তৃণমূল ছেড়ে এনসিপিআইতে যোগ দেওয়া ২০ সাংসদকে নোটিশ সুপ্রিম কোর্টের

৩৬৫ দিন। নয়াদিল্লি। দলত্যাগ বিরোধী আইন মেনে লোকসভার অধ্যক্ষ যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত সংসদদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন তাহলে বিচার ব্যবস্থাকেই পদক্ষেপ করতে হয়। এমন পর্যবেক্ষণ জানিয়ে তৃণমূল ছেড়ে রাতারাতি এনসিপিআই-তে যোগ দিয়ে বিজেপির শরিকদল হয়ে যাওয়া ২০ সাংসদের বিরুদ্ধে নোটিশ ইস্যু করলো দেশের সর্বোচ্চ আদালত। তবে শুধুমাত্র তৃণমূল ছেড়ে যাওয়া ২০ সাংসদের বিরুদ্ধে নয়, কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপিকে যথেষ্ট অসস্তিতে ফেলে সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত প্রথমে নির্দেশ দিয়েছিলেন লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লা ও লোকসভার সেক্রেটারি জেনারেলের বিরুদ্ধেও নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগের নোটিশ ইস্যু করার জন্য। যদিও দেশের সলিসিটার জেনারেল তুষার মেহতার আবেদনে সাড়া দিয়ে লোকসভার স্পিকার এবং সেক্রেটারি জেনারেলের বিরুদ্ধে নোটিশ ইস্যু করা থেকে বিরত থাকে সুপ্রিম কোর্ট।
তবে সুপ্রিমকোর্ট আজ যেভাবে লোকসভার অধ্যক্ষের সংবিধানিক পদে থাকা সত্ত্বেও নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে হস্তক্ষেপ করেছে তারপরেই কার্যত বাধ্য হয়ে বিকেলের মধ্যেই ২০ এনসিপিআই সাংসদকে চিঠি পাঠিয়ে ৭ দিনের মধ্যে জবাবদিহি তলব করলেন লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লা। স্পিকারের দফতর থেকে সব সাংসদদের দিল্লির ঠিকানায়, সাংসদদের সরকারি ইমেইল আইডি এবং সাংসদ পোর্টালে নোটিস পাঠানো হল।
মামলার প্রেক্ষিত
এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার কয়েকদিনের মধ্যেই রাতারাতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে প্রথমে পৃথক ব্লক তৈরি করে এবং তারপরে হাওড়ার একটি এঁদো গলির তস্য অনামী এনসিপিআই নামের একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রের শাসক জোট এনডিএ-তে যোগ দেন ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের তৃণমূলের টিকিটে বিজয়ী ২০ জন তৃণমূল সাংসদ। যার মধ্যে ছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার থেকে শুরু করে শতাব্দী রায়, সায়নী ঘোষ, ইউসুফ পাঠান, দেব। যে দলের বিরুদ্ধে অর্থাৎ বিজেপির বিরুদ্ধে তৃণমূলের টিকিটে লড়াই করে সংশোধনের বাচিত হয়ে আবার বিজেপিকে সমর্থন জানানো যে দলত্যাগ বিরোধী আইন এবং সংবিধানের দশম তফশীল বিরোধী তা উল্লেখ করে একাধিকবার লোকসভার অধ্যক্ষের কাছে সশরীরে গিয়ে লিখিতভাবে অভিযোগ জানিয়ে এসেছেন তৃণমূলের সংসদীয় দলনেতা তথা দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের দলীয় বৈঠকে তৃণমূলের টিকিটে বিজয়ী এই সাংসদরা একাধিকবার যোগদান করলেও তাঁদেরকে দলত্যাগ বিরোধী আইনে অভিযুক্ত হিসেবে এখনো পর্যন্ত শুনানির জন্য নোটিশ পাঠাননি লোকসভার অধ্যক্ষ। লোকসভার অধ্যক্ষের মতো একটি সংবিধানিক পদাধিকারী এমন নিষ্ক্রিয়তা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে অভিযোগ করে বাধ্য হয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ সেই মামলার শুনানি হয় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি মোহনার বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চে।
কি জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট
আজ প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে এই মামলার শুনানির সময় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার পক্ষে সওয়াল করেন দেশের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তিনি সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন করেন, সাংবিধানিক পদাধিকারী হওয়ার কারণে স্পিকারের উদ্দেশ্যে যেন কোনো নোটিস জারি করা না হয়। সলিসিটর জেনারেলের এই আবেদন মঞ্জুর করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্পিকার বা সেক্রেটারি জেনারেলের ওপর কোনো নোটিস দেননি। তবে তুষার মেহতা সুপ্রিম কোর্টে জানান, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া সাংসদ পদ খারিজের আবেদন ইতিমধ্যেই গ্রহণ করে প্রক্রিয়া শুরু করেছেন স্পিকার। ওই ২০ সাংসদের বক্তব্য জানতে চেয়ে তাঁদের নিজস্ব নোটিস পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। শুনানি চলাকালীন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আর্জি জানানো হয়েছে, তবে তাঁদের বক্তব্য না শুনে এক তরফা কোনো পদক্ষেপ করা যায় না। তৃণমূলের পক্ষে এই মামলায় সওয়াল করেন আইনজীবী তথা সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চের এই পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি এটিকে আইনি লড়াইয়ের প্রাথমিক জয় বলে উল্লেখ করেছেন।
খারিজ হতে পারে ২০ জনের সাংসদ পদ
মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শিবসেনা প্রধান উদ্ধব ঠাকরের আবেদনের প্রেক্ষিতে ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ নিজেদের চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন যে বিধানসভার স্পিকারের নিষ্ক্রিয়তার জন্যই তাদের বিধায়ক পদ খারিজ করা যায়নি, তা যদি সুপ্রিম কোর্টের রায়ের নথিতে প্রতিফলিত হয় তাহলে মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে ও তাঁর অনুগামীদের বিধায়ক পদ খারিজ হওয়ার পাশাপাশি মহারাষ্ট্রের সরকার পতন হওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যাচ্ছে। আর যদি একনাথ শিন্ডে এবং তাঁর অনুগামীদের বিধায়ক পদ খারিজ হয় দলত্যাগ বিরোধী আইনে, তাহলে বাংলাতেও কাকলি শতাব্দী দেবের সাংসদ পদ খারিজের পাশাপাশি ঋতব্রত বন্দোপাধ্যায় এবং তাঁর অনুগামীদের বিধায়ক পদ খারিজের পথ প্রশস্ত হয়ে যাবে।
পার্লামেন্ট দিয়ে শুরু করলাম, এবার বিধানসভায়
সুপ্রিম কোর্টের তীব্র ভর্ৎসনার পরে তৃণমূলের আইনজীবী তথা সভার সংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট আজ ডিসকোয়ালিফিকেশন পিটিশন নিয়ে নোটিস ইস্যু করেছে। ২০ জন সাংসদের বিরুদ্ধে নোটিস ইস্যু হয়েছে। এই তো সবে খেলা শুরু। বলতে হয়নি কিছুই। আইন আমাদের পক্ষে এতটাই, ২০ জন সাংসদ মিলে এতটাই বেআইনি কাজ করেছে, এখন স্পিকার ফেলে রেখে দিয়েছেন, এটা যে কত বড় অসাংবিধানিক কাজ, তা সবার কাছে স্পষ্ট। দেখো না ২০ জনের কী হয়। পার্লামেন্ট দিয়ে শুরু করলাম, এরপর বিধানসভায় আসব। চিন্তা করো না, সব ঘুম ভাঙিয়ে দেব।

Scroll to Top