদের সারাজীবন শরীর নিয়ে বিচার এবং যৌনতার বস্তুতে পরিণত হওয়ার বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার জলক্রীড়াবিদ টিলি কার্নস, সাইক্লিস্ট সোফি ক্যাপওয়েল, হকি খেলোয়াড় জক বার্ট্রাম, বক্সার স্কাই নিকলসন-সহ বহু ক্রীড়াবিদ প্রতিবাদ করেছেন। নিকলসন একটি গুরুত্বপূর্ণ কথাও বলেছেন—এই বিতর্ক নোভিগকে ঠিক সেই প্রচারটাই এনে দিচ্ছে, যা সংস্থাটি চেয়েছিল।
সিডনির পাল্টা চাল
সিডনি সরাসরি দীর্ঘ জবাব দেননি। কিন্তু ১৩ সেপ্টেম্বর তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় এল অন্যরকম উত্তর। তিনি প্রকাশ করলেন ইএসপিএনের বিখ্যাত ‘দ্য বডি ইস্যু’-তে নগ্ন বা অর্ধনগ্ন হয়ে ছবি তোলা ক্রীড়াবিদদের ছবি। সেখানে ছিলেন সেরেনা উইলিয়ামস, রোন্ডা রাউসি, সু বার্ড, মেগান র‌্যাপিনো, ক্যারোলিন ওজনিয়াকি, মাইলস গ্যারেট, রব গ্রঙ্কোভস্কি, কার্ল-অ্যান্থনি টাউনস-সহ আরও অনেকে। বার্তাটি পরিষ্কার: ক্রীড়াবিদরা নগ্ন হয়ে ছবি তুলতে পারেন, তাহলে তিনি কেন পারবেন না? কিন্তু এখানেই বিতর্কের দ্বিতীয় দিক।
ইএসপিএনের ছবিগুলির উদ্দেশ্য ছিল ক্রীড়াবিদদের শরীর, পেশি, প্রশিক্ষণ, চোট, শক্তি এবং শরীরের বৈচিত্র্য দেখানো। নোভিগের বিজ্ঞাপনে নগ্ন শরীর ব্যবহার করা হয়েছে একটি বাণিজ্যিক প্রচারের হাস্যরস এবং যৌন আবেদন তৈরির জন্য। তাই নগ্নতা দু জায়গাতেই থাকলেও উদ্দেশ্য এক কি না—সেটাই আসল প্রশ্ন।
শেষ পর্যন্ত লাভ কার?
নোভিগের প্রচার অবশ্যই হয়েছে। প্রথম দুই দিনেই বিজ্ঞাপনটি ২ কোটি ২০ লক্ষের বেশি বার দেখা হয়েছিল; পরে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দর্শকসংখ্যা আরও বেড়েছে বলে জানানো হয়। একটি বিজ্ঞাপন-বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নোভিগকে নিয়ে অনলাইন আলোচনাও কয়েক গুণ বেড়েছে। কিন্তু এখানেই মজার ব্যাপার। মানুষ নোভিগ নিয়ে যতটা কথা বলছে, তার চেয়ে বেশি কথা বলছে সিডনির নগ্নতা নিয়ে। একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অনলাইন আলোচনার মাত্র প্রায় ৪ শতাংশে নোভিগের ব্যবসা বা পরিষেবাই সরাসরি আলোচনায় এসেছে। অর্থাৎ বিজ্ঞাপনটি মানুষকে থামিয়েছে, তাকিয়েছে, ক্ষুব্ধ করেছে, হাসিয়েছে, বিতর্ক তৈরি করেছে—সবই করেছে। এখনও প্রমাণ হয়নি যে গ্রাহক বানিয়েছে। নোভিগের হিসাবে তাই প্রথম পর্ব সফল। নাম ছড়িয়েছে। অখ্যাত সংস্থা রাতারাতি আন্তর্জাতিক সংবাদে। সিডনির ক্ষেত্রেও প্রচার বিপুল। কিন্তু বিজ্ঞাপনের শেষ হিসাব অন্য জায়গায়। মানুষ কি নোভিগের নাম মনে রাখবে, নাকি শুধু মনে রাখবে—এক অভিনেত্রী নগ্ন হয়ে স্তন ঢেকেছিলেন ফুটবল দিয়ে? যদি দ্বিতীয়টাই সত্যি হয়, তা হলে নোভিগ প্রচার পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিজ্ঞাপনটি ব্র্যান্ড তৈরি করেনি—শুধু কেলেঙ্কারি তৈরি করেছে। আর মহিলা ক্রীড়াবিদদের অভিযোগও সেখানেই দাঁড়িয়ে: খেলাধুলাকে বিক্রি করতে হলে খেলাটাই কি যথেষ্ট নয়? একজন নগ্ন নারীর শরীর কেন তার সঙ্গে জুড়তেই হবে? এই প্রশ্নের উত্তর সিডনি দিয়েছেন নিজের মতো করে। নোভিগও দিয়েছে নিজের মতো করে।
এখন উত্তর দেওয়ার পালা দর্শক এবং বাজারের।

Scroll to Top