জুকেরবার্গের নয়া চমক
আয়ারল্যান্ডে ৩৫০ কোটি টাকা দিয়ে কিনলেন মধ্যযুগের দুর্গ

৩৬৫ দিন। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গ এবার প্রযুক্তির জগৎ থেকে অনেক দূরে গিয়ে আশ্রয় নিলেন আয়ারল্যান্ডের কয়েকশো বছরের পুরনো ইতিহাসের মধ্যে। স্ত্রী প্রিসিলা চ্যানকে নিয়ে তিনি কিনেছেন আয়ারল্যান্ডের কাউন্টি ওয়াটারফোর্ডের বিখ্যাত স্ট্রানকালি দুর্গবাড়ি। নদী ব্ল্যাকওয়াটারের তীরে প্রায় ৪৪০ একর জমির উপর দাঁড়িয়ে থাকা এই বিশাল প্রাসাদ ও তার সম্পত্তি এখন বিশ্বের অন্যতম ধনী প্রযুক্তি উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যের অংশ।চুক্তির প্রকৃত মূল্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে আয়ারল্যান্ডের সংবাদমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী সম্পত্তিটির মূল্য ২০ থেকে ৩০ মিলিয়ন ইউরো। কেনাবেচাটি হয়েছে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে, প্রকাশ্য বাজারে বিজ্ঞাপন দিয়ে নয়।তবে এই গল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। জুকারবার্গ যে প্রাসাদ কিনেছেন, সেটি মধ্যযুগের দুর্গ নয়। বর্তমান স্ট্রানকালি প্রাসাদ তৈরি হয়েছিল প্রায় ১৮২৭-১৮৩০ সালের মধ্যে। কিন্তু তার কাছেই রয়েছে আরও প্রাচীন স্ট্রানকালি দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, যার ইতিহাস পৌঁছে যায় মধ্যযুগে। ফলে একই সম্পত্তিতে যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুই যুগ—একদিকে মধ্যযুগের দুর্গ, অন্যদিকে উনিশ শতকের গথিক রিভাইভাল প্রাসাদ।
শুরুটা মধ্যযুগে
স্ট্রানকালির পুরনো দুর্গ ছিল ডেসমন্ড পরিবারের অন্যতম ঘাঁটি। ত্রয়োদশ, চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকে ডেসমন্ড পরিবার আয়ারল্যান্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছিল। নদী ব্ল্যাকওয়াটারের উপর অবস্থানের কারণে স্ট্রানকালি ছিল কৌশলগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীপথের চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আশপাশের ভূখণ্ডের উপর নজর রাখার ক্ষেত্রেও দুর্গটির গুরুত্ব ছিল।এই পুরনো দুর্গকে ঘিরে রয়েছে আয়ারল্যান্ডের অন্যতম অন্ধকার কিংবদন্তি। বলা হয়, দুর্গের মালিকরা অতিথিদের ভোজে আমন্ত্রণ জানিয়ে গোপন একটি গর্ত দিয়ে তাঁদের নীচের গুহা বা নদীর দিকে ফেলে দিতেন। এই কাহিনির সঙ্গে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, হত্যা এবং ক্ষমতার লড়াইয়ের গল্প জড়িয়ে আছে।তবে ইতিহাসবিদদের কাছে এটি নিশ্চিত ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। কাহিনিটির সত্যতা নিয়ে বহুদিন ধরেই সংশয় রয়েছে। ফলে ‘খুনের গর্ত’-এর গল্পটিকে ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত তথ্যের চেয়ে স্থানীয় কিংবদন্তি হিসেবেই দেখা নিরাপদ। পুরনো দুর্গের যা অবশিষ্ট আছে, তার মধ্যে রয়েছে টাওয়ার, হল এবং প্রতিরক্ষাবেষ্টনীর অংশ। আজও ধ্বংসাবশেষটি নতুন প্রাসাদের ইতিহাসকে কয়েক শতাব্দী পিছনে নিয়ে যায়।
যে প্রাসাদ কিনলেন জুকারবার্গ
বর্তমান স্ট্রানকালি দুর্গবাড়ির নির্মাণ শুরু হয় উনিশ শতকের গোড়ায়। এটি তৈরি করান জন কিলি, যিনি ক্লনমেলের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং ওয়াটারফোর্ডের উচ্চ শেরিফ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।প্রাসাদের নকশা করেন স্থপতি জেমস ও জর্জ রিচার্ড পেইন। তাঁদের স্থাপত্যে তখনকার জনপ্রিয় গথিক রিভাইভাল ধারার প্রভাব ছিল প্রবল। মধ্যযুগীয় দুর্গের মতো চূড়া, পাথরের দেয়াল, টাওয়ার এবং দুর্গসদৃশ কাঠামো ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছিল নতুন প্রাসাদটি।প্রাসাদটির আয়তন প্রায় ১৬ হাজার বর্গফুট। তিনতলা এই বাড়িতে রয়েছে একাধিক শয়নকক্ষ, গ্রন্থাগার, বসার ঘর, খাবার ঘর এবং চারটি টাওয়ারের মধ্যে সাজানো বিশেষ কক্ষ। নদী ব্ল্যাকওয়াটারের দিকে তাকালে যে দৃশ্য দেখা যায়, সেটিও এই সম্পত্তির অন্যতম আকর্ষণ।প্রাসাদের চারপাশে রয়েছে বিস্তীর্ণ বনভূমি, উদ্যান, পুরনো রাস্তা, জলপথ এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপত্যের চিহ্ন। একসময় পুরো এস্টেটের আয়তন ছিল প্রায় ৫ হাজার একর। পরে জমি ধাপে ধাপে ভাগ হয়ে বিক্রি হয়।
দাম কত?
এই প্রশ্নের সোজা উত্তর এখনও নেই।জুকারবার্গ ঠিক কত টাকা দিয়েছেন, তা প্রকাশ করা হয়নি। সম্পত্তির সরকারি নথিতেও এই কেনাবেচার নির্দিষ্ট মূল্য প্রকাশিত হয়নি। তবে আয়ারল্যান্ডের সংবাদমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী দাম ২০ থেকে ৩০ মিলিয়ন ইউরো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।এটি ছিল প্রকাশ্য বাজারের বাইরে সরাসরি চুক্তি। অর্থাৎ সাধারণ ক্রেতার মতো বিজ্ঞাপন দেখে বাড়ি পছন্দ, দরপত্র এবং প্রকাশ্য দর-কষাকষি—কোনওটাই হয়নি।প্রাসাদের আগের মালিক ছিলেন অর্থবিশ্বের সঙ্গে যুক্ত মাইকেল অ্যালেন-বাকলি ও তাঁর স্ত্রী জিয়ানকার্লা। প্রায় ২৫ বছর তাঁরা এই বাড়িতে ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে এর পুনরুদ্ধারের কাজ চালিয়েছেন।তাঁদের হাতেই বহু বছরের অবহেলার পর বাড়িটি নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। ফলে জুকারবার্গের কেনা সম্পত্তিটি কোনও ভগ্নপ্রায় দুর্গ নয়; বরং দীর্ঘ পুনরুদ্ধারের পর সংরক্ষিত একটি ঐতিহাসিক প্রাসাদ।দর-কষাকষিতে জুকারবার্গ কতটা দাম কমিয়েছেন বা বাড়িয়েছেন, সে সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনও তথ্য প্রকাশ্যে নেই। তাই নির্দিষ্ট কোনও অঙ্ককে ‘চূড়ান্ত কেনার দাম’ বলা এখনই ঠিক হবে না।
জুকারবার্গ কি ইতিহাসপ্রেমী?
এখানেই প্রশ্নটি সবচেয়ে আকর্ষণীয়।মার্ক জুকারবার্গের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা রয়েছে—এমন কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি। তাই শুধুমাত্র এই দুর্গবাড়ি কেনার ভিত্তিতে তাঁকে ইতিহাসপ্রেমী বলা বাড়াবাড়ি হবে। আবার এটিকে শুধুই ধনীদের বিলাসী শখ বলাও পুরোপুরি ঠিক নয়।কারণ আয়ারল্যান্ডে জুকারবার্গের ব্যবসায়িক উপস্থিতি রয়েছে। মেটার আন্তর্জাতিক সদর দফতর আয়ারল্যান্ডেই। ফলে ব্যবসার প্রয়োজনে তাঁকে নিয়মিত এই দেশে আসতে হয়। নতুন প্রাসাদটি সেই সফরের সময় তাঁর এবং পরিবারের থাকার জায়গা হিসেবেও ব্যবহৃত হবে।অর্থাৎ এখানে বিলাসিতা যেমন আছে, তেমনই আছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, প্রকৃতি, ঐতিহাসিক পরিবেশ এবং ব্যবসায়িক সুবিধা।একজন সাধারণ ধনকুবের হয়তো সমুদ্রের ধারে আধুনিক প্রাসাদ কিনতেন। জুকারবার্গ বেছে নিয়েছেন নদীর ধারে প্রায় দুইশো বছরের পুরনো দুর্গবাড়ি—যার পাশেই আবার রয়েছে কয়েকশো বছরের পুরনো দুর্গের ধ্বংসাবশেষ।পছন্দটি নিঃসন্দেহে আলাদা।
আয়ারল্যান্ডে দুর্গের সংখ্যা কত?
আয়ারল্যান্ডে দুর্গের সংখ্যা নিয়ে একক কোনও সরকারি সংখ্যা নেই। কারণ ‘দুর্গ’ বলতে শুধু বিশাল পাথরের প্রাসাদ বোঝানো হয় না। ছোট প্রতিরক্ষা টাওয়ার, মধ্যযুগীয় টাওয়ারবাড়ি, ধ্বংসাবশেষ এবং দুর্গসদৃশ ঐতিহাসিক বাড়িও অনেক সময় এই হিসাবের মধ্যে পড়ে।বিস্তৃত হিসাবে আয়ারল্যান্ডে ৩০ হাজারের কাছাকাছি দুর্গ, দুর্গের ধ্বংসাবশেষ ও দুর্গসদৃশ ঐতিহাসিক স্থাপনার কথা বলা হয়। আবার শুধু টিকে থাকা মধ্যযুগীয় টাওয়ারবাড়ি ধরলে সংখ্যা অনেক কম। তাই ৩০ হাজার সংখ্যাটিকে ‘সব দাঁড়িয়ে থাকা দুর্গ’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।তবে সংখ্যার দিক থেকে আয়ারল্যান্ড নিঃসন্দেহে ইউরোপের অন্যতম দুর্গসমৃদ্ধ দেশ।বিখ্যাত দুর্গের তালিকায় রয়েছে ব্লার্নি দুর্গ, বানর‌্যাট্টি দুর্গ, কিলকেনি দুর্গ, ক্যাহির দুর্গ, ট্রিম দুর্গ, ডাবলিন দুর্গ, ডানলুস দুর্গ এবং রক অব ক্যাশেল। রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত দুর্গগুলির পাশাপাশি বহু দুর্গ ব্যক্তিগত মালিকানাতেও রয়েছে।
কে দেখাশোনা করে?
আয়ারল্যান্ডে ঐতিহাসিক সম্পত্তি সংরক্ষণ একটি বড় রাষ্ট্রীয় ও পর্যটন ব্যবস্থা। সরকারি গণপূর্ত দফতর দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনার সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে।বর্তমানে এই দফতর প্রায় ৭৮০টি ঐতিহ্যস্থল দেখাশোনা করে। ২০২৫ সালে তাদের অধীন ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলিতে প্রায় ১ কোটি ৩৪ লক্ষ দর্শনার্থী গিয়েছেন।তবে ব্যক্তিগত দুর্গের দায়িত্ব মালিকের। সেখানে সংরক্ষণ, ছাদ ও পাথরের কাঠামো মেরামত, বাগান রক্ষণাবেক্ষণ এবং ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখার দায়িত্ব মূলত মালিকের উপরই থাকে।স্ট্রানকালির ক্ষেত্রে আগের মালিকেরা প্রায় ২৫ বছর ধরে এই কাজ করেছেন। এখন সেই দায়িত্ব চলে গেল জুকারবার্গের হাতে।
কী করবেন জুকারবার্গ?
এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল—স্ট্রানকালিকে হোটেল, জাদুঘর বা পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করার কোনও পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়নি।বরং জুকারবার্গের মুখপাত্র জানিয়েছেন, পরিবারটি আয়ারল্যান্ডে থাকার সময় এই প্রাসাদকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করবে। একই সঙ্গে তাঁরা ঐতিহাসিক বাড়িটির যত্ন ও সংরক্ষণ চালিয়ে যেতে চান।
অর্থাৎ আপাতত এটি কোনও বাণিজ্যিক প্রকল্প নয়। এটি ব্যক্তিগত আবাস।তবে ভবিষ্যতে প্রাসাদের আরও পুনরুদ্ধার, বাগান ও জমির সংরক্ষণ কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপত্যের রক্ষণাবেক্ষণে নতুন বিনিয়োগ হতে পারে। কিন্তু এখনই কোনও বড় পরিকল্পনার কথা বলা হয়নি।শেষ পর্যন্ত স্ট্রানকালির গল্পটি তাই শুধু এক বিলিয়নিয়ারের নতুন বাড়ি কেনার গল্প নয়।এখানে রয়েছে মধ্যযুগের ক্ষমতার লড়াই, রহস্যময় হত্যার কিংবদন্তি, উনিশ শতকের গথিক রিভাইভাল স্থাপত্য, কয়েক প্রজন্মের মালিকানা বদল, দীর্ঘ পুনরুদ্ধার—আর এখন একবিংশ শতকের প্রযুক্তি সাম্রাজ্যের মালিক মার্ক জুকারবার্গ।একসময় যে নদীর তীরে দুর্গ তৈরি হয়েছিল ক্ষমতা রক্ষার জন্য, সেই একই নদীর তীরে আজ দাঁড়িয়ে আছে এক প্রযুক্তি-বিলিয়নিয়ারের ব্যক্তিগত প্রাসাদ। ইতিহাস বদলেছে। কিন্তু স্ট্রানকালির পাথরের দেয়াল এখনও সেই ইতিহাসের সাক্ষী।

Scroll to Top