৩৬৫ দিন। মানুষের মতো দেখতে রোবট বানানোর প্রতিযোগিতা নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক দুই প্রদর্শনীতে সেই প্রতিযোগিতা যেন নতুন মাত্রা পেয়েছে। ২০২৬-এর বেজিং বিশ্ব রোবট সম্মেলনে চীনের একের পর এক মানবসদৃশ রোবট দর্শকদের সামনে এসেছে—কেউ কথা বলছে, কেউ হাত নাড়ছে, কেউ নাচছে, কেউ আবার মানুষের সঙ্গে মুখোমুখি যোগাযোগ করছে। অন্যদিকে ২০২৫-এর ওসাকা বিশ্বমেলায় জাপান দেখিয়েছে অন্য ধরনের মানবসদৃশ রোবট—যেখানে লক্ষ্য শুধু মানুষকে নকল করা নয়, বরং মানুষের উপস্থিতি, দৃষ্টি, মুখভঙ্গি এবং আচরণের সূক্ষ্মতা ধরার চেষ্টা।
প্রশ্নটা তাই সরল—নারীর অবয়ব, মুখ, কথা, অঙ্গভঙ্গি এবং আচরণে কোন দেশের রোবটকে বেশি জীবন্ত বলে মনে হয়—চীন না জাপান?
দুটি প্রদর্শনীর চরিত্র আলাদা। আর সেই পার্থক্যই তুলনাটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
চীনের রোবট: জীবন্ত, চঞ্চল, প্রদর্শনমুখী
২০২৬-এর বেজিং সম্মেলনে চীনা রোবটের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের চলাফেরার প্রাণবন্ততা। নাচ, হাত নাড়া, দর্শকের দিকে ঘোরা, মাথা কাত করা, কথোপকথনের সময় অঙ্গভঙ্গি—সব মিলিয়ে চীনের নির্মাতারা দর্শকের চোখে প্রথমেই একটি ‘জীবন্ত’ চরিত্র তৈরি করতে চাইছেন। এবারের সম্মেলনে প্রায় তিন হাজার রোবট-প্রযুক্তি প্রদর্শিত হয়েছে এবং তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। বিশেষ করে ফুরিয়ে ইন্টেলিজেন্সের ত্বক-আবৃত মানবসদৃশ রোবট ‘জি-আর-৩’ নজর কেড়েছে। নরম আবরণ, কোমল মুখের রেখা এবং মানুষের সঙ্গে সঙ্গ দেওয়ার মতো আচরণ—এই নকশায় যন্ত্রের কঠিন চেহারা আড়াল করার চেষ্টা স্পষ্ট। ২০২৫ সালে এর প্রথম প্রকাশ্য প্রদর্শনীতেও নির্মাতারা মুখের কোমলতা এবং মানুষের সঙ্গে আবেগঘন যোগাযোগকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।চীনা রোবটের আর একটি বৈশিষ্ট্য—শরীরের ভাষা। কথা বলার সময় হাতের ব্যবহার, মাথা ঘোরানো, দর্শকের দিকে শরীর ফেরানো কিংবা মঞ্চে ছন্দময় চলাফেরা তাদের অনেক বেশি ‘প্রদর্শনযোগ্য’ করে তুলেছে। ২০২৬-এর সম্মেলনে মানবসদৃশ রোবটকে নাচ, ক্রীড়া, পানীয় পরিবেশন এবং নানা সামাজিক কাজেও দেখা গেছে।তবে এখানেই একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। চীনের রোবট অনেক সময় মানুষের মতো হওয়ার চেয়ে মানুষকে মুগ্ধ করার দিকে বেশি এগিয়ে। দ্রুত নড়াচড়া, চমকপ্রদ অঙ্গভঙ্গি এবং মঞ্চসুলভ আচরণ চোখে পড়ে। কিন্তু কাছ থেকে দেখলে মুখের অতিসূক্ষ্ম পরিবর্তন, চোখের দৃষ্টি বা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ায় যান্ত্রিকতার ছাপ এখনও ধরা পড়ে।
জাপানের রোবট: ধীর, সংযত, কিন্তু বেশি মানবিক
জাপানের পথটি অনেকটাই আলাদা। ওসাকার ২০২৫ বিশ্বমেলার ‘ভবিষ্যতের জীবন’ প্রদর্শনীতে হিরোশি ইশিগুরোর পরিকল্পনায় তৈরি মানবসদৃশ রোবটগুলির মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের আচরণের সূক্ষ্ম অনুকরণ।
‘ইউই’ তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় উদাহরণ। উচ্চতা মাত্র ১২০ সেন্টিমিটার। ওজন প্রায় ৪৪ কিলোগ্রাম। শরীরের প্রায় ৬০টি অংশ নড়তে পারে, যার মধ্যে শুধু মাথা ও মুখেই রয়েছে ২৮টি চলনক্ষম অংশ। চোখ, মুখ ও মাথার সূক্ষ্ম পরিবর্তনের মাধ্যমে হাসি, দৃষ্টি এবং আবেগের ইঙ্গিত প্রকাশের ব্যবস্থা রয়েছে।আরও গুরুত্বপূর্ণ হল—ইউই মানুষের চোখের দৃষ্টি এবং শরীরের নড়াচড়া অনুসরণ করতে পারে। দূরে বসে থাকা একজন মানুষ তার চোখ দিয়ে দেখে, মাইক্রোফোনের মাধ্যমে শোনে এবং তার গতিবিধি ইউই-এর শরীরে প্রতিফলিত হয়। স্বয়ংক্রিয় অবস্থাতেও বাস্তব মানুষের অঙ্গভঙ্গি আগে থেকে ধারণ করে তা পুনরুৎপাদনের ব্যবস্থা রয়েছে।এখানে জাপানের শক্তি স্পষ্ট। রোবটটি দর্শককে চমকে দেওয়ার জন্য ক্রমাগত নড়াচড়া করে না। বরং কখন নড়বে, কতটা নড়বে এবং কোথায় তাকাবে—সেই সংযমই তাকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসে।ওসাকার আর একটি মানবসদৃশ রোবট ‘ইয়ামাতোরয়েড’-এর উচ্চতা প্রায় ১৭৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৬৩ কিলোগ্রাম। তার চোখে ক্যামেরা রয়েছে, যা মানুষের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে যোগাযোগের অনুভূতি তৈরি করে। মুখের ভ্রু, চোখ ও ঠোঁটের সূক্ষ্ম পরিবর্তনের মাধ্যমে জটিল আবেগের ইঙ্গিত প্রকাশের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
চেহারায় কে এগিয়ে?
এখানে জাপান সামান্য এগিয়ে।
চীনের সাম্প্রতিক নারী-আকৃতির রোবটগুলি দেখতে আকর্ষণীয়, অনেক ক্ষেত্রেই সুন্দর এবং অত্যন্ত পরিচ্ছন্নভাবে মানুষের অবয়ব অনুসরণ করে। কিন্তু জাপানের নকশায় মুখের ‘নিখুঁত সৌন্দর্য’-এর চেয়ে মানুষের মুখের অসম্পূর্ণ স্বাভাবিকতা ধরার চেষ্টা বেশি।মানুষের মুখ কখনও স্থির থাকে না। চোখের পাতা নড়ে, ভ্রু সামান্য ওঠে, ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ পরিবর্তন আসে। জাপানি নির্মাতারা সেই ক্ষুদ্র পরিবর্তনগুলিকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
আকারে কার রোবট বেশি স্বাভাবিক?
এখানে একক বিজয়ী নেই
চীনের কিছু রোবট পূর্ণবয়স্ক মানুষের কাছাকাছি উচ্চতার। আবার জাপানের ইউই ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট। ফলে ‘মানুষের মতো’ হওয়ার সংজ্ঞাটিই আলাদা।
তবে দর্শকের সঙ্গে মুখোমুখি যোগাযোগের ক্ষেত্রে ছোট আকারের ইউই-এর একটি সুবিধা আছে। তার চেহারা দর্শকের চোখের সামনে থাকে এবং দূরত্ব কম থাকায় মুখভঙ্গির সূক্ষ্মতা সহজে বোঝা যায়। অন্যদিকে ১৭৮ সেন্টিমিটারের ইয়ামাতোরয়েড পূর্ণবয়স্ক মানুষের উপস্থিতির কাছাকাছি। ফলে ঘরে বা মঞ্চে দাঁড়ালে তার উপস্থিতি অনেক বেশি বাস্তব মনে হয়।
কথাবার্তায় কে বেশি স্বাভাবিক?
এই জায়গায় জাপানের পদ্ধতি বেশি সূক্ষ্ম, চীনের পদ্ধতি বেশি প্রাণবন্ত।
চীনের প্রদর্শনীতে রোবটকে দর্শকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, প্রশ্নের উত্তর, অভিবাদন এবং বিভিন্ন সামাজিক কাজে দেখা যাচ্ছে। ২০২৬-এর বেজিং প্রদর্শনীতে আবেগ প্রকাশ এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বিশেষভাবে তৈরি রোবটও ছিল।
জাপান অবশ্য কথোপকথনের সঙ্গে চোখের যোগাযোগ এবং মুখভঙ্গিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। অর্থাৎ শুধু কী বলা হচ্ছে তা নয়—কথা বলার সময় সামনে থাকা মানুষটির দিকে কীভাবে তাকানো হচ্ছে, মাথা কীভাবে ঘুরছে, মুখে কী পরিবর্তন হচ্ছে—সেটিও যোগাযোগের অংশ।
মানুষের স্বাভাবিক কথোপকথনে এই দ্বিতীয় বিষয়টিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আচরণে আসল পরীক্ষা সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি এখানেই।একটি রোবট নাচতে পারে, দৌড়তে পারে, হাত নাড়তে পারে—তাতে সে জীবন্ত হয়ে যায় না। মানুষের আচরণের আসল স্বাভাবিকতা তৈরি হয় থামা, অপেক্ষা করা, তাকানো, প্রতিক্রিয়া জানানো এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী অঙ্গভঙ্গি বদলানোর মধ্যে।
এই পরীক্ষায় জাপানের রোবটগুলি এখনও এগিয়ে বলে মনে হয়। ইউই-এর দৃষ্টি, মুখভঙ্গি এবং অঙ্গভঙ্গি মানুষের আচরণের নকল করার জন্য পরিকল্পিত। ইয়ামাতোরয়েডের চোখের ক্যামেরাও মুখোমুখি যোগাযোগের অনুভূতি তৈরি করে।চীনের শক্তি অন্য জায়গায়—চলন ও প্রকাশের গতি। ২০২৬-এর বেজিং প্রদর্শনী দেখিয়েছে, চীনা নির্মাতারা রোবটকে শুধু স্থির প্রদর্শনী বস্তু না রেখে মঞ্চে সক্রিয় চরিত্র হিসেবে হাজির করতে চাইছেন।
তুলনামূলক মূল্যায়ন
নিচের নম্বরগুলি কোনও বৈজ্ঞানিক পরিমাপ নয়; প্রদর্শিত রোবটগুলির চেহারা, চলন ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ধরন দেখে সম্পাদকীয় মূল্যায়ন।
বৈশিষ্ট্য| চীন| জাপান
মুখের স্বাভাবিকতা| ৮| ৯
চোখের দৃষ্টি| ৮| ৯.৫
মুখভঙ্গি| ৮.৫| ৯.৫
শরীরের চলন| ৯.৫| ৯
কথোপকথনের প্রাণবন্ততা| ৯| ৯
মানুষের মতো আচরণ| ৮.৫| ৯.৫
সামগ্রিক জীবন্ত অনুভূতি| ৯| ৯.৫
শেষ কথা
চীন এখন রোবটকে চলমান, চঞ্চল এবং দর্শককে আকর্ষণ করার মতো প্রাণবন্ত চরিত্রে পরিণত করার দৌড়ে অত্যন্ত দ্রুত এগোচ্ছে। জাপান অন্যদিকে মানুষের সবচেয়ে কঠিন বিষয়টি ধরতে চাইছে—স্বাভাবিকতা।
চীনের নারীসদৃশ রোবটকে দেখলে প্রথম প্রতিক্রিয়া—“কী দারুণ নড়ছে!”
জাপানের রোবটকে দেখলে প্রশ্নটা একটু অন্যরকম—“ও কি সত্যিই আমাকে দেখছে?”
এই দুই অনুভূতির মধ্যে দ্বিতীয়টিই সম্ভবত মানুষ ও যন্ত্রের দূরত্ব কমানোর ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।তাই শুধু চঞ্চলতা ও প্রদর্শনক্ষমতা বিচার করলে চীন এগিয়ে। কিন্তু মুখ, চোখ, কথা, অঙ্গভঙ্গি এবং সামগ্রিক মানবিক স্বাভাবিকতা বিচার করলে জাপান এখনও সামান্য এগিয়ে।
তবে ব্যবধানটি স্থায়ী নয়। বেজিংয়ের সাম্প্রতিক প্রদর্শনী দেখাচ্ছে, চীন যে গতিতে এগোচ্ছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই তুলনার উত্তর সম্পূর্ণ উল্টেও যেতে পারে।মানুষের মতো রোবট বানানোর প্রতিযোগিতায় তাই আসল লড়াই এখন আর কে বেশি দ্রুত দৌড়তে পারে, তা নয়। আসল প্রশ্ন—কে মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষটির মতো স্বাভাবিকভাবে তাকাতে, শুনতে, কথা বলতে এবং প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।





