ইন্দাসে পৌঁছল ককরোচের দিল্লি টিম
‘ওই টাকায় আদর্শ স্কুল বানান’ প্রশাসনকে ককরোচের ১০ দিনের আলটিমেটাম

৩৬৫ দিন। বাঁকুড়ার ইন্দাসে ককরোচ জনতা পার্টির সদস্য আবদুল হাফিজের ওপর প্রাণঘাতী হামলা, ও তার বাবাকে পিটিয়ে মারার ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিল্লি থেকে ইন্দাসে হাজির হল ককরোচ জনতা পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের একটি প্রতিনিধি দল। আশুতোষ রাঙ্কার নেতৃত্বে এদিন বিজয় মাল্লাঙ্গি, অঙ্কিত ভরদ্বাজ, সুধীর সাঙ্গোয়ান সহ তাদের কলকাতা প্রতিনিধিদের একটি টিম কুড়িশুন্ডা গ্রামে পৌঁছয়। রবিবার গভীর রাতেই তারা। কলকাতায় পৌঁছন। তারপর বাঁকুড়ার উদ্দেশে রওনা দেন। কুড়িশুন্ডা গ্রামে পৌঁছে আবদুল হাফিজের পরিবারের পাশে থেকে বৃহত্তর প্রতিবাদ ও আন্দোলনের প্রস্তুতি নিলেন তারা। এফআইআরে নাম থাকা প্রত্যেক দুষ্কৃতীকে ধরার দাবি সহ বাঁকুড়া এবং তারপর গোটা বাংলা জুড়ে আন্দোলনের রুটম্যাপ দিলেন তাঁরা।  একই সঙ্গে তারা জানিয়ে দেন ,রাজ্য সরকারের দেওয়া ক্ষতিপূরণ আবদুলের পরিবার প্রত্যাখ্যান করেছে। তার বদলে তারা ওই অর্থে একটি আন্তর্জাতিক মডেলের স্কুল চান। এখনও এই পরিবারকে কোনো নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি। তাই সিজেপির পক্ষ থেকে ২৪ ঘণ্টা আবদুলের পরিবারের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে প্রশাসনকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। মাত্র ১০ দিনের মধ্যে এই সব দাবি না মানা হলে,বা উপেক্ষা করা হলে বাঁকুড়া জুড়ে আন্দোলনের ডাক দেওয়ার কথা বলেছে সিজেপির সেন্ট্রাল কমিটির প্রতিনিধিরা। তারা যে এই গণপিটুনি মোটেও হালকাভাবে নিচ্ছে না, বরং বড় আন্দোলনের দিকে প্রস্তুতি নিচ্ছে,সেটা পরিষ্কার।

প্রসঙ্গত,২৪ ঘণ্টা আগেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করে এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করেন ককরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দিপকে। তিনি লেখেন, ভাল স্কুল গড়ার দাবি তোলার কারণে আজ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে, যা রক্ত গরম করার মত ঘটনা। সিজেপি মৃত যুবকের পরিবারের পাশে রয়েছে এবং দোষীদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছে।
একনাগাড়ে নিম্নচাপের অঝোর বৃষ্টি, কড়িশুন্ডা গ্রামের পাকা রাস্তা যেখানে শেষ হয়, ঠিক সেখান থেকেই হাঁটু কাদা ভেঙে শুরু আবদুল হাফিজের বাড়ির রাস্তা। পোড় খাওয়া জেলার নেতারা বর্ষায় যে রাস্তায় ঢুকতে ভয় পান,গাড়ি থেকে নেমে  সেই রাস্তায় হাঁটা লাগালেন ককরোচ জনতা পার্টির সাত প্রতিনিধি। জুতো খুলে,খালি পায়ে প্যাচপ্যাচে কাদার রাস্তা পেরিয়ে প্রায় হাফ কিলোমিটার হাঁটলেন,এই তরুণ ব্রিগেড। উপচে পড়া ভিড় দুপাশে সামাল সামাল অবস্থা। বর্ষার জলে রাস্তা আর পুকুর একাকার। দূরে  দাঁড়িয়ে পুলিশ,প্রশাসন, যেদিকে কাদ জলের ব্যাপার নেই। দুই ভ্যান ভর্তি করে এসেছে,স্পর্শকাতর বিষয়। তার ওপর ককরোচ প্রতিনিধিরা এসেছে দিল্লি থেকে। ফলে প্রস্তুতি ছিল ভালোই।  সাত মিনিটের পথ কাদা ডিঙিয়ে পৌঁছতে পাক্কা চল্লিশ মিনিট। ওদিকে কুড়িশুন্ডা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে জমায়েত কয়েকশো গ্রামবাসী, ছাত্র ছাত্রীরা। প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করতে দিতে হবে,দাবি তুলে,স্কুলের সামনেই অবস্থান,হৈচৈ। তবে আবদুলের সিজেপির বাকি সদস্যরা সেটা খুব শান্তিতে সামলে ভিড় হালকা করে দেয়। বাচ্চারা স্কুলে আছে,তারা ভয় পেতে পারে,সেটা কখনোই কাম্য নয়। এটাই ছিল যুক্তি। পুলিশ নিশ্চিন্ত হয়। দেড়তলা পাকা বাড়ির উঠোন সহ অর্ধেকটা ডুবে রয়েছে জলে। দুপাশের ক্ষেত,পুকুর উঠোন,গোয়ালঘর একাকার। মাঝে ইঞ্চি আটেকের মত সরু আলের মত একটা পথ কেবল খড় ফেলে উঁচু করা হয়েছে কোনোমতে পা ফেলার জন্য। কর্পোরেট চাকরি করা,বিদেশে পড়াশোনা করা, চেহারায় সফিস্টিকেটেড ককরোচ টিম অবলীলায় গাছের ডাল ধরে ব্যালেন্স করে হেঁটে ঢুকে গেল। বর্ষা মাথায় করে গোটা দু তিন গ্রাম ভেঙে মানুষ এসেছে। আশুতোষ রাঙ্কার নেতৃত্বে এদিন বিজয় মাল্লাঙ্গি, অঙ্কিত ভরদ্বাজ, সুধীর সাঙ্গোয়ানরা আবদুলের মা,দিদা সহ পরিবারের বাকিদের সঙ্গেও দীর্ঘ সময় কথা বলেন। তাদের পরিবারের পাশে সিজেপি আছে,এবং আবদুলের বাবার হত্যাকারীদের কখনোই ছাড়া হবে না সেই প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে তাদের পরিবারের আর্থিক সাহায্যের জন্য দেশজুড়ে ফান্ড রাইজিং করার বার্তা দেন আশুতোষ রাঙ্কা। শীর্ষ নেতৃত্ব অভিজিৎ দীপকে আগেই জানিয়েছিলেন, দোষীদের শাস্তি এবং তাদের দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন জারি থাকবে,একই বার্তা দিলেন আশুতোষরাও। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র এক কর্মীর বাবাকে পিটিয়ে খুনের ঘটনায় বাঁকুড়ার ইন্দাসে এক বিজেপি নেতা-সহ আট জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। নিহতের স্ত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ধৃতদের রবিবার বিষ্ণুপুর মহকুমা আদালতে তুলে পুলিশি হেফাজতের আবেদন জানানো হয়েছে। ধৃতদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩২৯(৪), ৩৩১(৪), ১২৬(২), ১১৭(২), ১১৮(২), ৩০৪(২), ৩৫১(৩), ১০৯, ১০৩(১), ৬১(২), ৩২৪(৪) এবং ৩(৫) নম্বর ধারায় খুন, খুনের চেষ্টা, নৃশংস ভাবে মারধর, হামলা, সম্পত্তি নষ্ট করা-সহ বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।বাঁকুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কৃশানু রায় জানান, রবিবার দুপুরে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগ পাওয়ার পরই এই ঘটনায় যুক্ত মোট আট জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের বিষ্ণুপুর মহকুমা আদালতে পেশ করে পুলিশ হেফাজতের আবেদন জানানো হয়েছে। এই ঘটনায় অপর অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশি চলছে। গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।
প্রসঙ্গত,গত ১৯ জুলাই দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন ইন্দাস থানার করিশুণ্ডা গ্রামের যুবক শেখ আব্দুল হাফিজ। গত ২৭ জুলাই সেখান থেকে ফিরে গত ১৩ অগস্ট দলীয় নেতৃত্বের নির্দেশে করিশুণ্ডা পশ্চিমপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঠনপাঠনের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে যান সিজেপি কর্মী হাফিজ।অভিযোগ, ওই স্কুলের প্রধানশিক্ষক কাশীনাথ দে হাফিজকে এক দিন পরে স্কুলে আসতে বলেন। এর পরে স্থানীয় বিজেপি কর্মীদের তাঁর পিছনে লেলিয়ে দেন। সেই রাতেই একদল দুষ্কৃতী হাফিজের বাড়িতে হামলা চালায়। লাঠি, রড ও শাবল দিয়ে তাঁর উপর আক্রমণ হয়। কোনওক্রমে বাড়িতে ঢুকে হাফিজ প্রাণে বাঁচলেও তাঁর বাবা মাফিককে প্রচণ্ড মারধর করে হামলাকারীরা। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে গুরুতর আহত মাফিককে উদ্ধার করে ইন্দাস ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৫ অগস্ট শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানেই শনিবার রাতে চিকিৎসারত অবস্থায় মৃত্যু হয় মাফিকের। পুলিশ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে প্রথমে আট জনকে আটক করে। রবিবার দুপুরে মৃতের স্ত্রী হাসিনা বেগম ইন্দাস থানায় হাজির হয়ে পাঁচ জনের নাম-সহ মোট ১০-১৫ জন হামলাকারীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এর পরই আটক আট জন— শেখ আজ়াদ, শ্রীকান্ত মাঝি, প্রশান্ত রুইদাস, রোহিত মাঝি, বাবলু মাঝি, সন্তু মাঝি, টিঙ্কু কেওড়া এবং অষ্টম মাঝিকে গ্রেফতার করা হয়।

Scroll to Top