৩৬৫ দিন। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় অসামান্য অবদানের জন্য পদার্থবিদ্যার নোবেল অস্কার ক্লেইন পুরস্কার পেয়েছেন, এই মুহূর্তে কিংবদন্তি বিজ্ঞানী পিটার হিগস, স্টিফেন হকিংয়ের সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে এখন উচ্চারিত হচ্ছে তার নাম। কলকাতার সঙ্গে তার যে নাড়ির টান, তাই বার্লিনে ঝা চকচকে আন্তর্জাতিক পদার্থবিদ্যার সামিটে যে না গিয়ে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবার্ষিকী প্রেক্ষাগৃহ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। পড়ুয়া গবেষক প্রফেসর এবং উৎসাহী মানুষদের সামনে অকপটে বললেন, বিজ্ঞান চর্চা আর গবেষণার জন্য বিদেশে যেতে হবে এমন কোন কথা নেই। বুধবার সন্ধ্যায় অধ্যাপক শিশির কুমার মিত্র স্মরণে আয়োজিত স্মারক বক্তৃতা দিতে উঠে কৃতি বাঙালি বিজ্ঞানীর, বাঙালি হিসেবে গর্বিত উক্তি উপস্থিত শ্রোতাদের করতালিতে ভেসে গেল। জগদীশচন্দ্র বসু থেকে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র মেঘনাথ সাহা প্রশান্ত মহলনবীশদের শিক্ষা ও কর্মভূমিতে দাঁড়িয়ে, বিজ্ঞানী অশোক সেনের গ্রাভিটি ফ্রম স্ট্রিং এন্ড ড্রিংকস ফ্রম গ্রাভিটি শীর্ষক বক্তৃতার গভীরতা যাই হোক, ভরপুর বাঙালিয়ানায় টইটুম্বুর ছিল। এ যেন পিতা পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক অলোক কুমার সেনের কাছে পদার্থবিদ্যা সম্পর্কে আগ্রহ,শৈলেন্দ্র সরকার স্কুল, প্রেসিডেন্সি,তাবড় তাবড় শিক্ষকদের ঘ্রাণ লেগে থাকা শহরের, অতীতের স্ট্রিং পুলে টান,স্মৃতির গ্র্যাভিটির তীব্র আকর্ষণ। আলোচনায় ফিরে এল কলেজ জীবনে তার বানানো ঝলসানো মুরগির বার্বিকিউ এর গল্প।
হাল্কা গোলাপি রঙের গোল গলা টি-শার্ট, অলিভ গ্রিন সিক্স পকেট প্যান্ট, এক কাঁধে ঝোলানো ব্যাক প্যাক। এখনও যেন প্রেসিডেন্সিরই ছাত্র। অথচ গ্র্যাভিটি ফ্রম স্ট্রিংস অ্যান্ড স্ট্রিংস ফ্রম গ্র্যাভিটি শীর্ষক লেকচার শুরুর পরে এই সহজ-সরল ৭০ বছরের মানুষটাই ঢুকে পড়লেন স্ট্রিং থিওরির জটিল ইকুয়েশন ও তত্ত্ব ব্যাখ্যায়।সম্প্রতি কিছু ভারতীয় গবেষক দাবি করেছিলেন, গীতার দর্শনের সঙ্গে কোয়ান্টাম ফিজিক্সের মিল আছে। কিছু উৎসাহী গবেষক,পড়ুয়া প্রশ্নটি করেন। বিজ্ঞানী অশোকের জবাব, কোয়ান্টাম ফিজিক্স জানি। কিন্তু আমি তো গীতা পড়িনি। তুলনা করব কী করে? মিনিট চল্লিশের লেকচারের জন্য ৩৩টি স্লাইড ছিল তাঁর প্রেজেন্টেশনে। কোনও ডিজাইনের আধিক্য নেই। সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের উপরে একটা লাইন নীল রঙের ফন্টে, পরের লাইন লাল ফন্টে। কারণটা খুব সহজ। আসল তো ওই স্লাইডগুলোতে থাকা বিজ্ঞান, সেখানে সাজগোজের কী দরকার? স্ট্রিং থিওরি কী? এটি হল পদার্থবিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং আধুনিক তত্ত্ব। চারপাশের সবকিছু, জল বাতাস থেকে শুরু করে আমাদের শরীর-সবকিছুই পরমাণু দিয়ে তৈরি, যা ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রন থেকে তৈরি হয়। এর ভিতরে কোয়ার্ক নামের আরও ছোট কণা থাকে। পদার্থবিজ্ঞানের সাধারণ ব্য়াখ্যায় মূল কণাগুলিকে বিন্দুর মতো বলে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু স্ট্রিং থিওরি বলে, কণাগুলি বিন্দু নয়, বরং সেগুলির আকার সূক্ষ্ম এবং কম্পনশীল সুতোর মতো।স্ট্রিং থিওরি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, গিটার বাজানোর সময় কম্পন অনুযায়ী একই তার থেকে ভিন্ন ভিন্ন সুর সৃষ্টি হয়। একই ভাবে সুতোর মতো কণাগুলি এক ভাবে কাঁপলে ইলেট্রনের মতো আচরণ করে, অন্য ভাবে কাঁপলে ফোটনের মতো কাজ করে। অর্থাৎ মহাবিশ্বের সব মৌলিক কণা এবং শক্তি শুধুমাত্র একই ধরনের সুতোর ভিন্ন ভিন্ন কম্পন।
অশোকের গবেষণার মূল ক্ষেত্র স্ট্রিং থিওরি।
এই তত্ত্বের মাধ্যমে পদার্থের মৌলিক উপাদান এবং প্রকৃতির বিভিন্ন বলকে একটি ঐক্যবদ্ধ কাঠামোয় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। স্ট্রিং থিওরির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে তাঁর গবেষণা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান এস-ডুয়ালিটি নিয়ে গবেষণা। এই ধারণা তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় শক্তিশালী ও দুর্বল মিথস্ক্রিয়ার মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করে।নয়ের দশকে স্ট্রিং থিওরির পাঁচটি পৃথক গাণিতিক সংস্করণ ছিল বিজ্ঞানীদের কাছে, যাতে মনে হতো সেগুলি ভিন্ন ভিন্ন তত্ত্ব। কিন্তু অশোক সেন দেখিয়েছেন, একটি তত্ত্ব অন্য একটি তত্ত্বের সমান বা রূপান্তরযোগ্য। তাঁর সেই গবেষণার উপর ভর করেই পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেন যে, পাঁচটি থিওরি আলাদা আলাদা কিছু নয়, বরং একটি মূল তত্ত্বের পাঁচটি আলাদা আলাদা রূপ। বিভ্রান্তি দূর করে ভিন্ন ভিন্ন তত্ত্বগুলিকে একত্রিত করার জন্যই তিনি ২০১২ সালে পুরস্কৃত হন। অশোক সেন জানান, স্ট্রিং থিওরির মূল চ্যালেঞ্জ হল, গাণিতিক ভাবে এই তত্ত্বের সাহায্য়ে বহু ধরনের সমাধান বের করা সম্ভব। সেই সমাধানগুলি থেকে আবার এমন একটি সমাধান খুঁজে বের করতে হবে, যা আমাদের বাস্তব প্রকৃতির কণাগুলির সঙ্গে ১০০ শতাংশ মিলিয়ে নিতে হবে। এই মুহূর্তে সেই চেষ্টাই করছেন বিজ্ঞানীরা।
নোবেলের থেকে তিনগুণ বেশি পুরস্কার মূল্য পাওয়া অশোকের জীবনযাপন আগের মতোই সরল এবং সাদাসিদে। যেমনটি তার ছাত্ররা আগে দেখে এসেছেন। গোটা বিশ্বের কাছে তিনি এখন পরিচিত। তবে এই সম্মান, খ্যাতি তাঁর জীবনে কোনও বিশেষ পরিবর্তন আনেনি। এখনও তিনি সাইকেল চালিয়ে কর্মস্থলে যান।
‘কলকাতাতেও থেকে গবেষণা হয়’,
অস্কার ক্লেইন পেয়ে বললেন অশোক সেন
- khabar365din
- November 6, 2026
- 1:29 pm
- No Comments






