১০ জনে দুর্দান্ত লড়াই! মহমেডানকে হারিয়ে আট বছর পর চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগান

মোহনবাগান – ৩
মহমেডান – ২

৩৬৫ দিন। রোহন রায় চৌধুরী। যখন ইন্ডিয়ান সুপার লিগে অথবা ডুরান্ড কাপে মোহনবাগান বেশ কিছু সাফল্য পেত, কলকাতা লিগ নিয়ে তাদের মাথাব্যথা থাকত না। মূলত জুনিয়র ফুটবলারদের তুলে আনার প্লাটফর্ম হিসেবেই তারা এই লিগকে দেখত। সেটা ভুল ছিল এমন নয়। জুনিয়র ফুটবলারদের সাপ্লাই লাইন তৈরি করতে না পারলে ভবিষ্যতের ফুটবলার আসবে কি করে এই যুক্তি ছিল বাগানের। এই করে ২০১৮ সালের পর তারা কলকাতা লিগকে একবারও গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি। হলে হল, না হলে না হল- এরকমটাই ছিল তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। কিন্তু ঠেলায় পড়লে বিড়াল গাছে ওঠে। সম্প্রতি মোহনবাগানের সময়টা একদমই খারাপ চলছিল। সেই বছর ধরে আগে আইএফএ শিল্ড চ্যাম্পিয়ন হওয়া ছাড়া আর সাফল্য ছিল না তাদের। কয়েকদিন আগে ডুরান্ড কাপে ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে লজ্জাজনক চার গোলে হার তাদের আত্মবিশ্বাসটা আরো তলানিতে নিয়ে যায়। ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে ফুটবলার প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখাতে থাকে সমর্থকরা। সেটাই স্বাভাবিক। তাই এমন একটা কঠিন সময় সামনে কিছু না পেয়ে কলকাতা লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য টার্গেট নেয় মোহনবাগান। অবশেষে নিজেদের লক্ষ্যে তারা সফল। শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দীর্ঘ আট বছর পর আবার কলকাতা সেরা হল মোহনবাগান। ২০১৮ সালে শেষবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তারা। সেদিন নিজেদের মাঠে জয় সূচক গোলটা এসেছিল উগান্ডার স্ট্রাইকার হেনরি কিসেকার পা থেকে। আর এদিন এল লাল হলুদ জার্সি ছেড়ে সবুজ মেরুন জার্সি পড়া সায়ন ব্যানার্জীর হাত ধরে। সাহাল আব্দুল সামাদ এই ম্যাচে বাগানের হয়ে জোড়া গোল করেছেন। সায়নের গোল করার বলটাও বাড়িয়েছেন। কেরলের তারকা ফুটবলার আজ নিজের সেরা ছন্দে ছিলেন। তার চেয়েও বড় কথা মোহনবাগান এগিয়ে গিয়েছিল ২৭ মিনিটে। ছাঙতে ডান প্রান্ত থেকে মাপা বল বক্সে রাখলে সাহাল হেড করেন। এগিয়ে যায় মোহনবাগান। কিন্তু এরপর ডিফেন্সের ভুলে সমতা ফেরায় সাদাকালো। গোল করেন রেমসাঙ্গা। ক্রমে নাটক জমে ওঠে বারাসাত মাঠে। শুভাশিস বসুর ভুলে গোলরক্ষক দিপ্রভাত বল বাঁচাতে এগিয়ে আসেন। রেমসাঙ্গাকে জড়িয়ে ধরে ফেলে দেন বক্সের মধ্যে। পেনাল্টি দিতে দেরি করেননি রেফারি। সঙ্গে রেড কার্ড বাগান গোলকিপারকে। পেনাল্টি থেকে ব্ল্যাক প্যান্থার ব্রিগেডকে এগিয়ে দিলেন মোহিতোষ। কিয়ান, চাংতেকে তুলে নিয়ে সায়নকে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরিবর্ত গোলরক্ষক হিসেবে আসেন জাহিদ। তখনও খেলা শেষ হতে প্রায় আধঘন্টা বাকি। একজন কম, কিন্তু লড়াই থেকে সরে আসেনি বাস্তবের ছেলেরা। পাল্টা আক্রমণ চালায় মেরিনার্সরা। সন্দীপের একটা বলে হেড করে ২-২ করেন সামাদ। এই গোলটা হওয়ার পর মোহনবাগান শিবির বিশ্বাস করতে শুরু করে যেটুকু সময় আছে নিজেদের সবকিছু উজাড় করে দিলে তিন নম্বর গোলটাও এসে যাবে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। আবার সেই সন্দীপ একটা বল তৈরি করলেন। সাহাল একটু পিছিয়ে এসে রিলিজ করলেন সায়নের জন্য। বাঁদিক থেকে সায়ন বা পায়ের কোনাকুনি শটে জয় সূচক গোল এনে দিলেন।
মোহনবাগানের শাপমুক্তি ঘটল। এরপর অতিরিক্ত ছয় মিনিট মহমেডান চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বাগান রক্ষণে শুভাশিস, রাহুল, পরে নামা সাজি আর ভুল করেননি। লড়াই করলেন রবিলালও। রেফারি প্রতীক মন্ডলের শেষ বাঁশি বাজতেই গ্যালারিতে উৎসব শুরু হয়ে গেল। আবেগের বিস্ফোরণ সঙ্গে সবুজ মেরুন আবির আর স্মোক বোম্ব। কঠিন সময়ের মধ্যে থাকা একটা দল অনেকটাই অক্সিজেন পাবে এই লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়ে। কিন্তু মোহনবাগানের ফিটনেস এবং খেলার এখনও অনেক উন্নতি প্রয়োজন সেটা বোঝা গেল প্রতিপদে। সাফল্যের দিনে নিজেদের দুর্বলতা গুলো প্রেস বক্স থেকেই দেখলেন সিনিয়র দলের কোচ পানোস। সামনে শিল্ড, তারপর আইএসএল। দলের উন্নতির ক্ষেত্রে কিছুটা কাজ এখনও বাকি তার। বাস্তব রায়ের চোখে জল দেখা গেল খেলার শেষে। শেষ কয়েকদিন তার ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু দলকে আগলে রেখেছিলেন তিনি। তিনি জানতেন সাফল্য দিলে সব ভালো, না দিলে গালাগালি হজম করা পুরনো নিয়ম ময়দানের। এটা খেলোয়াড় জীবনেও দেখেছেন, কোচিং জীবনেও সাক্ষী রইলেন।

Scroll to Top