পাহাড়ের বিপর্যয়ের মোকাবিলায় ২৫৪ কোটি টাকার ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

৩৬৫ দিন। জিটিএ-তে নতুন প্রশাসক নিয়োগ করে পাহাড়ের বিপর্যয়ের মোকাবিলায় ২৫৪ কোটি টাকার ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর।পাহাড়ের গোর্খা শহীদ পরিবারের একজন করে চাকরি ও সমস্ত ভুয়ো পুলিশি মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের। মঙ্গলবার উত্তরবঙ্গ সফরে একাধিক জরুরী বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী।এদিন নেপাল থেকে শিক্ষা নিয়ে একদিকে পাহাড়ে উন্নয়নের সুশৃঙ্খলতা অবলম্বনের বার্তাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। অপরদিকে জিটিএ দুর্নীতি নিয়ে ফের সরব হয়ে দুর্নীতিতে যুক্তদের গ্রেপ্তার করা হবে সাফ সতর্কধ্বনি প্রেরণ করেন।
রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের এদিনের সফর সূচিতে ছিল কালিম্পঙ পাহাড়ের বিশেষ কর্মসূচি ও এরপর সমতলে শিলিগুড়ির উত্তরকন্যায় জিটিএ সহ সাত জেলার সঙ্গে বিপর্যয় মোকাবিলা ও উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরকে নিয়ে হাইপাওয়ার বৈঠক। মুখ্যমন্ত্রীর এদিন কালিম্পঙে কর্মসূচি নির্ধারিত থাকলেও আবহাওয়া বেগতিক হওয়ায় পাহাড় থেকে ফিরতে হয় মুখ্যমন্ত্রীকে। সমতলের আকাশ রোদ ঝলমলে হলেও কালিম্পঙ পাহাড়ের আকাশ ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন। আবহাওয়ার বেগতিক পরিস্থিতিতে দৃশ্যমানতা কম থাকার কারণে মুখ্যমন্ত্রীর কপ্টার এদিন কালিম্পঙে অবতরনে বাধা প্রাপ্ত হয়। যে কারনে কপ্টারে কালিম্পঙের টাউন হলের সরকারি কর্মসূচির উদ্দেশ্যে সেখানে আকাশ পথে পৌঁছেও ফিরে আসতে হয় রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানকে। এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে কপ্টার ঘুরিয়ে শিলিগুড়ি রাজ্যের মিনি সচিবালয় উত্তরকন্যার কাছে ভিডিওকন গ্রাউন্ডে নামেন। সেখান থেকে সড়কপথে উত্তরকন্যায় পৌঁছে ভার্চুয়াল মাধ্যমে কালিম্পংয়ের কর্মসূচিতে যোগ দেন মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী কালিম্পঙের সঙ্গে বৈঠকের সূচনাতেই জানান-আমাকে ক্ষমা করবেন আপনারা। ২৭শে সেপ্টেম্বর কোচবিহার জলপাইগুড়ি তারপর জলদাপাড়া আসবো।​তারপরে ২রা অক্টোবর বক্সা আসবো। বিমান অবতরণ করতে না পারার বিষয়ে তিনি বলেন-আমি চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু পারমিশন পাইনি। আমরা অবতরণের চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আবহাওয়া প্রতিকূল থাকায় অনুমতি পাওয়া যায়নি। তাই আমাদের ভার্চুয়ালি যুক্ত হতে হয়েছে। তিনি কালিম্পংবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন ৬ই অক্টোবর আমি আসবো বিমল গুরুংয়ের আমন্ত্রণে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেব এবং সেখান থেকে কালিম্পঙে যাব।

জিটিএ-র নতুন প্রশাসক নিয়োগ করে বিপর্যয় মোকাবিলায় জিটিএ-কে ২৫৪কোটি টাকা বরাদ্দ:
জিটিএ-র নতুন প্রশাসক নিয়োগের কথা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য জিটিএ-কে নিয়ে যে সমস্যা ছিল গতকাল মিটে গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী এদিন শুরুতেই পাহাড়ের মানুষের জিটিএ ঘিরে জট কাটিয়ে দীর্ঘ দিনের বকেয়া অর্থের অনুমোদনের ঘোষনা করেন। জিটিএ নতুন প্রশাসক হিসেবে রাজ্য সরকার আইএএস সম্রুতি রঞ্জন মোহান্তি -কে নিয়োগ করেছে। সোমবার বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে রাজ্য।এদিন মুখ্যমন্ত্রীর জিটিএ নবনিযুক্ত প্রশাসককে দায়িত্বভার তুলে দিয়ে বলেন- পাহাড়ের বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য দার্জিলিং, কালিম্পং, মিরিক সব মিলিয়ে ২৫৪ কোটির যে পেন্ডিং রয়েছে, তার অনুমোদন দিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের দায়িত্বে থাকা সচিব রাজেশ সিনহাকে এই বরাদ্দ অর্থ জিটিএকে তুলে দেওয়ার কথা জানান রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান। মুখ্যমন্ত্রী বলেন- দার্জিলিং, কালিম্পং, মিরিক সব মিলিয়ে ২৫৪ কোটির যে পেন্ডিং রয়েছে, এখান থেকে আমি মঞ্জুরি দিচ্ছি। পাহাড়ের স্থায়ী রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের না মেলা পর্যন্ত জিটিএ-র নব নিযুক্ত প্রশাসককে পাহাড়ের তিন বিধায়ক, সাংসদ, প্রতিমন্ত্রী ও জিটিএ বর্তমান সভাসদদের নিয়ে কাজের নির্দেশ দেন। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ-যত দিন না পাহাড়ে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান হচ্ছে, তত দিন আমাদের আইএএস মোহন্তিজীর নেতৃত্বে ডিএম এবং সমস্ত এমপি, এমএলএ আর যত সভাসদ এখন আছেন, সবাইকে নিয়েই, তাঁদের পরামর্শ নিয়েই জিটিএ-র কাজ অবিলম্বে পাহাড়ে শুরু হওয়া উচিত। বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের আধিকারিক রাজেশ সিনহাকে মুখ্যমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশ-আপনি বিপর্যয় মোকাবিলার টাকা জিটিএ-কে দিয়ে দিন, জিটিএ-ই কাজ করবে। মুখ্যমন্ত্রীর পাহাড় বাসীর উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়ে জানান-
হোম আর হিল অ্যাফেয়ার্স মিনিস্ট্রি আমার কাছেই আছে। এমওএস (এমওএস) আছেন বিশাল লামা। ওঁর সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আছে।
উত্তরকন্যায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক ও পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ ও হোম অ্যান্ড হিল অ্যাফেয়ার্স দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী বিশাল লামা। কালিম্পঙ টাউন হলের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাংসদ রাজু বিস্ট ও কালিম্পঙের বিধায়ক ভরত ছেত্রী৷
জিটিএ দুর্নীতি নিয়ে ফের সরব,যারা কোটি কোটি টাকা লুঠ করেছে তারা এরেস্ট হবে: কালিম্পংয়ের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে ফের তবে এদিন কালিম্পঙ পাহাড়ের সঙ্গে বৈঠকে ফের জিটিএ দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে গ্রেপ্তারির হুঁশিয়ারি দেন মুখ্যমন্ত্রী। খোলা হুঁশিয়ারি দিয়ে এদিন মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন গত জিটিএ বোর্ডের থাকা দুর্নীতিতে যুক্ত তাদের প্রত্যেকেকে গ্রেপ্তার করা হবে। তিনি কড়া সতর্কধ্বনী প্রেরণ করে বলেন- যারা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের টাকা নয়ছয় করেছে তাদের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি কমিটি জয়রামন সাহেবের নেতৃত্বে ব্যবস্থা নেবে। জিটিএ-তে অমরুত জল প্রকল্প, তামাং বোর্ড নিয়ে যত কোটি কোটি টাকা লুঠ করেছে তারা এরেস্ট হবে। সরকারের যে টাকা নয়ছয় হয়েছে তা আদায় করার কাজ সরকার করবে এই আশ্বাসও আমি দিচ্ছি।
গোর্খা শহীদ পরিবারের যাবতিয় ভুয়ো মামলা প্রত্যাহার ও প্ৰতি শহীদ পরিবারের একজনকে চাকরির ঘোষণাম মুখ্যমন্ত্রীর:
এদিন কালিম্পঙের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স থেকে পাহাড় আন্দোলনের গোর্খা শহীদ পরিবারের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর। গোর্খা শহীদ পরিবারের এক প্রতিনিধির সঙ্গে কথোপকথনে মুখ্যমন্ত্রী বড় ঘোষণা করে জানান পুলিশকে নির্দেশ দেব সমস্ত ভুয়ো মামলা প্রত্যাহার করা হবে। পুলিশকে বলে দিয়েছি। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন-প্রতি গোর্খা শহীদ পরিবারের একজনকে চাকরি দেব। বিধায়ক ভরত ছেত্রীর হাতে তালিকা তুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে কালিম্পঙ বিধায়ক ভরত ছেত্রীর চার মাসের মধ্যে বিধানসভায় বহুবার কালিম্পঙের জনগণের জন্য অনেক ইস্যু তুলেছেন। সাংসদ রাজু বিস্ট পাহাড়ের উন্নয়নে একাধিক প্রস্তাব পেশ করেছে রাজ্য সরকারের কাছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন-রাজুজী ও ভরত ছেত্রীর যা দাবি ছিল, তা আমরা পূরণ করতে যাচ্ছি। কালিম্পঙে একটা মেডিকেল কলেজ এবার বাজেটে মঞ্জুর হয়ে গিয়েছে। আমি যখন পরের বার কালিম্পং আসব, সেদিন ভূমিপূজন করা হবে।কালিম্পঙের মেডিকেল কলেজের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করবে অর্থদপ্তর তার অনুমোদন করার কথা ছিল, তাও স্বাস্থ্য সচিবকে নির্দেশ দিয়ে আমি কলকাতা থেকে রওনা হয়েছি।ফলে দ্রুত মুখ্যমন্ত্রীর হাতেই হবে কালিম্পং মেডিকেল কলেজের শুভ সূচনা। মূলত অক্টোবরেই কালিম্পং মেডিকেল কলেজের কাজের শুভ সূচনার ইঙ্গিত মিলেছে। মুখ্যমন্ত্রী এদিন ২০২৫ অক্টোবরে ভূমিধসে কালিম্পঙে ৭৩টি পরিবারকে ৩ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরনের অর্থ প্রদানের কথা জানান।ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়বাসীকে গৃহ নির্মান করে দেওয়া হবে। এছাড়া পাহাড়ের যুবক যুবতীদের জন্য ইস্টার্নস ফ্রন্টটিয়ার রাইফেল( ইএফআর)-এ ১০০০ কর্মী নিয়োগের জন্য পুলিশ রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি হতে চলেছে। এর মধ্যে কমপক্ষে ৩০০ জন মহিলাদের নিযুক্ত করা হবে সে ঘোষণাও করেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের বার্তা কালিম্পঙের প্রতিটি জনতার আয়ুষ্মান ভারত কার্ড মিলবে। ইতিমধ্যেই কালিম্পং জেলায় ২,১৮,৫০৩ জনকে কার্ড প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে রাজ্য সরকার। এখনও পর্যন্ত আয়ুষ্মান ভারতের সক্রিয় (অ্যাক্টিভেট) কার্ড হয়েছে ১,১৫,৩১১টি। কালিম্পঙের ১২৩ জন রোগী আয়ুষ্মান ভারতের অধীনে চিকিৎসা পেয়েছেন, যার আর্থিক পরিমাণ ১১,৭৭,১৯০ টাকা। অন্নপূর্ণার ক্ষেত্রেও ১৫,০০০মহিলা অর্থ পেয়েছেন সে তথ্য তুলে ধরেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান।প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার অধীনে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ৮,৩২৫টি নতুন করে গৃহ নির্মাণের ঘোষণা করেন এদিন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য- সে তালিকাও আমরা প্রস্তুত করে ফেলেছি। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার আওতায় শুধুমাত্র ৮,৩২৫টি নতুন বাড়ি পাবে কালিম্পং। যাঁদের নিজস্ব জমি আছে কিন্তু মাথার ওপর ছাদ নেই তারা এই যোজনার অধীনে বাড়ি পাবে।পাহাড় থেকে তরাই পর্যন্ত চা বলয়ে শ্রমিকদের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্ৰী চা শ্রমিক প্রৎসাহন যোজনার মধ্যে ৩৩০ কোটি টাকার কাজ চা বাগানের ভেতরে হবে। দুর্গাপূজা, দীপাবলি, ভাইফোঁটা উৎসবের আগে কুড়ি শতাংশ বোনাসের অ্যাডভাইজারি ঘোষণার বিষয়টিও উল্লেখ করেন এদিন ভিডিও কনফারেন্সে মুখ্যমন্ত্রী।

Scroll to Top