৩৬৫ দিন।দিগন্ত বিস্তৃত সোনালি গমের স্তেপ নয়। হেলসিঙ্কির টুনটুরি রেঞ্জ থেকে ২৭ মিনিট ঘোড়া ছুটিয়ে সোজা হেইতারান্টা বিচ। উত্তাল বাল্টিক সাগরের উন্মুক্ত মোহনার নীল জলে ঝাঁপিয়ে পড়ছে আরবি ঘোড়ারা। পিঠে ঝকঝকে সুন্দরী তরুণীকে বসিয়ে আরও গভীর জলের দিকে। তলস্তয়ের উপন্যাসের সেই কসাক কিংবা ফিনিশ যোদ্ধাকে পিঠে নিয়ে লড়াইয়ের ময়দান নয়, অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস এর অভিনব উষ্ণতায় নিমজ্জিত উত্তেজনার অ্যাড্রেনালিন ক্ষরণ। হর্স উইথ সি অ্যাডভেঞ্চার। পছন্দের ঘোড়া বেছে নিন। তারপর চেপে বসলেই হল। নির্ধারিত ঘোড়ার র্যাঞ্চ থেকে ধুলো উড়িয়ে সোজা উত্তাল সমুদ্রে ঝাঁপ। ঘণ্টাখানেক এমন ঘোড়া সমেত সমুদ্রে কাটানোর এই বিনোদন অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের অতি জনপ্রিয় এবং ব্যয়বহুল সংযোজন। ফিনল্যান্ড ছাড়াও ক্রোয়েশিয়া, আর্মেনিয়া,আমেরিকা সহ এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিনোদন অনুরণন। কিন্তু কেন? কীভাবেই বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ ফিনল্যান্ড কিংবা ক্রোয়েশিয়ার মত পাহাড়ি দেশে এই অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস এলো।
ইতিহাস প্রাচীন। ঘোড়ার সঙ্গে প্রায় সহবাসের মতই এই বিস্তীর্ণ উত্তর ইউরোপের নর্ডিক অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। যুদ্ধ,লড়াই,অভিযান সবেতেই ঘোড়া আবশ্যিক। যার ঘোড়া নেই,সে অচল।আশ্চর্যজনক সামুদ্রিক জলজ মাছ সি হর্স দেখে অবাক হয়েছিলেন ফিনিস রাজা ফেড্রিক দ্যা কার্ল। পরে বিজ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করে জানেন, বিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম হিপ্পোক্যাম্পাস। যা একটি গ্রীক শব্দ। গ্রীক পুরাণ অনুযায়ী হিপ্পোস মানে ঘোড়া। আর ক্যাম্পোস মানে সমুদ্রের রাজা। গ্রীকদের কাছে পসেইডন হল – সমুদ্র দেবতা। যার সামনের অংশ ঘোড়ার মত আর পিছনের অংশ মাছের মত। সেই জলের দেবতার সাথে মিল আছে বলেই এই প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নামের গণ হিপ্পোক্যাম্পাস। আর ঘোড়ার মত গঠন বলে এর নাম সি-হর্স। ফ্রেডরিক দা আর্ল ডে এমনই কিছু ভেবে বাস্তবে ঘোড়াকে সমুদ্রে নামানোর কথা ভাবেন।মূলত গ্রিক সমুদ্রের রাজাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে চরম ক্যাথলিক ফেদ্রিক এই খেলা শুরু করেন। তিনি জানতেন ঘোড়া খুব ভালো সাঁতারু। যুদ্ধে বহুবার গভীর নদী নালা পার করে গিয়েছে অনায়াসে।প্রায় দেড়শো বছর আগে আনুষ্ঠানিক ভাবেই ইংল্যান্ডের রাজ পরিবারে শুরু হয় এই অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের মহড়া। দ্রুত রাজ পরিবারের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়ার পর, ক্রমশ উত্তর ইউরোপ এবং বলটিক অঞ্চলের অন্যান্য রাজাদের মধ্যেও এই খেলার জনপ্রিয়তা বাড়ে। শোনা যায় অভিজাত মহলে এই স্পোর্টস জনপ্রিয় হওয়ার পর মূলত তাদের মাধ্যমে ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কোথাও কোথাও এই খেলা ছড়িয়ে পড়ে। মৃত্যুও যে কম ঘটে নি তা নয়। জলের স্রোত বুঝতে না পেরে কিংবা আচমকা বড় ঢেউয়ে তলিয়ে গিয়েছে সওয়ার ।
ভারতে কেন চালু হবেনা এই বিনোদনমূলক স্পোর্টস?
এই মুহূর্তে ফিনল্যান্ডে এই স্পোর্টস এ অংশ নিতে বিপুল টাকা খরচা করে উত্তর ইউরোপের পর্যটকরা আসেন। রীতিমতো শুটিং হয়, বিজ্ঞাপন তৈরি হয়, এমনকি প্রি ম্যারেজ ফটোশুটও হয়। তবে নেদারল্যান্ডস ,স্পেন এবং পর্তুগালে এই খেলা নিষিদ্ধ। মূলত প্রাণী সুরক্ষার কথা ভেবেই খেলা নিষিদ্ধ। তাতে কোন রকম ভাবে ঘোড়া আহত না হয়। একটি গবেষণায় উঠে এসেছিল, দীর্ঘক্ষণ নোনা জলে থাকার জন্য ঘোরার ত্বকে কানে এবং চোখে নানা রকম সংক্রামক ব্যাধি তৈরি হচ্ছে। একেকটা স্পোর্টস এডভেঞ্চারে এক একটি ঘোড়াকে দিনে পাঁচ ঘন্টারও বেশি সময় সমুদ্রের জলে ডুবে থাকতে হয়। তারপরেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।




