শরতের রূপের সঙ্গে মিলেমিশে যাবে বাংলার সনাতন ঐতিহ্য

৩৬৫ দিন। হাওড়া। সুমন আদক। হাওড়া-আমতা রোডের ব্যস্ততম পথ। সারাক্ষণ ছুটে চলেছে গাড়ি, মানুষের ভিড়, শহরের চেনা ব্যস্ততা। তারই মাঝে দাসনগর রেলওয়ে স্টেশনের কাছে প্রতি শরতে যেন অন্য এক জগৎ তৈরি হয়। আলো, শিল্প, সৃজনশীলতা আর বাঙালির আবেগকে সঙ্গে নিয়ে সেজে ওঠে দাসনগর ইউনাইটেড ক্লাব। ২০২৬-এ এদের দুর্গাপুজো ৪২তম বর্ষে পদার্পণ করছে। আর এবারের আয়োজন শুধুই প্রতিমা, মণ্ডপ কিংবা আলোর উৎসব নয়; কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষকে স্মরণ করে কবিতার ভাবনাকে মণ্ডপশিল্পে তুলে ধরার এক অভিনব প্রয়াস। এবারের থিম;‘এই নবান্নে’।
সুকান্তের কবিতার চেতনা, মাটির মানুষের জীবন, নতুন দিনের স্বপ্ন এবং বাংলার শিকড়ের সঙ্গে উৎসবের যোগসূত্রকেই শিল্পের ভাষায় ফুটিয়ে তুলতে প্রস্তুত দাসনগর ইউনাইটেড ক্লাব। মণ্ডপ নির্মাণে ব্যবহার করা হবে পরিবেশবান্ধব বাঁশ, খড় ও কাগজের মণ্ড। ফলে শিল্পের সঙ্গে পরিবেশ সচেতনতার বার্তাও মিলেমিশে যাবে এই আয়োজনে। প্রতিমাতেও থাকছে শিল্পের বিশেষ ছোঁয়া। প্রখ্যাত ভাস্কর গোপাল পাল এবং থিম শিল্পী চিরঞ্জীবের ভাবনায় তৈরি হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন দেবীপ্রতিমা। মণ্ডপ থেকে প্রতিমা; প্রতিটি পরতে দর্শককে অন্য এক অনুভূতির মধ্যে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে উদ্যোক্তাদের। দাসনগর ইউনাইটেড ক্লাবের পুজোর অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য তার অবস্থান। হাওড়া-আমতা রোডের অত্যন্ত ব্যস্ত অংশে, দাসনগর রেলওয়ে স্টেশনের কাছে এই পুজো। পুজোর দিনগুলিতে এখানে মানুষেরঢল নামে। দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলা তো বটেই, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, বিহার এবং দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে কলকাতায় প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পথও পুজোর সময় হয়ে ওঠে উৎসবের সাক্ষী। উদ্যোক্তাদের দাবি, পুজোর দিনগুলিতে প্রতিদিন ৭০ হাজারেরও বেশি দর্শনার্থীর সমাগম হয়। বিশাল আয়তনের পূজামণ্ডপও সেই বিপুল জনসমাগম সামলানোর কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা হচ্ছে। মহালয়া থেকে দ্বাদশী পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকবে মণ্ডপ। তবে দাসনগর ইউনাইটেড ক্লাবের পুজোর আকর্ষণ শুধু মণ্ডপের ভিতরে সীমাবদ্ধ নয়।
ব্যস্ত প্রধান সড়কের উপর অবস্থানের কারণে প্রতিদিন কয়েক লক্ষ পথচারী, যাত্রী এবং গাড়িচালকের চোখে পড়বে এই পুজোর সাজসজ্জা। উদ্যোক্তাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২.৪ থেকে ৩.২ লক্ষ মানুষের নজরে আসতে পারে মণ্ডপটি। ফলে পুজো যেমন দর্শনার্থীদের কাছে শিল্প ও সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে, তেমনই এটি হয়ে উঠবে শহরের চলমান জীবনেরও এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১২ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টায় দুর্গা মন্দির প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হবে দাসনগর ইউনাইটেড ক্লাবের মণ্ডপ। তার আগে মহালয়ার আবহ থেকেই শুরু হবে দেবীপক্ষের অপেক্ষা। প্রদীপ প্রজ্বলন, বোধন এবং শারদীয় আবেগে একাকার হবে ক্লাব চত্বর। ৪২ বছরের পথ পেরিয়ে দাসনগর ইউনাইটেড ক্লাব এবার তাই শুধু দেবী আরাধনায় নয়, কবিতার চেতনাকে সঙ্গে নিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছতে চাইছে। ‘এই নবান্নে’ যেন সেই আহ্বান;নতুনের স্বপ্ন, মাটির টান এবং বাঙালির চিরন্তন উৎসবের হাত ধরে শারদোৎসবকে আরও একবার মানুষের করে তোলার।

Scroll to Top