মাটির গোপনে প্রাচীন সভ্যতার খোঁজ

৩৬৫ দিন। অঙ্কিতা দাস। দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় দুর্গোৎসব বৈষ্ণবঘাটা পাটুলি উপনগরী সার্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটি এবার ৩৯তম বর্ষে পদার্পণ। প্রতিবছরের মতো এবারও অভিনব ভাবনায় সেজে উঠছে তাদের মণ্ডপ। এই বছরের ভাবনা ‘অন্তলীন’, রূপায়ণে রয়েছেন বিশিষ্ট শিল্পী পার্থ জোয়ারদার। হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার ইতিহাসকে মাটি, ইট ও খড়ের সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে বাস্তবে ফুটিয়ে তুলতে চলেছে এই পুজো, যেখানে দর্শক শুধু ঠাকুর দেখবেন না, সাক্ষাৎ করবেন ইতিহাসের। ‘অন্তর্লীন’ বিষয়বস্তুর ব্যাখ্যার মাধ্যমে শিল্পীর বক্তব্যনুযায়ী-অতীত কখনও সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যায় না, সে কেবল সময়ের পরতে পরতে অন্তর্লীন হয়ে থাকে। সভ্যতার জন্ম হয়, তা বিকশিত হয়, আবার কালের প্রবাহে একদিন মাটির গভীরে বিলীন হয়ে যায়।
কিন্তু ইতিহাসের নীরব নিঃশ্বাস, মানুষের লালিত স্বপ্ন, শিল্পের সূক্ষ্ম স্পর্শ এবং সংস্কৃতির চিরন্তন স্মৃতি কখনও মুছে যায় না। তারা প্রতীক্ষা করে থাকে এক নতুন আবিষ্কারের, এক নবজাগরণের। আমাদের এবারের নিবেদন ‘অন্তর্লীন’ সেই বিস্মৃত সময়েরই এক শৈল্পিক প্রতিরূপ। এই মণ্ডপে প্রবেশ করা কেবল একটি পুজোমণ্ডপ দর্শন নয়, বরং মাটির গভীরে সুপ্ত এক অজানা সভ্যতার অভ্যন্তরে পদচারণা। এখানে প্রতিটি ধাপ যেন এক একটি প্রত্নতাত্ত্বিক খননস্তর, প্রতিটি ভগ্ন স্থাপত্য যেন অতীতের মূক সাক্ষী, আর প্রতিটি মাটির আস্তরণ যেন ইতিহাসের এক একটি অধ্যায়কে উন্মোচিত করে। দর্শক যত ভিতরে প্রবেশ করবেন, ততই তিনি অনুভব করবেন সময়ের গভীরে হারিয়ে যাওয়া এক জনপদের স্পন্দন। পরিশেষে, সেই নিস্তব্ধ ইতিহাসের বক্ষ ভেদ করে আবির্ভূতা হন দেবী দুর্গা; যিনি শক্তি, সৃষ্টি এবং নবজাগরণের শাশ্বত প্রতীক। তিনি যেন স্মরণ করিয়ে দেন, ধ্বংসের মধ্যেই নিহিত থাকে নবসৃষ্টির বীজ এবং বিস্মৃতির গর্ভেই লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। তাই ‘অন্তর্লীন’ কেবল একটি থিম নয়, এটি সময়, স্মৃতি, সভ্যতা ও মানবতার এক শৈল্পিক পুনরুত্থান।
থিমের উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে শিল্পী জানান, ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা বা অতীতের ঘটনা আমরা বইয়ের মাধ্যমে পড়ি এবং কল্পনায় তার চিত্র তৈরি করি। সেই কল্পনাকেই বাস্তবে রূপ দেওয়াই এই ভাবনার মূল লক্ষ্য। নতুন ও পুরনো উভয় প্রজন্মের কাছে ইতিহাসকে চাক্ষুষ করাই উদ্দেশ্য, যাতে এটি কেবল পুজো না হয়ে ওঠে, ইতিহাসের সঙ্গে দর্শকের সরাসরি সাক্ষাৎ হয়। তবে বাস্তবতার অনুভূতি বজায় রাখতে ভাবনায় নিজস্ব শৈল্পিক ভাবনাও যোগ করা হয়েছে। থিমকে সভ্যতার আদলে গড়ে তুলতে তিন থেকে পাঁচ ফুট মাটি খনন করে ইট ও খড় দিয়ে প্রাচীন জনবসতির আদলে বাড়িঘর নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণে কোনওরকম কৃত্রিম উপকরণ বা থার্মোকল ব্যবহার করা হয়নি। প্রাথমিকভাবে সাড়ে আট ফুট পর্যন্ত খনন করা হলেও প্রবল বৃষ্টির কারণে জটিলতা তৈরি হয়। পরে মাটি ভরাট করে প্রায় সাড়ে ছয় ফুট গভীরতায় কাজটি সম্পন্ন করা হয়।

Scroll to Top