
সৌগত সরকার
মিঠু মুখার্জি দুর্দান্ত অভিনেত্রী, ছবি জমাতে জানতেন বাংলা ছবি যথারীতি ব্যবহার করতে পারল না
৩৬৫ দিন।।প্রয়াত মিঠু মুখার্জি। বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের এক উজ্জ্বল অভিনেত্রীর মৃত্যুতে শোকাহত চলচ্চিত্র জগৎ। সত্তরের দশকে বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রের জগতে নিজের সতেজ অভিনয় এবং মিষ্টি হাসিতে দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছিলেন মিঠু। স্বল্প চলচ্চিত্র জীবনে তার অভিনীত কিছু ছবি আজও সতেজ ও সবুজ রয়ে গিয়েছে। বাণিজ্যিক সিনেমার গণ্ডি পেরিয়ে সমান্তরাল ছবিতেও তার সাবলীল উপস্থিতি তৎকালীন ভারতীয় চলচ্চিত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।গত ১ বছর ধরে লড়ছিলেন ক্যানসারের সঙ্গে। রবিবার গভীর রাতে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৭১।
মর্জিনা আবদাল্লা থেকে মৌচাক
বেশ করেছি প্রেম করেছি করবই তো..১৯৭৪ সালে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের মৌচাক সিনেমার নীপা..সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা স্মার্টনেসে,একঢাল চুল, রোমান্টিক আবেদনের একটা তিল নিয়ে বাঙালি নিটোল মুখ, টানা টানা চোখের মিষ্টি ইশারায়,মিঠু মুখার্জি বাংলা ছবিতে সমান্তরাল স্থান করে নিলেন। উত্তমকুমার,সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়,রঞ্জিত মল্লিক অভিনীত মৌচাক,৫০ বছর পর,আজও জনপ্রিয়তা হারায়নি এতটুকু। যদিও বাঙালি দর্শকের কাছে, তিনি তখনও দীনেন গুপ্তর মর্জিনা। হায় হায় প্রাণ যায়, কিংবা মার ঝাড়ু মার/ঝাড়ু মেরে ঝেঁটিয়ে বিদেয় কর গানের দৃশ্যে অতুলনীয় নায়িকা। ১৯৭২ সালের মর্জিনা আবদল্লা ছবিতে মিঠুর উপস্থিতি ভোলা সম্ভব নয়। বৃদ্ধ মুস্তাফার সঙ্গে সোহাগের সংলাপ,শরীরী ভাষা, মিঠুকে বাংলা ছবিতে বড় জায়গা দিল। মৌচাক হিট করার পরেই সুনীল মুখোপাধ্যায়ের স্বয়ংসিদ্ধা। এবারেও সেই মৌচাকের জুটি। আবার হিট। ১৯৭৬ এ মহানায়কের সঙ্গে ,যাত্রিকের পরিচালনায় একটু অন্য স্বাদের ছবি হোটেল স্নো ফক্স। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নিশিকণ্যা ছবিতে মিঠুর বিপরীতে ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। মাঝে খান দশেক ছবি, চাঁদের কাছাকাছি, কবি,প্রতিভা, বন্ধন ইত্যাদি। এগুলো তেমন ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি। মৌচাক কিংবা মর্জিনা আবদুল্লা ছবির জনপ্রিয়তার কাছে সবই ম্লান। যদিও ততদিনে মিঠুকে নিয়ে, অন্য রকম ছবির ভাবনা ভেবে ফেলেছিলেন বাসু চ্যাটার্জী। সত্তরের দশকে হিন্দি বাণিজ্যিক ছবির ঘরানার বাইরে,ঋষিকেশ মুখার্জির মধ্যবর্তী পথে হাঁটছেন তিনি। অপরিচিত সাধারণ নেক্সট ডোর নায়ক, নায়িকা দিয়ে বাজিমাত করেছেন। সেই ফর্মুলায় রজনীগন্ধা সফল হওয়ার পরেই, মিঠুকে নিলেন বাসু চ্যাটার্জী। পরপর সফেদ ঝুট, দিল্লাগি এবং দো লড়কে দোনো কড়কে-তে দেখা যায় তাঁকে। দিল্লাগিতে শত্রুঘ্নের বিপরীতে ছিলেন মিঠু।তবে বাসু চ্যাটার্জী সঙ্গে ছবি করার কিছু আগেই কিন্তু হিন্দি ছবিতে পা রেখেছিলেন মিঠু। অফিসিয়ালি দুলাল গুহের খান দোস্ত ছিল তাঁর হিন্দি ছবিতে অভিষেক। শত্রুঘ্ন সিন্হার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ছিলেন রাজ কপূরও। স্বল্প দৈর্ঘ্যের মাত্র দেড় দশকের এই চলচ্চিত্র জীবনে বিভিন্ন ভাষার ছবিতে অভিনয় করেছেন। মিঠু কাজ করেছেন উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রঞ্জিত মল্লিক, শত্রুঘ্ন সিনহা, রাজ কপূর, বিনোদ মেহরা, নবীন নিশ্চল, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, অনুপকুমার, মহুয়া রায়চৌধুরী-সহ বাংলা ও হিন্দি ছবির বহু বিখ্যাত শিল্পীর সঙ্গে।
অন্তরালে চলে গেলেন মিঠু
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, যখন তাঁর ক্যারিয়ার বেশ ভালো ছন্দেই চলছিল, তখন আচমকাই রুপোলি পর্দা থেকে দূরত্ব বাড়াতে শুরু করেন মিঠু চক্রবর্তী। ধীরে ধীরে অভিনয় জগত থেকে পুরোপুরি বিরতি নিয়ে নেন এবং নিজেকে প্রচারের আলো থেকে দূরে সরিয়ে নেন। মিঠু মুখোপাধ্যায়ের শেষ ছবি ‘আশ্রিতা’। ছবিটি দর্শকের বিপুল সাড়া পেয়েছিল। অভিনয়ের পাশাপাশি এই ছবির প্রযোজকও ছিলেন অভিনেত্রী। এর পরেই মিঠু ক্রমশ গ্ল্যামার দুনিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। কভিড মহামারির সময় তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। দীর্ঘ পাঁচ বছর আমেরিকার বিখ্যাত ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্রে তার চিকিৎসা চলছিল। মিঠুর মৃত্যুর সংবাদে তার সঙ্গে অভিনয় করা দুই কিংবদন্তি শিল্পী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় এবং রঞ্জিত মল্লিক গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের মৌচাক ছবিতে প্রধান চরিত্রে ছিলেন সাবিত্রী ও উত্তমকুমার। মিঠু এবং রঞ্জিত জুটির প্রথম সাফল্য এই ছবিতেই। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় জানান, এখনও ওকে মনে পড়ে,সেদিন যখন ঢুলু বাবু মানে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় শুটিং ফ্লোরে ওকে নিয়ে এলেন। পা ছুঁয়ে প্রণাম করল উত্তমবাবুকে আর আমাকে। ঢুলু বাবু ওকে বললেন , শুধু আশীর্বাদ নয়,এনারা হলেন বাংলা ছবির অভিনয়ের ইনস্টিটিউট ,যতটা পারবি শিখে নিবি। ও শুটিং এর পরেও বসে থাকত,অনেক কিছু শুনত,জানত। অন্যদিকে রঞ্জিত মল্লিক মিঠুর সঙ্গে মৌচাক সফল হওয়ার পরে স্বয়ংসিদ্ধা এবং ভাগ্যচক্র দুটি ছবিতে অভিনয় করেন। অভিনেত্রীর মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তাঁর সহ-অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক। রঞ্জিত মল্লিক বলেন, এটা খুবই শকিং খবর। এটা মন থেকে মেনে নেওয়া খুব শক্ত হচ্ছে, কারণ আমাদের থেকে বয়সে অনেক ছোট। এরকম একটা খবর আমার কাছে আসবে, ভাবতেই পারেনি। একসঙ্গে কাজ করেছি, অসাধারণ অভিনেত্রী। স্বয়ংসিদ্ধাতে যা অভিনয় করেছিল, তা ভোলবার নয়। সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, ছায়া দেবীর সঙ্গে নিজের সমানভাবে ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে কাজ। উত্তমদার সঙ্গে কাজ করেছে মৌচাকে খুব ভাল। সেই দিনগুলোর কথা ভীষণভাবে মনে পড়ছে। ওর আত্মার শান্তি কামনা করা ছাড়া আর কিছুই বলার ভাষা নেই আমার।





