৩৬৫ দিন।সৌগত সরকার। অন্তত ৩০ বছর আগে কেওনঝড় রিজার্ভ ফরেস্টের লং সাহেবের বাংলোতে যারা রাত কাটায়নি, তাদের পক্ষে এই ঘটনা বোঝা শক্ত। ২০০৭ সাল অব্দি এই লং সাহেবের বাংলোর মালিকানা ছিল তাদের পরিবারের হাতে। কটকের মুসুদ্দি পরিবার ছিল তাদের কেয়ারটেকার। ফলে বুকিং করতে গেলে ওড়িশা ট্যুরিজম দিয়ে হবে না। কলেজের এক বন্ধুর বাবা দীর্ঘদিন উড়িষ্যায় পোস্টিং ছিলেন। তার কাছ থেকে নম্বর জোগাড় করে চিঠি মারফত, তিন মাস আগে বুকিং করতে হতো। আশ্চর্যের বিষয় বর্ষাকাল হল এই বাংলায় ঘুরতে যাওয়ার আদর্শ সময়, যদি ভূতে বিশ্বাস এবং অবিশ্বাস দুই সঙ্গে থাকে। এখন কেওন ঝড় স্টেশন হয়ে গিয়েছে, তখন রেল গাড়ি যেত হাওড়া থেকে নারানপুর স্টেশন পর্যন্ত। নির্জন সে স্টেশনে কোন স্টেশন মাস্টারও নেই। বালির বস্তা সাজিয়ে ফেনা জওয়ানরা একে ৪৭ বাগিয়ে আছে। ৯ দশকে শুরুতে উড়িষ্যার এই জঙ্গল থেকে সিমলিপাল সেখান থেকে ঝাড়খণ্ড বিহার হয়ে পুরো জঙ্গল টাই ছিল মাওবাদীদের করিডোর। একটা লর ঝরে জিপ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল, যেটা আমাদের আড়াই ঘণ্টা জঙ্গলের পথ দিয়ে লং সাহেবের বাংলোর সামনে নামিয়ে সন্ধে নামার আগেই পেছন ঘুরে শহরের দিকে চলে গেল। কেওনঝড়ের জঙ্গলে এক অলৌকিক সন্ধ্যা ও সেই অভিশপ্ত ‘লং সাহেবের বাংলো’ নিয়ে গল্প তো অনেক শুনেছিলাম, কিন্তু সেখানে যে এমন একটা রাত আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে, তা কে জানত! বনের বুক চিরে যখন বিকেল নেমে এল, বাংলোর কাঠের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমরা তখন ঝিঁঝিঁ পোকার প্রথম ডাক শুনছিলাম। ব্রিটিশ আমলের সেই দুই কামরার বাংলো। এক শতাব্দী প্রাচীন কাঠের গন্ধ, চিমনি আর শ্যাওলা ধরা পাথুরে দেওয়াল জুড়ে এক থমথমে ইতিহাস। দুই রুমের মধ্যে একটা আমাদের বুকিং ছিল, অন্যটা ফাঁকা। বনকর্মী সনাতন বাবু ফিসফিস করে বলেছিলেন, “বাবু, অন্য ঘরটা ফাঁকাই থাকে। কেউ বড় একটা সাহস করে না।”
ঠিক তখনই, সন্ধে নামার মুখে, জঙ্গলের লাল ধুলো উড়িয়ে একটা লাল বুইক গাড়ি এসে থামল বাংলোর সামনে। আবছা আলোয় দেখলাম, গাড়ি থেকে নামলেন তিন ভদ্রমহিলা। একজন মাঝ বয়সি বাকি দুজন একটু বয়স্ক। কেয়ারটেকার এর সঙ্গে উত্তেজিতভাবেই তাদের কথাবার্তা চলছে। ভেতর থেকে শুনতে পাচ্ছি। আমি লন্ডনে চিঠি পাঠিয়েছি, উত্তর পাইনি। ২বছরে অন্তত একবার আসি, ঘর পাবো না এটা হতে পারে না।
কলকাতা থেকে একটানা চারশো কিলোমিটার ড্রাইভ করে এসছি। মুসুদ্দি আপ্রাণ বোঝানোর চেষ্টা করছে দুটো ঘরের মধ্যে সে একটি ঘর দিতে পারে যেটি সিঙ্গল বেড, কিন্তু অন্যটি আমরা বুক করে এসেছি। আমরা এগিয়ে যাই। কলকাতা থেকে এত দূর এসেছেন তিনজন মহিলা, বুকিং এর জন্যই রাত্রি রাত বিরতি জঙ্গলে কোথায় যাবেন? ততক্ষণে তারা পাথরের বারান্দার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। পাথরের দেয়ালে ঝোলানো হ্যাজাকের আলোয় খানিকটা স্পষ্ট হচ্ছে তাদের চেহারা।
আমরা স্তম্ভিত! পরনে রুচিশীল তাঁতের শাড়ি, চেহারায় ,কথাবার্তা আধুনিক তিন মহিলা। কিন্তু সবচেয়ে বড় চমকটা অপেক্ষা করছিল তৃতীয়জনের দিকে তাকিয়ে।তিরিশ-চল্লিশের দশকের বাংলা সিনেমার সেই মায়াবী মুখ, রূপোলি পর্দার সেই চিরন্তন আভিজাত্য—স্বয়ং কেতকী দত্ত! বাংলা ছবির স্বর্ণযুগের সেই কিংবদন্তি অভিনেত্রী সশরীরে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে। শিশির কুমার ভাদুড়ীর ছাত্রী, কবিতাব্রত দত্তের এন্টনি কবিয়াল,রঙ্গ মঞ্চের একদা সাহসিনী, সেই কেতকী দত্ত। নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে, ঋত্বিক ঘটকের নাগরিক,কোমল গান্ধার, হসপিটাল ছবির সেই কেতকী দত্ত। ১৪ টি পালায় পঞ্চাশটিরও বেশি গানে সুনাম অর্জন করা কেতকী দত্ত।
বিশ্বাস হচ্ছিল না নিজেদের চোখকে।
জানতে পারলাম, ভুল বোঝাবুঝির কারণে তাঁদের বুকিংটা বাতিল হয়ে গেছে। এই গভীর জঙ্গলে, যেখানে চারদিকে হাতির উপদ্রব আর লং সাহেবের অলৌকিক ছায়ার গল্প ঘোরে, সেখানে এই তিন প্রবীণাকে ফিরিয়ে দেওয়া অসম্ভব। মুহূর্তের মধ্যে আমরা নিজেদের ঘরটা তাঁদের ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। লং সাহেবের ভূত বা বনের বাঘ—কোনো কিছুরই তখন আর গুরুত্ব ছিল না আমাদের কাছে। আমাদের চোখের সামনে তখন জীবন্ত ইতিহাস!রাত বাড়ল। চারদিকের জঙ্গল যেন এক নিচ্ছিদ্র অন্ধকারের চাদরে ঢাকা পড়ে গেল। জিপের ব্যাটারির আলো আর লণ্ঠনের টিমটিমে শিখায় বাংলোর উঠোনে বসল আমাদের আসর। আমরা ঠিক করেছিলাম, ঘরের মায়া ত্যাগ করে এই খোলা আকাশের নিচেই, আদিম বনের বুকে রাত কাটিয়ে দেব।
আর সেই রাত আমাদের ফিরিয়ে দিল এক পরম সম্পদ।কোনো বাদ্যযন্ত্র নেই, কোনো মাইক্রোফোন নেই—চারপাশে শুধু কেওনঝড়ের ঘন কালো জঙ্গল, আর তার মাঝে খালি গলায় গাইতে শুরু করলেন কেতকী দেবী।”তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী, আমি অবাক হয়ে শুনি, কেবল শুনি…”গভীর, মায়াবী আর প্রগাঢ় সেই কণ্ঠস্বর যখন শাল-মহুয়ার পাতার ফাঁক দিয়ে বনের অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়ছিল, আমাদের মনে হচ্ছিল আমরা কোনো এক অন্য জগতে চলে গেছি। বনের বাতাস থমকে গিয়েছিলঝিঁঝিঁ পোকারা যেন গান থামিয়ে দিয়েছিল। সাঙ্ঘাতিক এক সম্মোহন! লং সাহেবের সেই ভৌতিক বাংলোর বারান্দার পুরনো ইজিচেয়ারটা অন্ধকারেই মৃদু দুলছিল—হয়তো কোনো অদৃশ্য সাহেব ফরেস্ট অফিসারও থমকে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন বাংলার সেই স্বর্ণযুগের সুর।গান থামল যখন, তখন রাত দুটো। কেতকী দেবী হাসলেন, সেই চিরপরিচিত সিনেমার পর্দার হাসি। বললেন, “তোমাদের এই ঋণ আমি শোধ করতে পারব না ভাই।” আমরা মনে মনে হাসলাম। এক রুমের বদলে যা আমরা পেয়েছিলাম, তা কোনো টাকা বা বুকিং দিয়ে কেনা যায় না।ভোরবেলা যখন কুয়াশা ভেদ করে সূর্য উঠল, গাড়ির স্টার্ট দেওয়ার শব্দে আমাদের ঘুম ভাঙল। আমাদের বিদায় জানিয়ে তাঁদের গাড়িটি বনের রাস্তায় মিলিয়ে গেল। লং সাহেবের বাংলো আজও আছে, তার ভৌতিক বদনামও হয়তো আছে, কিন্তু আমাদের কাছে কেওনঝড়ের সেই জঙ্গল আজও কেতকী দত্তের খালি গলার সেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরে মায়াময় হয়ে বেঁচে আছে।
লং সাহেবের ভুতুড়ে বাংলোয়
কেতকী দত্তের গলায়
তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী..
- khabar365din
- September 2, 2026
- 2:59 pm
- No Comments




