কথাতেই মাত!
মধ্যমগ্রামের বাজারে দেড় কিলোর ইলিশ হাতালো ‘সাদা চুড়িদার’ পরা থ্রিলার চোর

৩৬৫ দিন। সিনেমার চিত্রনাট্যকেও যেন টেক্কা দিল মধ্যমগ্রামের এক রূপোলি ইলিশ মাছ চুরির ঘটনা। কোনো মারপিট নয়, আগ্নেয়াস্ত্রের ভয় দেখানো নয়— স্রেফ কথার মায়াজাল বুনে দিনেদুপুরে প্রায় চার হাজার টাকার দেড় কেজির প্রকাণ্ড ইলিশ আর পকেটের নগদ টাকা হাতিয়ে চম্পট দিলেন এক প্রবীণা! থ্রিলার ছবির ধাঁচে ঘটে যাওয়া এই অভিনব প্রতারণায় এখন থ বনে গেছেন মধ্যমগ্রাম কালীবাড়ি সংলগ্ন অমলেন্দু স্মৃতি ব্যবসায়ী সমিতির বাজারের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে স্থানীয় বাসিন্দারা। ঘটনার সূত্রপাত মধ্যমগ্রাম কালীবাড়ি বাজারে। দুপুর ১টা বেজে ১৫ মিনিট নাগাদ সাদা রঙের সালোয়ার-কামিজ পরা এক বয়স্ক ভদ্রমহিলা মাছের বাজারে আসেন। প্রসেনজিৎ বিশ্বাস নামে এক ব্যবসায়ীর দোকানে গিয়ে তিনি সবচেয়ে বড় ও ভালো ইলিশ মাছ দেখানোর দাবি জানান। দরদামের পর বরফ থেকে বের করা প্রায় দেড় কেজি ওজনের একটি প্রকাণ্ড ইলিশ পছন্দ করেন তিনি। ২৫০০ টাকা কেজি হিসেবে মাছটির মোট দাম হয় ৩,৭৮৮ টাকা। মহিলা দরদাম করে রাউন্ড ফিগার হিসেবে ৩,৭০০ টাকায় রফা করেন।
মাছ কাটার পর আসল খেলা শুরু করেন ওই বৃদ্ধা। তিনি জানান, এই মুহূর্তে তাঁর কাছে পর্যাপ্ত নগদ টাকা নেই। কিছুটা দূরেই তাঁর বাড়ি ও দোকান রয়েছে, তাই দোকানদার যদি তাঁর সঙ্গে কাউকে পাঠান তবে তিনি তাঁর হাতেই টাকা মিটিয়ে দেবেন। সরল বিশ্বাসে মাছ ব্যবসায়ী প্রসেনজিৎবাবু তাঁর দোকানের এক ভাই তথা কর্মচারীকে মহিলার সঙ্গে পাঠান। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়; বাজার থেকে বেরোনোর মুখে বৃদ্ধা আরও এক আবদার জুড়ে দেন। জানান, মানিব্যাগ আনেননি বলে রিকশা ভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচের জন্য নগদ টাকার দরকার। বাড়ি গিয়ে সব একসঙ্গে ৪,০০০ টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যবসায়ী প্রসেনজিতের কাছ থেকে উলটে আরও ২০০ থেকে ৩০০ টাকা নগদ ধার চান তিনি। প্রসেনজিৎবাবু দ্বিধা না করে সেই টাকাও তাঁর হাতে তুলে দেন। এরপর রসরাজের সামনের রিকশা স্ট্যান্ড থেকে একটি রিকশা ডেকে মাছ বিক্রেতার কর্মচারীকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হন ওই বৃদ্ধা। মাছটি নিজে না ধরে প্রসেনজিতের কর্মচারীর হাতেই রেখেছিলেন তিনি। কিছুটা পথ যাওয়ার পর কৌশল বদলান তিনি। কালীবাড়ির বিপরীতে ‘মধ্যমগ্রাম টিম্বার’-এর কাছে গিয়ে রিকশা থামিয়ে মহিলা জানান, সেখানে তাঁর একটু কাজ আছে। ততক্ষণে রিকশাচালক ও কর্মচারীকে বাদু রোডের একটি কাপড়ের দোকানে (মতান্তরে সম্রাট কাপড়ের দোকান) গিয়ে টাকাটা নিয়ে আসতে বলেন। মহিলা এও দাবি করেন, তিনি ফোনে দোকানে বলে দিচ্ছেন টাকা দিয়ে দেওয়ার জন্য।
বৃদ্ধার কথায় বিশ্বাস করে কর্মচারী ও রিকশাওয়ালা বাদু রোডের সেই ঠিকানায় পৌঁছে দেখেন, সেখানে কোনো কাপড়ের দোকানই নেই! প্রতারিত হয়েছেন বুঝতে পেরে তাঁরা হন্তদন্ত হয়ে বঙ্কিমপল্লীর সেই কাঠগোলা বা টিম্বারে ফিরে আসেন। কিন্তু ততক্ষণে চিঁড়ে ভিজিয়ে দেড় কেজির মহার্ঘ্য ইলিশ ও নগদ টাকা নিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছেন বৃদ্ধা। আশেপাশের এলাকায় তন্নতন্ন করে খুঁজেও তাঁর আর কোনো হদিশ মেলেনি।
ঘটনার খবর বাজারে পৌঁছাতেই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। সিসিটিভি ফুটেজে সাদা চুড়িদার পরা ওই বৃদ্ধার মুখ স্পষ্ট দেখা গেলেও স্থানীয় কেউ তাঁকে চিনতে পারেননি। ঘটনায় স্তম্ভিত প্রসেনজিৎবাবু ক্ষোভে-দুঃখে পরের দিন দোকানই খোলেননি। থানায় এখনো লিখিত অভিযোগ দায়ের না হলেও এই ‘মাছচোর’ বৃদ্ধার অভিনব চুরি থেকে শিক্ষা নিয়ে বাজার কমিটির ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বাকিতে বা লোক পাঠিয়ে টাকা আদায়ের ভরসায় আর কাউকে এভাবে জিনিস বিক্রি করবেন না তাঁরা।

Scroll to Top