ভুলি নাই
২৪ জুলাই ১৯৮০
কমঃ প্রমোদ দাশগুপ্ত’র নির্দেশে
রবীন্দ্র সদনে রাখা গেল না উত্তমকুমারের মরদেহ
পূষন গুপ্ত
এই রিপোর্টটি প্রথম প্রকাশিত হয় বামফ্রন্ট আমলে ২০১০ সালের জুলাই মাসে
প্রথমেই বলে রাখা দরকার, বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী তার মন্ত্রিত্বের কেরিয়ার শুরু করেছেন ১৯৭৭ সালে তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী হিসেবে। সারা দেশের সাধারণ নিয়মটা আলাদা। সারা দেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পজিশনের ঠিক পরেই থাকেন অর্থমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যাকে বলে সেকেণ্ড ইন কমান্ড। অর্থাৎ কোনও কারণে প্রধানমন্ত্রী বা রাজ্যের ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী হঠাৎ অপসারিত বা প্রয়াত হলে সেকেণ্ড ইন কমান্ড তার জায়গায় অভিষিক্ত হন। সারা দেশ যেভাবে চলে বামফ্রন্ট আমলে এই রাজ্য সেভাবে নয়। যেমন দপ্তরটার নামও তথ্য ও সংস্কৃতি ছিল না। সংস্কৃতি শব্দটি যোগ করা হয়েছে। স্তালিনপন্থী কমিউনিস্ট সরকার ক্ষমতা দখল করেছে। অতএব সরকার সংস্কৃতিতে যে খবরদারি করবে, এটা প্রথমেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া এও ঠিক যেহেতু বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মহাশয় হলেন সংস্কৃতি মনস্ক সিপিএম, অতএব পার্টির পক্ষ থেকে এই খবরদারির দায়িত্ব ওঁকেই দেওয়া হল (‘এসব কালচারাল ব্যাপার। বুদ্ধকে জিজ্ঞেস করুন। ওই ভাল বুঝবে, জ্যোতি বসু। স্থান নন্দন। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ‘সুকুমার রায়’ তথ্যচিত্র দেখার পর)। এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে, আমরা সকলেই জেনেছি বা জানতে বাধ্য হয়েছি যে, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মহাশয় ঠিক কবি সুকান্ত বা উৎপল দত্ত’র নাটক দেখে বেড়ানো সিপিএম নন, উনি জীবনানন্দ ও সত্যজিৎপন্থী। অর্থাৎ এরকম একটা ভ্রান্তিও আমাদের মধ্যে তৈরি করে দেওয়া হল যে উনি সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কতকটা উদারপন্থী। প্রসঙ্গত এও জেনে রাখা দরকার সারা পৃথিবীতে এই রাজ্যটি ছাড়া আর একটি দেশের সরকারেইসংস্কৃতি বিষয়ক একটি দফতর আছে, তা ফ্রান্স। চীনে থাকতে পারে, বলতে পারব না, চীনে আদৌ কোনও সংস্কৃতি আছে কিনা – সে ব্যাপারেই যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এটি ভূমিকা মাত্র। এবার আসা যাক মূল বিষেয়। মূল বিষয়টি বোঝার জন্য অবশ্য এই ভূমিকাটির প্রয়োজন ছিল।
আসুন, এবার আমরা ২৩ জুলাই, ১৯৮০ সকাল থেকে কী কী ঘটেছিল একবার দেখে নিই। সবাই জানেন টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে তখন চলছে ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ র শুটিং। উত্তমকুমার গাড়িতে একটা পোর্টেবল টেপরেকর্ডার রাখতেন। সোনি। শুটিং ব্রেকে হয় পছন্দমতো গান শুনতেন অথবা নিজের ডায়ালগ বলা প্র্যাকটিস করতেন। সে দিন ড্রাইভার গাড়িতে টেপরেকর্ডারটা রেখে উপরে এসেছিল অন্য কাজে। সেই ফাঁকে টেপটি চুরি হয়। টেপটা খুবই পছন্দের ছিল ওঁর। বস্তুত সকালটাই সে দিন একটু খারাপভাবে শুরু হয়। দ্বিতীয় বিরক্তিকর ঘটনাটা ঘটে স্টুডিওতে। ফ্লোরে ওঁর নিজস্ব একটি মেক-আপ রুম ছিল, স্বাভাবিক। সে দিন ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখেন বিনা অনুমতিতে সেই ঘর দখল করে বসে আছেন মৌসুমী। মৌসুমীকে একটিও কথা না বলে, ইউনিটকে বিব্রত না করে, তিনি চলে যান এন টি ওয়ানে। সেখানে রামবাবু সঙ্গে সঙ্গে মেক-আপ রুমের ব্যবস্থা করে দেন। ওয়ান থেকেই মেক-আপ করে টেকনিশিয়ানে ফিরে আসেন তিনি। ‘ওগো বধূ সুন্দরী ’র কিংবদন্তিসম সিড়ির সিকোয়েন্সের কথাও সকলেরই জানা। ওটাই ছিল ওঁর শেষ শুটিং। সিনটা একটু লম্বা, বড় ডায়ালগ, সময় লাগছিল। যাঁরা নজর লাগিয়ে সিনেমা দেখেন, তাঁরা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, ওই সিনটাতে তিনি বারবার বুকে, বা বুকে হাত বোলাচ্ছিলেন। আসলে তখন থেকেই অস্বস্তিটা শুরু হয়েছে। তখন বেলা প্রায় ৩.৩০ মিনিট, লাঞ্চ ব্রেক হয়ে গেছে। সিনটার বারবার রিটেক চলছে। ডাক্তারি পরিভাষায় ওই সময়েই ওঁর একটা মাইল্ড অ্যাটাক হয়। ওই সময় ওঁর হাঁটুতেও একটু অসুবিধা হচ্ছিল; পরের দিন ডাক্তারের কাছে উনি তা স্বীকার করেন।
এক মিনিটও বিশ্রাম না নিয়ে ওই চুড়ান্ত পেশাদার শিল্পী রুটিন প্যাক-আপ মতো কাজ করেন। ময়রা স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে ফেরেন। ব্যক্তিগত সহকারীকে বলেন, দুপুরে একটু গ্যাসের কষ্ট হচ্ছিল। হালকা অ্যান্টাসিড খান। পোশাক পাল্টে সন্ধ্যার দিকে দেওদার স্ট্রিটে দেবেশ ঘোষের ফ্ল্যাটে গৃহপ্রবেশে’ র পার্টিতে যান। পার্টিতে খুব সংযমী ছিলেন এমন নয়। প্রায় মধ্যরাতে বাড়ি ফেরেন। পোশাক পাল্টে শোওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে ব্যক্তিগত পরিচারককে ডেকে বলেন, শরীর বেশ খারাপ লাগছে। ডঃ বকশিকে ফোন করা হয়। উনি শরীরের অবস্থা শোনামাত্র সঙ্গে সঙ্গে নার্সিং হোমে ভর্তি হতে বলেন। পরিচারকদের ভাষায়, ওঁর তখন বেশ শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। ওই অবস্থায় সম্ভবত মনের জোর আনতে উনি নিজেই গাড়ির চালকের আসনে বসেন। কারও বারণ না শুনে নিজে ড্রাইভ করে বেলভিউ পৌঁছোন। ভাগ্যিস ময়রা স্ট্রিট থেকে বেলভিউ-এর দূরত্ব ছিল গাড়িতে তিন/চার মিনিট। তখন রাত ১.২০ আধ ঘণ্টার মধ্যে ইসিজি এবং প্রাথমিক পরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, উত্তমকুমারের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।
মানুষের দরবারে, ভবানীপুরের পূর্ণ হলে শায়িত রইল দেহ
২৪ জুলাই ১৯৮০ মহানায়ক উত্তমকুমারের মৃত্যুদিনের এক ঐতিহাসিক দলিল ।
রবীন্দ্রনাথের শেষযাত্রার পর কলকাতায় আর কোনও শেষযাত্রায় এত ভিড় হয়নি
২৪ জুলাই। বেলা ১টা। তরুণকুমার ততক্ষণে পুরো অবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়েছেন। দুপুরে বেশ ফ্রেশ। তরুণকুমারকে ডাকলেন, বললেন, তোর তো আজ থিয়েটারের ডাবল শো। ‘আমি ভালো আছি। চিন্তা করিস না, শো করে সাড়ে নটা নাগাদ দেখা করে বাড়ি ফিরিস।’ সেই শেষ কথা। সন্ধ্যার পর থেকে অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে।
রাত ৯.২০। বাংলার একমাত্র সুপারস্টার উত্তমকুমার চলে গেলেন। তরুণকুমারকে সাড়ে নটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেছিলেন তিনি। তরুণকুমার বেলভিউতে ঢোকেন রাত ৯.৩৫ নাগাদ। তার পনেরো মিনিট আগেই সব শেষ। তবু খবরটা তখনও তিনি পাননি। ডাক্তাররা শেষ চেষ্টার মতো পাম্প চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাত ১০টা। তরুণকুমার বললেন, দাদাকে নিয়ে যাব। তখনও ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু হয়নি। আইনত তিন ঘণ্টার আগে ওঁরা দিতেও পারেন না। কিছুটা জোর করেই, নিজের অ্যাম্বাসাডারে দাদার মৃতদেহ নিয়ে রওনা হলেন ভবানীপুরের বাড়ির দিকে।
রাত ১০.৩০। ওঁর মরদেহে পরিবারের বাইরে প্রথম মালাটি দেন সুচিত্রা সেন। সাংবাদিক সেবাব্রত গুপ্ত সুচিত্রাকে খবরটা দেন।
রাত ১২.৩০। ভবানীপুরের বাড়ি তখন প্রায় দুর্গ। তরুণকুমারের অনুমতি ছাড়া কোনও বহিরাগতের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ। সুপ্রিয়া দেবীরও।
ভোরের আলো ফোটামাত্র দুটি ঘটনা ঘটে। প্রথমত, খবরের কাগজে খবর দেখে ওই ভোরেই কয়েক হাজার মানুষের ভিড় জমে যায় ভবানীপুরে। দ্বিতীয়ত, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মরদেহের পাশে এসে বসেন। শেষ কাজ পর্যন্ত সৌমিত্র উত্তমকুমারের মরদেহের পাশ থেকে নড়েননি। কোন আমরা-ওরা’র রাজনীতি এক মুহূর্তের জন্যও টলাতে পারেনি। আর ছিলেন শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়।। ভিড় বাড়ছে দেখে সকলে মিলেই সিদ্ধান্ত নিলেন, রাজ্য সরকারের সঙ্গে একবার কথা বলা যায় কী, যদি রবীন্দ্রসদনে মরদেহ রাখা যায় তা হলে বাংলার মানুষ একবার শেষ দেখাটা দেখতে পাবে। তরুণকুমার নিজেই দায়িত্ব নিলেন। তথ্য সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিবারের পক্ষে আবেদন করা হল। তিনি জানালেন, মন্ত্রীর মতটা জেনে পরিবারকে জানানো হবে। আধ ঘণ্টার মধ্যে উত্তর এল। সরকারি মত হল, বামফ্রন্ট সরকার টালিগঞ্জের কমার্শিয়াল ছবির কোনও হিরোর মরদেহ রবীন্দ্রসদনে রাখতে পারবেন না।
দুপুর ১১.৪০। ২৫ জুলাই ১৯৮০। উত্তমকুমার সম্পর্কে বামফ্রন্ট সরকারের ভারডিক্ট। এই ঘটনার ঠিক ২৭ বছর পর, মূলত লিটল ম্যাগাজিনের আদ্যন্ত প্রতিষ্ঠান বিরোধী লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় রবীন্দ্রসদনে শায়িত। ওই অঞ্চলে ঘুরতে আসা একজন আলটপকা প্রশ্ন করে বসে, আচ্ছা এই ভদ্রলোক কে? কী করতেন? কখনও নাম শুনিনি তো। উপস্থিত এক রাগী যুবক বেশ অ্যাডামেন্টলি উত্তর দিলেন, ‘উনি একজন লেখক, আধুনিক লেখক, তা ছাড়া উনি চিফ মিনিস্টারের বন্ধু খুবই বন্ধু।’তো এই বন্ধুকৃত্যটিও মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পক্ষে সম্ভব হত না, যদি কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত বেঁচে থাকতেন।
১৯৮০ সালের ২৫ জুলাই কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত, বাংলার স্তালিন, কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া, মার্কসবাদীর রাজ্য সম্পাদক ও পলিটব্যুরোর সবচেয়ে ভোকাল সদস্য আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে বসে মুখ থেকে চুরুট নামিয়ে একঘর ধোঁয়া ছেড়ে বলেন, ‘আমাদের গভর্নমেন্ট শেষ পর্যন্ত কি কোনও টালিগঞ্জের ম্যাটিনি আইডলের ফিউনারেলে নিজেকে অ্যাসোসিয়েট করছে? প্রোপোজালটা আনলেন কে?’ পিডিজি’র পাশে বসে ছিলেন কমরেড কৃষ্ণপদ ঘোষ। তিনি মুচকি হাসেন। কৃষ্ণপদ পার্টিলাইনে বুদ্ধ, শ্যামল, সুভাষদের ঘোর বিরোধী ছিলেন।
পিডিজি যখন এসব বলছেন তখন ভবানীপুরের বাড়ির সামনে ট্রাকের উপর শুইয়ে দেওয়া হয়েছে উত্তমকুমারের মরদেহ । চারপাশের সবকটি রাস্তায় প্রায় মাইলখানেক জুড়ে মানুষের ভিড়। তাঁরা কাঁদছে। হাউহাউ করে কাঁদছে। এই ক্রন্দনরত জনসমুদ্র সামলাতে পুলিশ কমিশনার থেকে শুরু করে গোটা লালবাজার রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছিল।
দুপুর ২.৩০। স্বল্পাহারী কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত দুপুরের যৎসামান্য মধ্যাহ্নভোজ সেরে নিভন্ত চুরুটে অগ্নিসংযোগ করে বলেন, ‘বুদ্ধকে বোলো, ভিড় হয়েছে শুনছি, কিন্তু এটাই ডিসিশন। তবে জ্যোতিবাবু বলছিলেন, একটা রিথ পাঠানোর কথা। সেটা পাঠানো যেতেই পারে। আই হ্যাভ নো অবজেকশন।’ প্রমোদ দাশগুপ্ত মহাশয়-সহ ওই ঘরে আর যাঁরা ছিলেন, সকলেই আজ প্রয়াত। এই কথাবার্তাগুলো আমায় বলেছিলেন ১৯৯৬ সালে আলিমুদ্দিনে বসে পার্টির এক সর্বময় কর্তা, যাঁর নাম আমি বলব না ।সাংবাদিকরা সোর্স বলে না। কিন্তু উনিও স্মৃতির ভিত্তিতে বলেছেন। আমিও তাই। পিডিজি’র বাক্যের প্রতিটি শব্দই যে মিলে যাবে এমন নয়, একটু এদিক-ওদিক হতে পারে । কিন্তু মূলত কাহিনি এটাই।






