মুর্শিদাবাদের জনসভা থেকে মহানেত্রীর মহাগর্জন

গলা কেটে নিলেও ডিটেনশন ক্যাম্প করতে দেব না

৩৬৫ দিন। মুর্শিদাবাদ। আমি বীরভূমে জন্মেছিলাম। নয় তো আমায়ও বাংলাদেশী বলত। ছিন্নমূলদের আমি সম্মান করি। আমার গলা কেটে দিলেও ডিটেনশন ক্যাম্প করব না। তাড়াব না। বিজেপি ভাল করে জেনে রাখো কাউকে পুশব্যাক করা হবে না। এভাবেই আজ মুর্শিদাবাদের জনসভা থেকে কেন্দ্রীয় সরকার এবং ভাজপাকে খোলা হুঁশিয়ারি দিলেন মমতা। ভারতীয় জনতা পার্টির নেতারা যেভাবে বাংলায় রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের জন্য বাংলার সরকারের উপরে দায় চাপাতে শুরু করেছে তার প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা আমরা কীভাবে নিয়ে আসব? মিজোরাম-মণিপুর দিয়ে ঢুকবে? বর্ডারে বিএসএফ, আইটিবিপি এরা সব কেন্দ্রের। ভিতরে ভিতরে যোগাযোগ রাখবে।
মুর্শিদাবাদ থেকে মমতা বলেন,
মুর্শিদাবাদের মানুষ অশান্তির রাজনীতির পছন্দ করেন না। মাঝে ধুলিয়ানে একটা ঘটনা ঘটেছিল। তবে আমি চলে এসেছিলাম। এরপর জঙ্গিপুরে একটা ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল সেইসময় ফোনে বলেছিলাম জাকিরদের, তোমরা হিন্দুদের রক্ষা করো। এটাই নিয়ম। মেজরিটিরা মাইনরিটিদের রক্ষা করবে। সব ধর্মেই কিছু গদ্দার থাকে। কেউ কেউ টাকা খেয়ে বিজেপির তাঁবেদারি করে। বাংলাকে দমন করতে পারছিল না বলে রাজধানী স্থানান্তরিত করেছিল। মুর্শিদাবাদ জেলার মানুষ দাঙ্গা পছন্দ করে না। অনেক সময় আমরা অনেক বড় বড় দাঙ্গা দেখলেও, মর্শিদাবাদের মানুষ কিন্তু দাঙ্গার রাজনীতি করেন না। বাবা সাহেব আম্বেদকর নির্বাচিত হন বাংলা থেকে। এটা গর্ব। গান্ধিজী গুজরাটে জন্মগ্রহণ করলেও বাংলায় পড়ে থাকতেন। এটাই বাংলা। কয়েকদিন আগে দেখলাম, রাজ্যসভা থেকে নোটিফিকেশন দিয়েছে, বন্দে মাতরম গান গাওয়া যাবে না। ওয়াকফ নিয়ে যে যা প্রচার করুক কান দেবেন না। নির্দলদের ভোট দেবেন না। নিজের ভোট নিজে তুলবেন। কেউ কেউ বলছে সংখ্যালঘুদের ভোট কেন উঠবে? বেশ করবে উঠবে। এখানে রোহিঙ্গা নেই। রোহিঙ্গা বাংলাদেশ, অসমে আছে। বাংলা হৃদয়ের ভাষা। এসআইআর এর নামে ভয় পাবেন না। শুধু নিজেদের কাগজগুলো ঠিকমতো জমা দিন। ওরা টাইম বেছে নিয়েছে। যদি না করতে দিতাম। তাহলে ভোট না করে রাষ্ট্রপতি শাসন করত। বুঝেছেন অমিত শাহের চালাকিটা? আমরা অত বোকা নই বাবুমশাই, গোদিভাই। আমরা করব, করে দেখাব। আমরা লড়ে দেখাব। আমাদের ভাতে মারা যাবে না। সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া যাবে না।
নিশ্চিন্তে থাকুন আপনাদের নিরাপত্তা অধিকার সুরক্ষিত। কেউ বিতাড়িত হবেন না। আর বিতাড়িত হলে মৎস্যজীবীদের যেমন ফিরিয়ে আনি তেমনই সকলে আনব। গত কয়েকদিন কিছু দুষ্কৃতী গুজব ছড়াচ্ছে, কাটেক্টরে খাতিয়ান নম্বর ১ এ ধর্মীয় স্থানগুলো মসজিদ কবরস্থান নথিভুক্ত করা হয়েছে। এটা মিথ্যা কথা। সব ধর্মে গদ্দার থাকে। কিছু কুলাঙ্গার থাকে, যারা বিজেপির টাকা খেয়ে মিথ্যা প্রচার করে। এআই দিয়ে এই সব করা হচ্ছে। বিজেপির অনেক টাকা, নোটবন্দির টাকা, চুরি-ডাকাতির টাকা। যাঁরা সাম্প্রদায়িকতার রক্তের হোলি খেলছেন, তাঁরা সতর্ক থাকবেন। ছানাবড়া জিআই প্রোডাক্ট পেয়েছে পরশু দিন। আমি গর্বিত। আমাদের সময়ে প্রায় ৪০টা হয়ে গেল। সাগরদিঘি তাপবিদ্যুত কেন্দ্রে ৬৬০ মেগাওয়াট সুপার ইউনিট পাওয়ার করছি। এটা রাজ্যে সব থেকে বড়। ২০১৭ সালে ঘোষণা করেছি, আজ সম্পূর্ণ হয়েছে। এখান থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে ১০ ডিসেম্বর থেকে। ২৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। ভাঙন এখানে সমস্যা। প্রকৃতি আমাদের হাতে নেই। এটা কেন্দ্রের অধীনে ছিল, গঙ্গাভাঙন রোধ ও বন্যার জল নিয়ন্ত্রণ। ফরাক্কায় ড্রেজিংয়ের কথা হয়েছিল। ৭০০ কোটি দেবে বলেছিল। তা দেয়নি। আমরাও করতে পারি না। ওরাও করে না। তাই মানুষের সমস্যা হয়। গ্রামের অনেক বাড়িতে জল পৌঁছে দিয়েছি। আরও কাজ চলছে। টাকার সংস্থান করতে পারলে আরও করে দেব।
এসআইআর ইস্যুতে
এসআইআর-এ ৪০ জন মারা গিয়েছেন। তাঁদের ২ লক্ষ টাকা দেব। হাসপাতালে যাঁরা আছেন তাঁদের ১ লক্ষ করে দেওয়া হবে। বিহারে গোদী সরকার বেছে ভোটের আগে ১০ হাজার দিল। আর যেই ভোট চলে গেল দিল বুলডোজার। হাজার মানুষকে উৎখাত করল। আপনাদের চিন্তা নেই, লক্ষ্মীর ভান্ডার পাবেন। কারও কটু কথায় পা দেবেন না। এখনও ৬ মাস বাকি আছে ভোটের। মানুষকে টাকা দেয় না উন্নয়নের জন্য। অথচ সরকার যাতে কাজ না করতে পারে তার জন্য ছমাস আগে এসআইআর করছে। আমি সব ধর্মকে সম্মান করি। মানুষের অধিকার কাড়লে মানব না…মানব না…মানব না। বাংলায় কথা বললে বাংলাদেশি? ওদের ভাষা এক আমাদের এক। এটা তো ঐতিহাসিক কারণে। বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক ভাষা। সোনালী খাতুনের জন্য সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছি। উনি গর্ভবতী মা। কেস করে বলেছি ফিরিয়ে আনতে হবে। পরিযায়ী শ্রমিকরা বাংলার বাইরে গেলে অত্যাচার করছে। বিজেপি বাংলা বিদ্বেষী। তাই জন্য বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, রাজা রামমোহনকে অসম্মান করেন। আর আপনাদের বলি, বাংলায় কোনও ডিটেনশন ক্যাম্পে হবে না। নিজের নাম ভোটার লিস্টে তুলবেন। আমি এখনও তুলিনি, আপনারা যতক্ষণ না তুলবেন, ততক্ষণ আমিও তুলব না। কোথাও সার্ভার ডাউন করে দিচ্ছে। হিয়ারিংয়ে ডাকলে যাবেন। নয় তো নাম কেটে দেবে আর বলবে নাগরিক নন এই দেশের। আমরা আপনাদের সাহায্য করব। আমরা ক্যাম্প করছি। আমরা গ্রামসভা বেছে বেছে মে আই হেল্প ইউ ক্যাম্প করছি। যার যা সমস্যা হবে বলবেন। করে দেবে। সরকার সরকারের কাজ করবে আর পার্টিও পার্টির কাজ করবে। বিজেপি গায়ের জোরে কাজ করবে ভাবছে। এক শ্রেণির মানুষের উপর রাগ। সংখ্যালঘু তাড়াও, মতুয়া তাড়াও। এসআইআর করে বিজেপি আরও গেছে। যেটুকু ছিল সব যাবে। ওদের শূন্য করে দিন।
ওয়াকফ ইস্যুতে
আমি জগন্নাথ ধামও যেমন করি, আমি তেমন মুসলিম বেরিয়াল গ্রাউন্ডেও কবরস্থান করি। পুরোহিতদের পাশাপাশি মোয়াজ্জেমদের ভাতা দিই। আমি লোকশিল্পীদেরও দিই। কাজেই একাজ আমরা করেছি, করব। কিছু কিছু কথা সংখ্যালঘুদের বিভ্রান্ত করছে। ওয়াকফ নিয়ে আমরা নাকি কিছু করিনি। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। আমরা বিধানসভায় কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আইন পাশ করেছিলাম। জোর করে সম্পত্তি কাড়া যাবে না। আমরা সুপ্রিম কোর্টে কেস করেছি। মতুয়ালিরা আপলোড করবে, করে রাজ্যের ওয়াকফ বোর্ডকে দেবে। তাই নিশ্চিন্তে থাকুন। কারও সম্পত্তি কেউ দখল করবে না। কারও কথায় কান দেবেন না। যা বলছি এখানে দাঁড়িয়ে বলছি। আপনাদের নিরাপত্তা আমাদের দায়িত্ব। আমায় অনেক গালিগালাজ শুনতে হয়। আমি রমজান, ইফতারে গেলে হিজাবি বলে। আমি যখন গুরুদ্বারে যাই, মাথায় কাপড় দিই। তখন তো বলেন না? আমি যতদিন বাঁচব সব ধর্মের পরম্পরা মানব। আদিবাসীর নাচের সময় ওদের ড্রেস পরি কারণ, ওদের সম্মান দিই।

Scroll to Top