সন্দীপ রায়ের ফেলুদা এবার পাহাড়ে
কিন্তু কোন পাহাড়ে ফেলুদা?

৩৬৫ দিন। সৌগত সরকার। ফেলুদা এবার পাহাড়ে! কিন্তু কোন পাহাড়ে তিনি তোপসে এবং লালমোহন গাঙ্গুলিকে নিয়ে যাবেন,সেটা এখনও রহস্য। সন্দীপ রায়ের আগামী ফেলুদা ছবির রোডম্যাপ তৈরি হতে গিয়েছে। তবে কোন পাহাড়ে কিংবা কোন অভিযানে ফেলুদা যাচ্ছে সেটা এখনো প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে না। সত্যজিৎ রায়  ৬ বার ফেলুদাকে পাহাড়ে নিয়ে গিয়েছিলেন রহস্যের সমাধান করতে। দার্জিলিং এর দুবার। ফেলুদার প্রথম রহস্য ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি এবং পরবর্তীতে পুরো টিম নিয়ে দার্জিলিং জমজমাট। সিকিম নেপাল পাহাড়ে ও সত্যজিৎ দুবার অভিযানে নিয়ে গিয়েছেন ফেলুদা এবং তার টিমকে। একবার গ্যাংটকে গন্ডগোল দ্বিতীয়বার যত কাণ্ড কাঠমান্ডুতে। উত্তর ভারতে পাহাড় ঘোরার পর সত্যজিতের আরেকটি প্রিয় জায়গা কাশ্মীর গিয়েছে ফেলুদা। ৯ দশকে সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ এর পটভূমিতে নিজে ঘুরে এসে লিখেছিলেন ভূস্বর্গ ভয়ঙ্কর। এরপরে ফেলুদা আবার হিমালয়ে যান তবে এবার উত্তর ভারতে। এবার কান্ড কেদারনাথে। সুতরাং কোন গল্পটি সন্দীপ রায় ফেলুদার পাহাড় অভিযান নিয়ে ভাবছেন তা পরিষ্কার নয়। তবে পরিচালনায় দীর্ঘ ফেলুদার ছবির তালিকায়, পাহাড়ে খুব বেশি অভিযান করেনি ফেলুদা। ৯ দশকে কিসসা কাঠমান্ডু কা, এবং কৈলাসে কেলেঙ্কারি তিনি বানিয়েছিলেন। তবে  বাক্স রহস্য ছবির একটা বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাহাড়েই শুটিং হয়েছিল। সিমলার খুর্পিতে । সেই হিসেবে ৯৬ তো ৯৬ থেকে দীর্ঘ ৩০ বছর পাহাড়ে আর ফেলুদা যায়নি। সেদিক থেকে দেখলে ফেলুদা অনুরাগীদের কাছে এটা একটা বড় পাওনা। এদিকে অরিন্দম গাঙ্গুলী ছোট পর্দা বা ওটিটির জন্য গ্যাংটক এ গন্ডগোল বানিয়েছিলেন। অন্যদিকে সুজিত মুখোপাধ্যায় বানিয়েছেন দার্জিলিং এর পটভূমিকায় ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি ও পরবর্তীকালে ভূস্বর্গ ভয়ঙ্কর। সৃজিত মুখোপাধ্যায় কিংবা অরিন্দম শীল অনলাইন প্লাটফর্মের জন্য ফেলুদা বানানোর অনুমতি পেলেও বড় পর্দায় নির্মাণের অনুমতি তাদের ছিল না। ফলে চলচ্চিত্র মহলের মতে, গ্যাংটক এ গন্ডগোল এবং যত কাণ্ড কাঠমান্ডুতে বাদ দিয়ে যেকোনো একটা পাহাড়ের ছবি নির্বাচন করতে পারেন সন্দীপ রায়। যদিও সন্দীপ রায়ের প্রিয় গল্পের মধ্যে গ্যাংটক এ গন্ডগোল এবং যত কান্ড কাঠমান্ডুতে রয়েছে। কিন্তু নেপাল ভূমিকম্প এবং পরবর্তী অর্থাৎ সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক বিপর্যয় সম্পন্ন বিধ্বস্ত। ফলে গল্পের সঙ্গে ত্রিভুবন স্কয়ার সহ একাধিক জায়গার কোন মিল নেই। সেগুলো পড়ে বিনির্মাণ করা হয়েছে। আর এখন শুটিং করার মতো পরিস্থিতি নেই।

ফেলুদা কাহিনী ভূস্বর্গ ভয়ঙ্কর, খবরের কারণে রঙিন করা হয়েছে

নয়ন রহস্য ছবির পরবর্তী ফেলুদার ছবির জন্য একটা বিরতি নিয়েছিলেন পরিচালক। একাধিক পরিকল্পনা এবং পর্যালোচনা চলেছে  লাগাতার। প্রথমে জানা গিয়েছিল,তিনি সত্যজিতের গুরুত্বপুর্ন চারটি ছোটগল্প নিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ ছবির কথা ভাবছেন। কারণ পরপর দুটি ফেলুদা সিনেমার মধ্যে অন্তত ২ বছরের ফারাক থাকা প্রয়োজন বলেই তিনি মনে করেন। ঠিক যেমন তার চার ছবিটি চারটি গল্প নিয়ে হয়েছিল। কিন্তু নয়ন রহস্য মুক্তি পেয়েছিল ২০২৪ সালে। ফলে একটা লম্বা বিরতি এমনিই হয়ে গিয়েছে।  ফলে তিনি সিদ্বান্ত নেন,এবার ফেলুদা করা যেতে পারে। গল্প বাছাই চূড়ান্ত। ফেলুদা পাহাড়েই যাচ্ছেন অভিযানে। তবে এই মুহূর্তে প্রযোজকদের অনুরোধেই গল্পের নাম প্রকাশ্যে আনা সম্ভব হচ্ছে না। কলকাতার দুই নামি প্রযোজক দীর্ঘদিন ফেলুদা করার জন্য মুখিয়ে ছিল। এবার সম্ভবত একটি নতুন অথচ সফল প্রযোজনা সংস্থা এই ছবি প্রযোজনা করতে এগিয়ে এসেছে। রায় বাড়ির সূত্র যেটুকু জানা যাচ্ছে, ইতিমধ্যেই প্রযোজকদের সঙ্গে কথাবার্তা পাকা হয়ে গিয়েছে। পরিচালক এবং তার টিম চলতি বছর শীতের মরশুমে শুটিং শেষ করতে চায়। রাতের সামনের বছর ছবি রিলিজ করা যায়। শীতকে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ ওই সময় পাহাড় অঞ্চলে বরফ পাওয়া যাবে একইসঙ্গে ঝকঝকে রোদ এবং ভালো আবহাওয়া থাকে। ঠিক কবে থেকে শুটিং শুরু হবে তা এখনো ফাইনাল না হলেও, আশা করা যাচ্ছে পুজোর পরেই প্রাথমিক প্রস্তুতি এবং তারপর ডিসেম্বর মাসে শুরু হতে পারে শুটিং।
সত্যজিতের ফেলুদা উপন্যাসে লেখক ফেলুদাকে মোট ছয়বার পাহাড়ে নিয়ে গিয়েছেন রহস্য ভেদ করতে। এর মধ্যে দুবার দার্জিলিং, একবার সিকিম, নেপাল, কাশ্মীর এবং উত্তরাখণ্ডের হিমালয়। এছাড়াও অবশ্য বাক্স রহস্য উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ রহস্য সমাধান ও ক্লাইম্যাক্স ছিল হিমাচলে। শিমলা ও খুর্ফিতে।
ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি (দার্জিলিং)
মূল কাহিনী: ফেলুদা, তোপসে ও তোপসের বাবা দার্জিলিং ঘুরতে যান। সেখানে রাজেনবাবু নামের এক অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবীর কাছে একটি হুমকি চিঠি আসে। রাজেনবাবুর অমূল্য প্রাচীন জিনিসের সংগ্রহের ওপর কারো লোভ ছিল। ফেলুদা তদন্তে নেমে রাজেনবাবুর ছেলে, ডাক্তার ও এক খদ্দেরকে সন্দেহ করে। অবশেষে জানা যায়, ভয় দেখানোর পেছনে কোনো খুনের উদ্দেশ্য ছিল না, বরং রাজেনবাবুরই এক পুরনো বন্ধুর ছেলে ছোটবেলার একটি অপমানের প্রতিশোধ নিতে ভূত সেজে তাকে ভয় দেখিয়েছিল।
গ্যাংকটকে গণ্ডগোল (সিকিম)
মূল কাহিনী: ফেলুদা ও তোপসে গ্যাংটকে ছুটি কাটাতে গিয়ে শশধর বোস নামে এক ব্যবসায়ীর সাথে পরিচিত হয়। সেখানে তিস্তা নদীর ধারে একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় শশধরবাবুর ব্যবসায়ী পার্টনার শিবকুমার প্রধান মারা যান। কিন্তু ফেলুদা বুঝতে পারে এটি দুর্ঘটনা নয়, ঠাণ্ডা মাথার খুন। এই গল্পেই ফেলুদার সাথে প্রথম দেখা হয় বিখ্যাত খলনায়ক ডক্টর বৈদ্যের (প্রকৃতপক্ষে নকল বৈদ্য)। তিব্বতি প্রাচীন মূর্তি পাচারের এক আন্তর্জাতিক চক্রের পর্দা ফাঁস করে ফেলুদা আসল খুনিকে গ্রেফতার করায়।
যত কাণ্ড কাঠমাণ্ডুতে (নেপাল)
মূল কাহিনী: নেপালের কাঠমাণ্ডু শহরে জাল ওষুধের এক বড় চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে, যার কারণে অনেক মানুষের মৃত্যু হচ্ছিল। এই চক্রের পেছনে ছিল ফেলুদার প্রধান শত্রু মগনলাল মেঘরাজ। ফেলুদা, তোপসে ও জটায়ু কাঠমাণ্ডু পৌঁছান ডক্টর সান্যাল নামের এক ব্যক্তির খুনের রহস্যের সমাধান করতে। নেপালের পাহাড়ি পটভূমিতে মগনলালের ভয়ঙ্কর ছক এবং এলএসডি ড্রাগের মরণফাঁদ এড়িয়ে ফেলুদা এই আন্তর্জাতিক অপরাধের রহস্য উন্মোচন করে।
এবার কাণ্ড কেদারনাথে
 (হিমালয়)
মূল কাহিনী: এই গল্পের শুরু কলকাতার ভবানীপুরের এক ধনী বৃদ্ধের উইল চুরি দিয়ে। সেই উইলের খোঁজে ফেলুদা, তোপসে ও জটায়ু রওনা হন হিমালয়ের দুর্গম তীর্থক্ষেত্র কেদারনাথ ও বদ্রীনাথে। পাহাড়ি উপত্যকার খাঁদ, খাড়া রাস্তা এবং বরফাবৃত আবহাওয়ার মধ্যে রহস্য দানা বাঁধে। ট্র্যাভেল এজেন্টের ছদ্মবেশে থাকা এক অপরাধী এবং উইলের আসল উত্তরাধিকারীকে খুঁজে বের করতে ফেলুদাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল
দার্জিলিং জমজমাট (দার্জিলিং)
মূল কাহিনী: জটায়ুর লেখা একটি রহস্য উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে দার্জিলিংয়ে একটি সিনেমা তৈরি হচ্ছিল। সেই শুটিং দেখতেই ফেলুদা বাহিনী আবার দার্জিলিং যায়। কিন্তু শুটিং চলাকালীন মল রোডের কাছে কুয়াশার মধ্যে খুন হন সিনেমার মূল কাহিনীর সাথে জড়িয়ে থাকা বীরেন্দ্র মজুমদার নামের এক ভদ্রলোক। সিনেমার শুটিং-এর আলো-আঁধারি আবহ এবং আসল-নকল চরিত্রের ভিড়ে লুকিয়ে থাকা আসল খুনিকে ফেলুদা তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে বন্দি করে।
ভূস্বর্গ ভয়ংকর
(কাশ্মীর)
মূল কাহিনী: কাশ্মীরের শ্রীনগর, গুলমার্গ ও খিলেনমার্গের বরফঢাকা পাহাড়ের পটভূমিতে এই কাহিনী গড়ে উঠেছে। ডক্টর পণ্ডিত নামে এক ধনী ও খামখেয়ালী বৃদ্ধের রহস্যময় ডায়েরি এবং তার উইলের সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে রহস্যের শুরু। কাশ্মীরে বেড়াতে গিয়ে ফেলুদা জানতে পারে ডক্টর পণ্ডিতের জীবন বিপন্ন। হাউসবোটের রহস্যময় পরিবেশ এবং পাহাড়ি তুষারপাতের মধ্যে এক রোমাঞ্চকর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর ফেলুদা আসল অপরাধীকে মুখোশধারী ছদ্মবেশ থেকে টেনে বের করে।

Scroll to Top