৩৬৫ দিন। শিলিগুড়ি। বাংলা অখন্ড থাকবে, বাংলাকে অখন্ড রেখেই গোর্খাদের প্রত্যাশা পূরণের দৃঢ় অবস্থান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। প্রথম দার্জিলিং জেলার সমতলে উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত পাহাড় ইস্যু নিয়ে বৈঠকের শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন বাংলা ভাগ বাদে আপনারা যা চাইবেন, পশ্চিমবঙ্গের জনগণের স্বার্থে আমরা মেনে নিতে রাজি আছি।বাংলা ভাগ হবে না। যদিও মুখ্যমন্ত্রী এই বিষয়ে কোথাও কোনো মন্তব্য ও একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। পুরো বিষয়টিকে আভ্যন্তরীণ রাখা হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নিয়ম বিধি অনুযায়ী।নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার শর্ত বজিয়ে রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্ৰী ও মুখ্যমন্ত্রী দুজনেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে শিলিগুড়ি সুকনার পাঁচতারা টি রিসর্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে উত্তরবঙ্গের মাটিতে প্ৰথম পাহাড় ইস্যুতে উল্লেখযোগ্য ত্রিপাক্ষিক বৈঠক।বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির শরীক শিবিরের থাকা আঞ্চলিক দল জিএনএলএফ,গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা সহ বামপন্থী সংগঠন সিপিআরএম-এর প্রতিনিধিরা। যদিও বৈঠকে দেখা মেলেনি বিজিপিএমের। আর ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের পরই পাহাড়ের গোর্খাল্যান্ডের প্রশ্নে নতুন করে চাপানোতর তৈরি হয়েছে। বিরোধীতা নেমেছে বিজিপিএম।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্ৰীর নির্দেশে পাহাড়ের দীর্ঘ অমীমাংসিত রাজনৈতিক স্থায়ী সমস্যা সমাধানে মধ্যস্থতাকারী অবসরপ্রাপ্ত আই পি এস আধিকারিককে মাথায় রেখে একটি ড্রাফট কমিটি গঠন করা হয়। পাহাড়ের বিজেপির প্রতিটি শরিক দলের একজন করে প্রতিনিধিরা থাকবে এই কমিটিতে। কমিটি গঠনের ফাইল স্বাক্ষর হয়েছে। এই ড্রাফটিং কমিটি পাহাড় সমস্যা সমাধানের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা লিপিবদ্ধ করে ও তার রূপরেখা তৈরি করে সরকারকে পেশ করবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সামাজিক মাধ্যমে নিজ বক্তব্যে পেশ করে জানান-“গোর্খা সমস্যার স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে ভারতের সংবিধানের কাঠামোর অধীনে একটি সুসংহত রূপরেখা প্রস্তুত করতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক প্রাক্তন উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা তথা ইন্টারলোকিউটর শ্রী পঙ্কজ কুমার সিংয়ের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে।এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা গোর্খা সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল প্রতীক্ষিত অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।”
দার্জিলিঙ সাংসদ রাজু বিস্ট জানান- ভারতের সংবিধানের পরিকাঠামোর মধ্যে থেকে গোর্খাদের প্রত্যাশা পূরণ হবে। এই স্থায়ী সমাধান গোর্খা জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষাকে পূরণ করবে।আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এই কমিটি তাদের খসড়া রূপরেখা প্রস্তুত করে তা পেশ করতে চলেছে। ন্যায়সঙ্গত সমাধান আমাদের অঞ্চলের মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে এবং আমাদের গোর্খা আইডেন্টিটি সংকটকে দূর করতে সক্ষম হবে।পাহাড়ের যুব প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করবে, যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে।আমি এলাকার জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, আমি সর্বদা গোর্খা জাতি এবং দার্জিলিং পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্স অঞ্চলের মানুষের স্বার্থকে সামনে রেখে কাজ করেছি। সংবিধানের অধীনে সর্বোত্তম সমাধানটি যাতে আমরা একসাথে অর্জন করতে পারি, তা নিশ্চিত করব। গোর্খা জাতিদের আশ্বস্ত করে বলেন আস্থা রাখুন, আমি কখনোই গোর্খা জাতির মাথা নত হতে দেব না।
রাজ্য সভার সাংসদ হর্ষবর্ধন শ্ৰীঙলা জানান-
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে খুব ভালো আলোচনা হয়েছে।ভালো মিটিং হয়েছে। ভালো ফলাফল হবে। সমাধান নিশ্চিত ভাবে হবে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার রোশন গিরি বলেন-বৈঠকে ফলপ্রসু হয়েছে
জিএনএলএফ এর কেন্দ্রীয় প্রবক্তা ওয়াই লামা বলেন-আমাদের অবস্থানতো পরিষ্কার- আমরা আলাদা রাজ্য গোর্খাল্যান্ডের দাবিই এতদিন জানিয়ে এসেছি। আর বঙ্গভঙ্গের যে প্রশ্ন, সেটা নিয়ে তো প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু স্বয়ং বিধানসভায় হোয়াইট পেপার জারি করে আগেই বলেছিলেন যে এটা বাংলার জমি বা অংশই নয়। ফলে গোর্খাল্যান্ড হলে বঙ্গভঙ্গ হওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না!আজকের পরিস্থিতিতে যদি গোর্খাল্যান্ড সম্ভব নাও হয়, তবে ভারত সরকারকেই ঠিক করতে হবে যে গোর্খাদের সুরক্ষায় কী স্থায়ী সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেবে তারা। যে ব্যবস্থা হবে তা যেন ভারতীয় সংবিধান মেনে হয়, যেখানে নিজস্ব আইনসভা(লেজিসলেচার) থাকবে এবং জমির অধিকার নিশ্চিত করা হবে। এটাই আমাদের মূল বক্তব্য।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও নির্দেশ দিয়েছেন যাতে ড্রাফটিংয়ের কাজ দ্রুত শেষ করা হয়।অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো নির্বাচনের আগেই বলেছিলেন যে নির্বাচনের পর জিটিএ বাতিল করা হবে। আমরাও চাই অবিলম্বে জিটিএ পুরোপুরি খারিজ করে দেওয়া হোক। এই নিয়ে আর কোনও আলোচনা নয় বরং পাহাড়ে এবার স্থায়ী সমাধান দরকার।
সিপিআরএম এর জেবি রাই জানিয়েছেন-চিফ মিনিস্টার অমিত শাহজিকে স্বাগত জানানোর পর মুখ্যমন্ত্রী আমাদের সমস্যা নিয়ে বৈঠকের শুরুতেই বলেন বাংলা ভাগ বাদে আপনারা যা চাইবেন,জনগণের স্বার্থে আমরা মেনে নিতে রাজি আছি। বঙ্গভঙ্গ হবে না তা স্পষ্ট করে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন বাকি সব দাবি পূরণ করতে রাজ্য তৈরি। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান- সিপিআরএম -এর দাবি প্রথমত, স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান দেশের সাংবিধানিক পরিকাঠামোর ভেতরে হতে হবে। যাতে তা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং কোনো সরকারেরই রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও ইচ্ছার ওপর বাতিল করা সম্ভব না হয়। দ্বিতীয়ত, ১১টি জনজাতিকে তফশিলি উপজাতির মর্যাদা প্ৰদানের প্রতিশ্রুতি ছিল তা এই সমাধান পিপিএস-র ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাঁর কথায়-ডিজিএইচসি চুক্তি বা জিটিএ -তে জমির অধিকার সুরক্ষিত ছিল না। এখানে ষষ্ঠ তফসিলের ধাঁচে সাংবিধানিক রক্ষাকবচ ও আইনি ক্ষমতা নিশ্চিত করা হচ্ছে।ডুয়ার্স-তরাইয়ের গোর্খা অধ্যুষিত এলাকা অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাবে আছে। আবার উত্তর পূর্ব ভারতের সিকিমের সমতুল্য উন্নয়ন খাতে বিশেষ আর্থিক প্যাকেজেও পিপিএস-এ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গোর্খাল্যান্ড নিয়ে অনড় বিজিপিএম প্রতিষ্ঠাতা অনিত থাপা,অনিতের বক্তব্য-
পাহাড়ের বিজেপি গোর্খাল্যান্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়েই ভোট চেয়েছিল। এখন বাংলার মুখ্যমন্ত্রীকে পাহাড়ের মানুষের আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি কীভাবে বোঝাবেন, সেটা ওদের(বিজেপির মুখ্য তিন শরীর শিবির) দায়িত্ব। এখন ওদের উচিত বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর সাথে পাহাড়ে বৈঠকে বসে খোলাখুলি কথা বলা।ভোটের সময় এক কথা বলে আর ভোটের পরে অন্য রূপ দেখানো এতো পাহাড়ের মানুষের আবেগে আঘাত। পাহাড়ের যে মূল সমস্যা বা দাবি তা এড়িয়ে না গিয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে মুখোমুখি বসে পরিষ্কার আলোচনা করা দরকার।আমরা গোর্খাল্যান্ডের পক্ষে আছি।





