৩৬৫ দিন। তপন বকসি। মুম্বাই। ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যেবেলা জুহু ভিলে পার্লের পুষ্পা পার্কের বাইরে টাইগার শ্রফের গালি লক্ষ্য করে চালানো গুলির ঘটনার সাত দিন পর, আজ রবিবার, ২৫ অক্টোবর, সেদিনের সেই ঘটনার জন্য মুম্বাই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের বিশেষ তদন্তকারী দল টাইগার শ্রফের বাড়িতে যান। সেই সময় টাইগার শ্রফ তদন্তকারীদের কাছে নিজের চরম হতাশা এবং মানসিক শঙ্কার কথা বলেন।
টাইগার শ্রফ পুলিশকে জানিয়েছেন যে তিনি চরম মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছেন। তার সঙ্গে এই ঘটনা কেন ঘটেছে তা পুরোপুরি তিনি এখনো পর্যন্ত বিশ্বাস করে উঠতে পারেননি। মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চের তদন্তকারী দলটির আধিকারিকদের তিনি জানিয়েছেন, “কারও সঙ্গে আমার কোনও শত্রুতা বা বিবাদ নেই। তাই কেন হঠাৎ আমার ওপর এই ধরনের প্রাণঘাতী হামলা চালানো হল, তা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না।” টাইগার আরও জানিয়েছেন, আক্রমণ কারীদের তিনি চেনেন না। কারা এই হামলার পিছনে রয়েছে, বা কি উদ্দেশ্যে এই গুলি চালানো হল, সে বিষয়ে তার কোনও ধারণা নেই।
২৫ অক্টোবর, রবিবার পর্যন্ত টাইগার শ্রফের গুলি চালনার কাণ্ডে পুলিশ মোট ১১ জনকে গ্রেফতার করেছে। অন্যদিকে, ১৮ অক্টোবর টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে চলা গুলি কাণ্ডের তদন্তে মুম্বাই পুলিশ ক্রাইম ব্রাঞ্চের হাতে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তের পর এই ঘটনার মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে গিয়েছে। তদন্তে নেমে মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চ জানতে পেরেছে যে টাইগার শ্রফ এই হামলার আসল বা প্রাথমিক লক্ষ্য ছিলেন না। আসলে শুটাররা বলিউডের অন্য এক বড় তারকাকে লক্ষ্য করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু সেই প্রথম সারির তারকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত কড়া ও নিশ্ছিদ্র থাকায় শুটাররা তাদের পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। সেই বড় তারকার নিরাপত্তা এড়াতে না পেরে শুটাররা তাদের নজর টাইগারের ওপর ঘোরায়। তদন্তের সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, ঘটনার দশ দিন আগে তারা টাইগারের জিম, বাড়ি এবং দৈনিক যাতায়াতের রাস্তার ওপর রেইকি চালিয়েছিল। এই মামলাগ্রেফতার হওয়া এগারো জনের মধ্যে হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশ থেকে গ্রেপ্তার হয়েছে কয়েকজন। রাজস্থানের কোটা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছে কয়েকজন।
এই ঘটনায় পুলিশ অনিল পন্ডিতকে পলাতক ও ওয়ান্টেড বলে ঘোষণা করেছে। মুম্বাই পুলিশের সূত্র থেকে শোনা যাচ্ছে, অনিল পন্ডিত এই মুহূর্তে ভারতের বাইরে আমেরিকা থেকে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের হয়ে পুরো অপারেশনটি পরিচালনা করছে। টাইগার শ্রফ গুলি কান্ডের মূল শুটাররা মুম্বাইয়ের আন্ধেরি পূর্বের “আর. আর. রেসিডেন্সি” নামের একটি বাজেট হোটেল বুক করেছিল। শুটার ফুল সিং এবং রেহান আনসারি এই হোটেলের ২০১ নম্বর রুমে ছিল। হামলার আগে ১৪ অক্টোবর থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিন তারা এই হোটেলে আত্মগোপন করেছিল। প্রতিদিন তারা প্রায় দেড় হাজার টাকা করে ভাড়া দিচ্ছিল। হোটেলের এই রুমেই তাদের পিস্তল পরীক্ষা করার সময় ভুলবশত মিসফায়ারের কান্ড ঘটিয়ে ফেলে এবং গুলিটি বিছানায় গিয়ে লাগে। ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যেবেলায় টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলি চালানোর তিন ঘন্টা আগে এই হোটেলের সিসিটিভি ক্যামেরায় দুই শুটারকে একটা নীল রঙের ব্যাগ নিয়ে বের হতে দেখা যায়। পুলিশের অনুমান, ওই নীল রঙের ব্যাগের ভেতরে অস্ত্র ছিল। মুম্বাইয়ের আন্ধেরি পূর্বের চাকালা অঞ্চলের ওই বাজেট হোটেলের ম্যানেজার এবং কর্মীদের ম্যারাথন জেরা করে পুলিশ বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে। হোটেল কর্মীরা পুলিশকে জানিয়েছে, অভিযুক্তরা নিজেদের হরিয়ানার বাসিন্দা হিসেবে অত্যন্ত সাধারণ, শান্ত, তরুণ হিসেবে জাহির করেছিল। তারা অঙ্কিত ও মনদীপ নাইন নামের আধার কার্ড জমা দিয়ে নগদ টাকায় হোটেলের রুম বুক করেছিল। ফলে হোটেল কর্মীদের মনে কোন সন্দেহ জাগেনি। ১৮ অক্টোবর মূল অপারেশনের জায়গায় যাওয়ার তিন ঘন্টা আগেই হোটেলের ঘরে চেক করতে গিয়ে তারা যে হোটেল রুমের বিছানায় মিস ফায়ার করেছিল, তার আওয়াজ রুমের বাইরে সেভাবে আসেনি। তার কারণ, তারা হোটেলের ঘরে টিভি ও এসির আওয়াজ অত্যন্ত জোরে বাড়িয়ে রেখেছিল। যার ফলে বাইরের কর্মীরা বা অন্য ঘরের বোর্ডাররা এই গুলির আওয়াজ টের পায়নি। তবে হোটেলের কর্মীরা লক্ষ্য করেছিলেন যে, হোটেলের ভেতরে তারা বেশি সময় কাটালেও মাঝে মাঝে বাইরে এসে হৃতিক রোশন ওরফে কুমার (২২) নামের এক বাইক চালকের সঙ্গে চুপিচুপি কথা বলত। এই কুমার বা হৃতিক পালসার মোটরসাইকেল করে তাদের রেইকি করা এবং হামলার পর পালাতে সাহায্য করেছিল।
তদন্তে জানা গেছে যে, ১৮ অক্টোবর জুহুতে সন্ধেবেলায় ওই গুলি চালানোর পর পরই শুটাররা মোটরবাইকে করে পালানোর সময় তাদের হ্যান্ডেলারদের মেসেজ করে জানায় “অপারেশন কমপ্লিট”। ঠিক এর পরেই আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে বসে থাকা অনিল পন্ডিত এবং তার সহযোগীরা ভারতীয় টেলিভিশন নিউজ চ্যানেল গুলোর ওপর নজর রাখতে শুরু করে। সংবাদমাধ্যমে যখন শুটারদের সিসিটিভি ফুটেজ এবং মুখ দেখানো শুরু হয়, তখন হ্যান্ডেলাররা ইন্টারনেট কলের মাধ্যমে শুটারদের সতর্ক করে বলে, তোমাদের মুখ টিভিতে লাইভ দেখানো হচ্ছে। পুলিশ পিছু নিয়েছে। দ্রুত পালানোর রুট বদলাও। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে শুটাররা অত্যন্ত চালাকির সঙ্গে সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলছিল। তারা অনিল পন্ডিতের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য শুধুমাত্র হোয়াটসঅ্যাপ এবং সিগন্যাল এর মতো এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে ইন্টারনেট কল ও চ্যাটিং ব্যবহার করছিল। এর ফলে দিকে তাদের টাওয়ার লোকেশন বা কল রেকর্ড ট্র্যাক করতে পারছিল না। হ্যান্ডেলারদের থেকে পাওয়া লাইভ আপডেট ভিত্তিতেই শুটাররা পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে বারবার যাতায়াতের মাধ্যম বদলাচ্ছিল। প্রথমে মোটর বাইক, তারপর লোকাল ট্রেন, তারপর ক্যাব এবং সবশেষে সুরাট থেকে বাস ধরার পরিকল্পনা করেছিল। এই মুহূর্তে মুম্বাই পুলিশ অনিল পণ্ডিতের হুমকি দেওয়া ফাইনাল অডিও ক্লিপগুলোর ফরেনসিক ভয়েস অ্যানালিসিস করাচ্ছে, যাতে আদালতে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা ১০০ ভাগ প্রমাণ করা যায়।





