৩৬৫ দিন। একসময় ভারতের জঙ্গল থেকে পুরোপুরি মুছে গিয়েছিল চিতাদের অস্তিত্ব। দীর্ঘ কয়েক দশক পার করে, আফ্রিকার আকাশপথ ধরে চিতা ফিরিয়ে এনে শুরু হয়েছিল হারানো ঐতিহ্যকে আবার ভারতের বুকে জাগিয়ে তোলার ইতিহাস। আর সেই প্রজেক্ট চিতা চার বছর পূর্ণ করার ঠিক পরদিনই কুনো ন্যাশনাল পার্ক থেকে এলো এক অভাবনীয় খুশির খবর! ভারতে জন্ম নেওয়া চিতা ‘কেজিপি১২’ নিজেই জন্ম দিল চারটি ফুটফুটে বাচ্চার!দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসা চিতা ‘গামিনি’র মেয়ে এই কেজিপি১২। ভারত থেকে চিতা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার এত বছর পর, বিদেশের মাটি থেকে চিতা এনে যে লড়াই শুরু হয়েছিল—আজ ভারতের মাটিতেই তাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম বংশবৃদ্ধি করায় সফলতার নতুন অধ্যায় রচিত হলো!সোশ্যাল মিডিয়ায় এই আনন্দের খবর শেয়ার করে কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী ভূপেন্দর যাদব লিখেছেন, “প্রজেক্ট চিতার জন্য এটি একটি সত্যিই ঐতিহাসিক এবং আনন্দের মুহূর্ত! ভারতের চিতা প্রজেক্ট চার বছর পূর্ণ করার ঠিক একদিন পরেই ভারতে জন্মগ্রহণকারী চিতা কেজিপি১২ কুনোতে চারটি বাচ্চার জন্ম দিয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “চার বছর, চারটি নতুন জীবন—আশা, লড়াই আর ভারতের চিতা সংরক্ষণের ক্রমবর্ধমান সাফল্যের এক সুন্দর প্রতীক!”এই চার খুদে সদস্যের আগমনে ভারতে চিতার মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬-এ, যার মধ্যে ৩৬টি চিতাই ভারতের মাটিতে জন্ম নিয়েছে! বর্তমানে কেবল কুনো ন্যাশনাল পার্কেই রয়েছে ৫৩টি চিতা, আর বাকি ৩টি রয়েছে গান্ধী সাগর অভয়ারণ্যে।এই খবরটা আলাদা করে কেন এত রোমাঞ্চকর জানেন? কারণ কেজিপি১২ নিজে কিন্তু আফ্রিকা থেকে আসেনি, সে নিজেই এই পুনর্বাসন কর্মসূচির ফলে ভারতের কুনোর মাটিতে জন্মেছিল। আর আজ সেই ভারতে জন্মানো চিতা নিজেই মা হয়ে বংশবৃদ্ধি করছে! অর্থাৎ আফ্রিকা থেকে আনা চিতারা যে কেবল এখানকার পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিয়েছে তা নয়, বরং তারা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে নিজেদের বংশ ছড়িয়ে দিতে শুরু করেছে।উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর নামিবিয়া থেকে ৮টি চিতা এনে ভারতে শুরু হয়েছিল স্বপ্নের ‘প্রজেক্ট চিতা’। এরপর ২০২৩-এর ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ১২টি এবং পরে বতসোয়ানা থেকে আরও ৯টি চিতা আনা হয়। সুদূর আফ্রিকা থেকে চিতা এনে শুরু হওয়া এই অভিযান আজ ভারতের নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার দিকে এগোল। কেবল সংখ্যার নিরিখে নয়, ভারতে চিতার স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার যে দীর্ঘমেয়াদী স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, কেজিপি১২-এর এই চার ছানা যেন সেই স্বপ্নের পথেই সবচেয়ে বড় আশার আলো!
২ পুরুষ চিতার বিরল বন্ধুত্ব
দক্ষিণ আফ্রিকার সাবি স্যান্ডস গেম রিজার্ভের হেয়ারি-বেলি, গুজরাতের গির জাতীয় উদ্যানের জয়-বীরু কিংবা মধ্যপ্রদেশের বান্ধবগড় ব্যাঘ্র প্রকল্পের দাউ-বলরাম। প্রকৃতিতে বিড়াল গোত্রের পুরুষ প্রাণীদের সখ্যের বিরল উদাহরণ হিসাবে উঠে আসে ওই সিংহ এবং বাঘ জুটিদের কথা। এ বার সেই তালিকায় জুড়ে গেল আফ্রিকা থেকে কুনো জাতীয় উদ্যানে নিয়ে আসা দুই পুরুষ চিতা— কেএনজি২৩ এবং সিসিবি৪।বেশ কয়েক মাস ধরেই ওই দুই পুরুষ চিতাকে কুনোর প্রান্তরে এক সঙ্গে ঘুরতে দেখছেন মধ্যপ্রদেশ বনবিভাগের কর্মীরা। একই সঙ্গে শিকার করতে এবং ভাগাভাগি করে খেতে দেখা গিয়েছে তাদের। সাধারণ ভাবে বিড়াল গোত্রের পুরুষেরা এলাকার দখলদারি কায়েমের বিষয়ে খুবই সচেতন। বাঘ, সিংহ, চিতাবাঘ বা চিতাদের ক্ষেত্রে বাবা-ছেলে, ভাই-ভাই সংঘাত এমনকি প্রাণহানিও স্বাভাবিক ঘটনা। হেয়ারি-বেলি বা দাউ-বলরাম জুটি এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। যদিও তারা একই বংশের প্রতিনিধি। কিন্তু কেএনজি২৩ এবং সিসিবি৪-এর বংশ পুরোপুরি আলাদা। তাদের মধ্যে জিনগত কোনও মিলও নেই।গত বছরের মার্চ মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আনা নির্বা নামের একটি চিতার গর্ভে জন্ম নিয়েছিল কেএনজি২৩। তার চেয়ে সাত-আট মাসের বড় সিসিবি৪-কে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আফ্রিকারই বৎসোয়ানা থেকে কুনোয় নিয়ে আসা হয়েছিল। চলতি বছরের গোড়ায় চোট পাওয়া কেএনজি২৩-কে বনকর্মীরা চিকিৎসার প্রয়োজনে মা ও ভাই-বোনেদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে জঙ্গল থেকে ধরে এনে একটি এনক্লোজ়ারে রেখেছিলেন। পাশের এনক্লোজারেই রাখা হয়েছিল সিসিবি৪-কে। সে সময়ই তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে বলে কুনোর কয়েক জন বনকর্মী জানিয়েছেন।কুনো জাতীয় উদ্যানের ডিরেক্টের উত্তমকুমার শর্মা বলেন, “এটি একটি অত্যন্ত বিরল ঘটনা যেটি বিশেষ ভাবে আকর্ষণীয় তা হল, এরা দু’জন পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কহীন পুরুষ চিতা, যাদের বয়সের পার্থক্য প্রায় ছ’-সাত মাস। তবুও তারা একে অপরের সঙ্গে মিলে একটি জোট গঠন করেছে। আফ্রিকার সাভানা তৃণভূমিতে দুই পুরুষ চিতার জুটির উদাহরণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন উত্তম। কিন্তু সেগুলি প্রায় সবই দু’ভাইয়ের জোট। তাদের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা একই সঙ্গে। কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশ থেকে আসা পৃথক বংশের দুই চিতার এমন মৈত্রী নজিরবিহীন বলে জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু কেন কুনোয় এসে এ ভাবে জোট বানাল কেএনজি২৩ এবং সিসিবি৪? বন্যপ্রাণ গবেষকদের একাংশ বলছে কুনোর তৃণভূমির বাসিন্দা আর এক প্রবলতর প্রতিপক্ষ চিতাবাঘের (লেপার্ড) হাত থেকে বাঁচতেই দুই পুরুষ চিতার এমন অভিনব মৈত্রী।
প্রসঙ্গত ২০২২ সালে নরেন্দ্র মোদীর উদ্যোগে শুরু হয় প্রোজেক্ট চিতা। ২০২২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী মধ্যপ্রদেশের কুনো জাতীয় উদ্যানের জঙ্গলে ৮টি নামিবিয়ার চিতা ছেড়ে ভারতের মাটিতে চিতার পথচলা শুরু করেন।এরমধ্যে শেষপর্যন্ত ৩টি বেঁচে যায়। তাদেরই ২২টি সন্তানসন্ততি কুনোতে তাদের দাপট বাড়াতে থাকে। এদিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেমন ভারতে চিতার জন্ম হতে থাকে, তেমনই আফ্রিকা থেকেও চিতা আনা অব্যাহত থাকে।
এই প্রকল্প ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালে তার ৪ বছর পূর্ণ করল। মাত্র ৪ বছর হল ভারতের মাটিতে চিতার বসবাস শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই তারা ৫৬-তে এসে ঠেকেছে।৪ বছরে শূন্য থেকে ৫৬, ৪ বছরের মধ্যে হাফ সেঞ্চুরি। এটাকে বড় সাফল্য হিসাবেই দেখছেন পশু বিশেষজ্ঞেরা। অবশ্য এরমধ্যে ২০টি আফ্রিকার একাধিক দেশ থেকে এখানে আনা হয়েছে। বাকি ৩২টি ভারতেই জন্মেছে। এখানেই বড় হয়েছে বা হচ্ছে।৫৬ টি চিতার মধ্যে ৪৯টি চিতাই রয়েছে কুনো জাতীয় উদ্যানে। কেবল ৩টি চিতা রয়েছে মধ্যপ্রদেশেরই গান্ধী সাগর অভয়ারণ্যে। এদিকে চিতা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগামী দিনে দেশের নানা প্রান্তের অভয়ারণ্যে চিতা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা এখন বাস্তবায়িত হওয়ার অপেক্ষায়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রজেক্ট চিতার বড়ো সাফল্য
কুনোয় জন্মানো চিতা এই প্রথম মা হল, প্রসব ৪ শাবকের
দেশে চিতার সংখ্যা বেড়ে ৫৬


