মীনা কান্দাসামীর নতুন উপন্যাস ‘ফিল্ডওয়ার্ক অ্যাজ আ সেক্স অবজেক্ট’

৩৬৫ দিন। মণিমালিকা সেন। মীনা কান্দাসামীর নতুন উপন্যাসটি এমন এক জায়গায় আঘাত করে, যেখানে প্রযুক্তি, যৌনতা, রাজনীতি এবং নারীর সামাজিক অবস্থান একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র অমৃতা চতুর্বেদী—লন্ডনে থাকা এক ভারতীয় ছাত্রী ও রাজনৈতিক কর্মী, যে ‘অ্যামি’ নামে পরিচিত। তার জীবন হঠাৎ তছনছ হয়ে যায় একটি ভুয়ো যৌনচিত্র ছড়িয়ে পড়ায়। ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি; কিন্তু ইন্টারনেটে তার সত্য-মিথ্যার পার্থক্য মুছে যায়। শুরু হয় অপমান, বিদ্বেষ, যৌন হয়রানি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।
এখানেই উপন্যাসের মূল প্রশ্ন—কোনও নারীর শরীরের ছবি কি তার বিরুদ্ধে সামাজিক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে? কান্দাসামী দেখিয়েছেন, পারে। আরও ভয়ঙ্কর হল, ছবিটি সত্যি না মিথ্যা—তা জানার আগ্রহও অনেকের নেই। নারীর যৌনতা নিয়ে সামাজিক কৌতূহল, পুরুষতান্ত্রিক নৈতিকতা এবং রাজনৈতিক বিদ্বেষ একসঙ্গে মিলে তাকে ‘বিচার’ করতে বসে যায়।
বইটি তাই নিছক যৌন হয়রানির কাহিনি নয়। এর ভিতরে রয়েছে ইন্টারনেটের অন্ধকার জগৎ, নারী-বিদ্বেষী পুরুষগোষ্ঠী, রাজনৈতিক উগ্রতা, জাতপাত, জাতীয়তাবাদ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার। লেখক দেখিয়েছেন, পর্দার আড়ালে বসে করা ঘৃণা কীভাবে বাস্তব জীবনের হুমকিতে পরিণত হতে পারে।
বিতর্কিত কি? নিশ্চয়ই।
বরং ইচ্ছাকৃতভাবেই বিতর্ক উসকে দেয় বইটি। ভাষা তীক্ষ্ণ, ব্যঙ্গ নির্মম, রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট। লেখক ইন্টারনেটের নারী-বিদ্বেষী সংস্কৃতি এবং হিন্দুত্ববাদী উগ্রতার সমালোচনা করেছেন। ফলে বইটি কেবল সাহিত্যিক বিতর্ক নয়, রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি করতে পারে। তবে কান্দাসামীর সাফল্য হল—তিনি বিতর্কের জন্য বিতর্ক করেননি; ব্যক্তিগত অপমানের অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে জুড়েছেন।

                 সেই বিতর্কিত প্রছদ্দ

নারী-লেখক পুরস্কারের সঙ্গে সম্পর্ক কোথায়?
এখানে একটি ভুল ধারণা এড়ানো দরকার। এই বইটি এখনও নারী-লেখক পুরস্কারের নির্বাচিত তালিকায় আছে—এমন তথ্য নেই। কান্দাসামীর আগের উপন্যাস ‘হোয়েন আই হিট ইউ’ সেই পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল। নতুন বইটির প্রচারে সেই পরিচয়ই সামনে এসেছে।
ভারতীয় ইংরেজি লেখার থেকে আলাদা কেন?
কান্দাসামীর সবচেয়ে বড় স্বাতন্ত্র্য তাঁর ভাষার আক্রমণাত্মক গতি। প্রচলিত ভারতীয় ইংরেজি উপন্যাস যেখানে অনেক সময় পরিবার, স্মৃতি, সম্পর্ক বা সামাজিক বাস্তবতার ধীর বর্ণনায় এগোয়, এখানে লেখক ইন্টারনেটের দ্রুতগতির ভাষা, ব্যঙ্গ, রাজনৈতিক তর্ক এবং ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তিকে একই বয়ানে এনেছেন।আরও গুরুত্বপূর্ণ, নায়িকাকে নিখুঁত ‘ভুক্তভোগী’ বানাননি লেখক। অ্যামি নিজেও সুবিধাভোগী, আত্মবিরোধী, কখনও অহংকারী। ফলে তার ওপর আক্রমণের প্রতিবাদ করলেও লেখক তাকে দেবীর আসনে বসাননি। এই দ্বন্দ্বই চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করেছে। মীনা নিজেও বলেছেন, উপন্যাসে তিনি এমন এক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে চেয়েছেন—যাকে পছন্দ করি না, তার প্রতিও কি সংহতি দেখাতে পারি?
‘ফিল্ডওয়ার্ক অ্যাজ আ সেক্স অবজেক্ট’ তাই যৌনতার উপন্যাসের চেয়ে বেশি—এটি নজরদারি, অপমান এবং ক্ষমতার উপন্যাস। এখানে নারীর শরীর আসলে যুদ্ধক্ষেত্র; আর ইন্টারনেট সেই যুদ্ধক্ষেত্রের সবচেয়ে দ্রুতগামী অস্ত্র।

 

Scroll to Top