একুশের নির্বাচনী প্রচারে নন্দীগ্রামে পা ভাঙেনি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর, মেডিকেল রিপোর্টে তার সব প্রমাণ রয়েছে, তদন্ত হবে: মুখ্যমন্ত্রী

৩৬৫ দিন। ২০২১ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী গোটা নন্দীগ্রামকে অপমান করে অভিযোগ করেছিলেন তাঁর পা নাকি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরো সায়েন্স-এর ডিপার্টমেন্ট অফ রেডিও ডায়াগনোসিস-এর ১১.০৩.২০২১ তারিখের রিপোর্ট বলছে, পা ভেঙে যাওয়া অথবা ডিসলোকেশনের কোনও প্রমাণ মেলেনি। আজ এভাবেই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিভিন্ন রিপোর্ট হাতে নিয়ে দেখিয়ে নবান্ন থেকে বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পাশাপাশি নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনের ভোট পর্ব মিটে গেলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সিআইডি এটার তদন্ত করছে। নির্বাচনী বিধি উঠে গেলে এই মিথ্যে প্রচারের জন্য আমরা নতুন করে তদন্ত করব।
প্রসঙ্গত একুশের বিধানসভা নির্বাচনে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম বিধানসভা থেকে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু নন্দীগ্রামের বিরুলিয়া বাজারে ভোট প্রচারের সময় তাঁর গাড়িতে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পা ভেঙে দেবার অভিযোগ তুলেছিলেন মমতা। মমতা অভিযোগ করেছিলেন, ইচ্ছাকৃত ভাবেই তাঁর ভোট প্রচার বন্ধ করতে পায়ে আঘাত করা হয়েছে। নন্দীগ্রাম থেকে আহত মমতাকে এসএসকেএম হাসাপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়েছিল। এর পর আঘাত লাগা পায়ে প্লাস্টার নিয়েই হুইলচেয়ারে বসে গোটা রাজ্যে ভোট প্রচার করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। স্লোগান তুলেছিলেন, ভাঙা পায়েই খেলা হবে।
গতকালই নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনের প্রচারে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছিলেন, পা ভাঙা নিয়ে মিথ্যে প্রচার করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ নিজের সেই দাবির স্বপক্ষে নন্দীগ্রামের ঘটনায় যে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর পা ভাঙেনি, সেই প্রমাণও তাঁর কাছে আছে বলে দাবি করলেন মুখ্যমন্ত্রী। গতকাল সেই বিরুলিয়া বাজারে দাঁড়িয়েই শুভেন্দু দাবি করেছিলেন, আমি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর পিজি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। এক্স রে প্লেট রোগি পেয়ে যায়, রিপোর্ট ডাক্তারের কাছে থাকে। আপনাদের বদনাম করে দিয়েছিল কি না? লোহার বিমে গাড়ির দরজা লেগেছিল। পায়ে অল্প চোট লেগেছিল। উনি তখন মুখ্যমন্ত্রী, ওনার ডাক্তাররা লিখে দিয়েছেন নো ফ্র্যাকচার। যেদিন দরকার হবে চ্যালেঞ্জ করলে দেখিয়ে দেবো। গোটা বিরুলিয়া, নন্দীগ্রামকে অপমান করেছেন। প্রলয় পালদের বার বার সিআইডি অফিসে ডেকেছে।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ ওড়ালেন কুণাল
একুশের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে বেরিয়ে মমতার পা ভাঙ্গার ঘটনা নিয়ে হঠাৎ করে প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরে যেভাবে নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনের ভোট গ্রহণের আগে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেই ঘটনাকে মিথ্যে বলে দাবি করার পাশাপাশি সিআইডি তদন্তের ঘোষণা করেছেন তার তীব্র নিন্দা করলেন মমতা তৃণমূলের বিধায়ক কুনাল ঘোষ। মুখ্যমন্ত্রীর রিপোর্ট দেখানোর যুক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, মুখ্যমন্ত্রীকে এটা কে বলল যে কেবল ফ্র্যাকচার হলেই পা ব্যান্ডেজ বাঁধতে হয়? গুরুতরভাবে জখম হলে যেকোনো চিকিৎসকই একজন বয়স্ক মানুষকে, যাঁকে এত ঘোরাঘুরি করতে হয়, পা ব্যান্ডেজ করে রাখার পরামর্শ দেবেন। ওনার ফ্র্যাকচার হয়নি, সেটাই বা উনি কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন? আজকে ওনার হাতে এসএসকেএম, ওনার হাতে সরকার! কার এক্স-রে প্লেট দেখিয়ে কী গল্প ছাড়ছেন, তা আমি কীভাবে বুঝব?
পাশাপাশি নন্দীগ্রাম ভোটের আগে হঠাৎ করে মমতার পায়ের জখম নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর প্রেস কনফারেন্সের তীব্র নিন্দা করে তিনি বলেন, মমতাদির পা-এর জখম নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর রাজনীতি দুর্ভাগ্যজনক ও রুচিহীন। কারুর ব্যক্তিগত জখম নিয়ে কুৎসা ও অপপ্রচার আপত্তিকর। মমতাদির পায়ের জখম ছিল এবং সংশ্লিষ্ট ডাক্তাররা তার সাক্ষী। যে সংস্থায় যাঁরা চিকিৎসা করেছিলেন, তাঁরা জানেন। এখন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন হাতে আছে বলে যে কোনো বিকৃত প্রচার করা ঠিক নয়। শুভেন্দুর বোঝা উচিত, ভাঙলে তবু জোড়ে বা সারে। কিন্তু নরম টিস্যু, মাসল আর হাড়ের উপর গভীর আঘাত সারা কঠিন। এখনও মমতাদির পায়ে ফোলা অংশ স্বাভাবিক নয়। আমি যতদূর জানি, পুরো সারেনি। তা নিয়ে উপনির্বাচনের আগে এই কুৎসিত রাজনীতি আপত্তিকর, নিন্দনীয়। মমতাদিকেই যে বিজেপি আসল প্রতিপক্ষ ভাবে এবং তাদের শয়নে স্বপনে জাগরণে মমতাদিকেই দেখে, সেটা আবার প্রমাণিত। তাছাড়া চিকিৎসক বা প্রতিষ্ঠান কখনও কারুর ব্যক্তিগত চিকিৎসা তথ্য বাইরে আনার রীতি নেই, সরকার সেটাও যেন মনে রাখে। রাজনীতিকে আর কত নিচে নামাবে এরা? মমতাদির পায়ের সেই ভয়ংকর আঘাত নিয়ে নোংরামি চূড়ান্ত আপত্তিকর।

Scroll to Top