৩৬৫ দিন। সায়ন্তী অধিকারী। বেহালা বিমানবন্দরে হেলিকপ্টার শুধু নয় যাত্রীবাহী বিমান চালানোর উদ্যোগ নিচ্ছে রাজ্য সরকার। বুধবার এই বিমানবন্দর পরিদর্শনে যান বেহালা পশ্চিমের বিধায়ক তথা রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ।এদিন মন্ত্রীর সঙ্গে এয়ারপোর্ট অথিরিটির আধিকারিক এবং রাজ্য সরকারের ভূমি সংস্কার দফতরের আধিকারিকরাও ছিলেন।পরিদর্শন করার পর মন্ত্রী জানান,দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই বেহালায় বিমানবন্দর চরম অবহেলায় পড়ে রয়েছে।ওয়াল ভেঙ্গে অনেকে জবরদখল করেও বসে আছে। সে কারণেই দীর্ঘদিন এখানে প্লেন ওঠানামা করতে পারেনি। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছি এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব খুব আগ্রহী বেহালা বিমানবন্দর সচল করতে।যাত্রীবাহী প্লেন চালানোর ব্যবস্থা করা হবে।যাতে চলাফেরা করতে পারে সে ব্যবস্থা করব।এদিন তারই প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়েছে।তাঁর বক্তব্য, এই বিমানবন্দর চালু হলে দক্ষিণ কলকাতা-সহ ডায়মন্ড হারবার, সুন্দরবন এলাকার মানুষের যাতায়াতের সুবিধা হবে এবং আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগে গতি আসবে। এই বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে একটি বিশেষ চিঠিও দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন বলেও জানান ইন্দ্রনীল খাঁ।তিনি জানানএই বিমানবন্দরে ৯১৫ মিটার দীর্ঘ রানওয়ে রয়েছে, যা এটিআর-৭২ প্যাসেঞ্জার বিমান, এয়ার অ্যাম্ব ুল্যান্স ও ছোট চার্টার্ড ফ্লাইটের জন্য উপযুক্ত। বেহালা বিমানবন্দরটি চালু হলে কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উপর চাপ কমবে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও দক্ষিণবঙ্গে পর্যটন, ব্যবসা এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত যাতায়াতও সহজ হবে বলে মত শহরবাসীর। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে রয়েছে বেহালা বিমানবন্দর। প্রসঙ্গত,কয়েকমাস আগে দিল্লিতে বৈঠক করেন বেহালা পশ্চিমের বিধায়ক তথা রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা দক্ষিণ কলকাতার বেহালা বিমানবন্দর ফের সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।কলকাতার শিল্প উন্নয়ন ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার
বিকাশ, আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা মজবুত করা, জরুরি চিকিৎসায় যাতে বিমান পরিষেবা দেওয়া যায় এবং পশ্চিমবঙ্গে পর্যটন ও বাণিজ্যে গতি আনার লক্ষ্যে বেহালা বিমানবন্দরটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ,এদিন সে কথাও জানান তিনি।
বেহালা ফ্লাইং ক্লাবের ইতিহাস ও বাণিজ্যিক বিমান পরিষেবার বাস্তবতা
বেহালা ফ্লাইং ক্লাবের সঙ্গে কলকাতার বিমান চলাচলের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। মূলত বিমান প্রশিক্ষণ, ছোট বিমানের ওঠানামা এবং প্রশিক্ষণমূলক উড়ানের কথা মাথায় রেখেই বেহালা বিমানক্ষেত্রের পরিকাঠামো গড়ে উঠেছিল। ফলে শুরু থেকেই এটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক বিমানবন্দর হিসেবে পরিকল্পিত ছিল না।
ক্যামেলিয়া এয়ার গ্রুপের উদ্যোগে বিমান প্রশিক্ষণ:
ক্যামেলিয়া এয়ার গ্রুপ বেহালা ফ্লাইং ক্লাবের হ্যাঙ্গার ভাড়া নিয়ে তিনটি ছোট সেসনা বিমান দিয়ে বিমান প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান চালু করেছিল। সেই সময় বেহালা থেকে ছোট বিমানের উড্ডয়ন এবং বিমান প্রশিক্ষণের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর ফলে ছোট বিমান পরিচালনা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেহালা বিমানক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছিল।
শান্তিনিকেতন ও দিঘায় চপার পরিষেবা চালুর চেষ্টা
তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের প্রথম দিকের সময়ে পরিবহণ দপ্তরের উদ্যোগে বেহালা থেকে শান্তিনিকেতন ও দিঘার উদ্দেশ্যে চপার পরিষেবা চালু করা হয়েছিল। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে সেই পরিষেবা সফল হয়নি। যাত্রী চাহিদা এবং আর্থিকভাবে পরিষেবাটিকে টেকসই করে তোলা সম্ভব না হওয়ায় পরবর্তীকালে সেই পরিষেবা বন্ধ করে দিতে হয়।
সিনেমার প্রমোশন
২০১৪ সালে ‘জাতিস্মর’ সিনেমা মুক্তির আগে সিনেমার প্রমোশনের জন্য পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় এবং মূল অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এই বেহালা বিমানবন্দর থেকে শান্তিনিকেতন গিয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা নিজের ব্লগেই লিখেছিলেন—জাতিস্মরের মুক্তি আর বেশি দূরে নয়। তাই আমরা সকলেই ছবির প্রচারে পুরোপুরি ব্যস্ত। গতকাল আমি এবং আমার পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় এমন একটি কাজ করেছি, যা চিরকাল আমাদের স্মৃতিতে সতেজ হয়ে থাকবে।
ডুমুরজলায় তৈরি হয় পৃথক হেলিপ্যাড
পরবর্তীকালে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে মুখ্যমন্ত্রীর যাতায়াত আরও নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে হাওড়ার ডুমুরজলায় পৃথক হেলিপ্যাড তৈরি করা হয়। ফলে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতের ক্ষেত্রে বেহালা বিমানক্ষেত্রের উপর নির্ভরতা কমে যায়। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রীর যাতায়াতের জন্য বেহালা বিমানক্ষেত্র নিয়মিত ব্যবহার করা হয়নি।
বেহালা থেকে নিয়মিত বাণিজ্যিক বিমান পরিষেবা
বাণিজ্যিক বিমান চালাতে বড়সড় পরিবর্তন জরুরি। বেহালা থেকে নিয়মিত বাণিজ্যিক ও যাত্রীবাহী বিমান পরিষেবা চালু করতে হলে বর্তমান পরিকাঠামোর উপর নির্ভর করে তা করা সম্ভব নয়। এর জন্য রানওয়ের সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিমানবন্দরের সামগ্রিক পরিকাঠামোতে বড়সড় পরিবর্তন আনতে হবে।
নিয়মিত যাত্রীবাহী বিমান পরিষেবা চালু হলে যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা, যাত্রী টার্মিনাল, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিমান দাঁড় করানোর পরিকাঠামো, প্রবেশ ও বেরোনোর ব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবার ব্যাপক উন্নয়ন করতে হবে।
অর্থাৎ, শুধু রানওয়ে ব্যবহারযোগ্য করলেই নিয়মিত বাণিজ্যিক বিমান পরিষেবা চালু করা সম্ভব নয়। ফ্লাইং ক্লাবের জন্য তৈরি, পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর হিসেবে নয়—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বেহালা বিমানক্ষেত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল ফ্লাইং ক্লাবের কার্যক্রম ও বিমান প্রশিক্ষণ।
এটি শুরু থেকেই নিয়মিত যাত্রীবাহী ও বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের জন্য তৈরি পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর নয়। তাই ভবিষ্যতে বেহালাকে নিয়মিত বাণিজ্যিক বিমানবন্দর হিসেবে ব্যবহার করতে হলে রানওয়ে থেকে শুরু করে যাত্রী পরিষেবা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক পরিকাঠামোকেই নতুন করে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন করতে হবে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতাই বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—বেহালা থেকে অতীতে ছোট বিমান পরিচালনা এবং চপার পরিষেবা চালুর অভিজ্ঞতা থাকলেও তা নিয়মিত বাণিজ্যিক বিমান পরিষেবায় পরিণত হয়নি।


