৩৬৫ দিন।সৌগত মণ্ডল। অ্যামাজনের জঙ্গলের পরে পৃথিবীর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। কিন্তু সেই সুন্দরবনের জীব বৈচিত্রের পাশাপাশি ম্যানগ্রোভ নষ্ট করছে বাংলাদেশের রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। শুধু তাই নয়, এই রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কাঁচামাল এবং উৎপন্ন সামগ্রী বহনকারী জাহাজ থেকে নির্গত জ্বালানি তেল প্রতিনিয়ত নিচ্ছে সুন্দরবনের নদীতে ও গঙ্গায়। তাই সুন্দরবনকে বাঁচানোর জন্য এবারে লন্ডনের কিংস কোর্টে মামলা দায়ের করলেন সুন্দরবন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে আসা পরিবেশবিদ অনিমেষ মন্ডল। অনিমেষ জানান, লন্ডনের কিংস কোর্টে বাংলাদেশের এই তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করার দাবী জানিয়ে তিনি যে মামলা দায়ের করেছেন সেখানে বার্কলে ব্যাংকের সঙ্গে লড়াই করার জন্য তিনি নিযুক্ত করেছেন কিংস লিগাল ক্লিনিকের বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক বিষয়ক আইনজীবী স্যু উইলিয়ামসকে। কিংস কোর্টে ইতিমধ্যেই এই মামলা গ্রহণ করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সমস্ত পক্ষকে নোটিশ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। প্রসঙ্গত অনিমেষের পাশাপাশি ইউনেস্কোর একাধিক আধিকারিক এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বহু পরিবেশবিদ এর আগেও সুন্দরবন ও আশপাশের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের অন্যতম কারণ হিসেবে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে দায়ী করে সেটি দ্রুত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
দূষণ ছড়াচ্ছে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বলে পরিচিত সুন্দরবনের প্রায় ৭০ শতাংশ পরে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে এবং বাকিটা ভারতের মধ্যে। কিন্তু বছর কয়েক আগে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে বার্কলে বাংলাদেশের অন্তর্গত সুন্দরবনের মাত্র ১০ কিলোমিটার এর মধ্যে তৈরি করে কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়া প্রায় ২৫ কিলোমিটার জুড়ে পরিবেশে বিরূপ প্রভাব ফেলে। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ বলে স্বীকৃত সুন্দরবনের এত কাছে এভাবে কয়লা চালিত তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি আন্তর্জাতিক যাবতীয় গাইডলাইন বিরোধী। এর ফলে এই ভয়াবহ দূষণ সামগ্রিকভাবে ভারত এবং বাংলাদেশের অন্তর্গত সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। তার উপরে প্রায় প্রত্যেকদিন কলকাতা বন্দর থেকেও রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে চলাচল করছে অসংখ্য জাহাজ। দূষণ ছড়াচ্ছে সেগুলিও।
জাহাজ থেকে নির্গত জ্বালানি মিশছে নদীতে
লন্ডনের কিংস কোর্টে মামলাকারী অনিমেষ মন্ডল জানান, প্রত্যেকদিন সুন্দরবনের নদীতে চলছে অন্তত ১০০ জাহাজ। প্রত্যেকটি জাহাজ সুন্দরবনের নদী এবং গঙ্গার উপরে যাত্রা করছে প্রায় ২০ ঘন্টা। তথ্য বলছে প্রত্যেকটি জাহাজ প্রতি ঘন্টায় অন্তত ২০ লিটার পোড়া ডিজেল নির্গমন করছে সুন্দরবনের নদী ও গঙ্গায়। অর্থাৎ প্রত্যেক দিন শুধুমাত্র এই জাহাজগুলি থেকে সুন্দরবনের নদী ও গঙ্গায় মিশছে অন্তত ১৬ মেট্রিক টন পোড়া ডিজেলের জ্বালানি। গোটা কলকাতা শহরে এক সপ্তাহেও সমস্ত গাড়ি চলাচল করে এত পরিমাণ পোড়া ডিজেলের দূষণ ছড়ায় না। এর ফলে একদিকে যেমন সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ ধ্বংস হচ্ছে ঠিক তেমনভাবেই সুন্দরবনের জঙ্গলে বসবাসকারী রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার থেকে শুরু করে অসংখ্য বিরল প্রজাতির প্রাণী সেই দূষিত জলের সংস্পর্শে এসে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। শুধু তাই নয়, প্রত্যেক দিন প্রায় ১০০ জাহাজ চলাচলের ফলে সুন্দরবনের নদীতে যে বিপুল পরিমাণ ঢেউ উঠছে তার ফলে ধস নামছে সুন্দরবনের নদী বাঁধে। প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে বসেছে গোটা পৃথিবীজুড়ে বিরল সুন্দরবনের শুশুক। সুন্দরবনের বিভিন্ন দ্বীপে শুকিয়ে যাচ্ছে বিরল প্রজাতির বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ গাছ।
কেন লন্ডনের কিংস কোর্টে মামলা
বাংলাদেশের অন্তর্গত সুন্দরবনের একেবারে লাগোয়া অঞ্চলে যে কয়লা চালিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হয়েছে তাকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত বার্কলে ব্যাংক। ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিবেশ সম্মেলনের মঞ্চে গৃহীত গাইডলাইন অমান্য করে যেভাবে পারলে ব্যাংক রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে রেসপন্সিবল বিজনেস কন্ডাক্ট বা আচরণ বিধি অমান্য করে চলেছে, তার জন্য ব্রিটেন সরকারের কাছে আবেদন করার পাশাপাশি বার্কলে ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করতে হয়েছে লন্ডনের কিংস কোর্টে। গোসাবার অনিমেষ মন্ডলের পাশাপাশি লন্ডনের কিংস কোর্টে এই একই দাবিতে মামলা দায়ের করেছেন বাংলাদেশের আরেক পরিবেশবিদ শরীফ জামাল।
বিষ জলে ধংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য
মৃত্যুমুখে রয়্যাল বেঙ্গল
- khabar365din
- September 5, 2026
- 1:20 pm
- No Comments



